কথাটা বলে সুনয়নী দেবীও অবাক হয়েছেন লক্ষ্য করলাম। তিনি মৃদুস্বরে বললেন মেজদাকে আমি ছোটোবেলায় দেখেছিলাম, সে-কথা তো আপনাকে বলেছি। বড়দার কাছে অবশ্য তার অনেক কথা শুনেছি। মেজদার কথা আপনি জানতে চাইছেন। মেজদা কি
কর্নেল ওঁকে থামিয়ে দিয়ে বললেন–জাহাজে চাকরির কথা ছাড়া আর কী কথা শুনেছেন, আগে বলুন। তারপর আপনার প্রশ্নের উত্তর দেব।
সুনয়নী দেবী মুখ নামিয়ে আস্তে বললেন–বড়দা বলতেন, মেজদা আমেরিকা থেকে এক মেমসায়েবকে বিয়ে করে এনেছিল। মেমবউয়ের সঙ্গে বনিবনা হয়নি। সে মেজদাকে ছেড়ে পালিয়ে যায়।
-আর কিছু?
–আর একটা কথা শুনেছিলাম। সাংঘাতিক কথা। কথাটা বলা উচিত হবে কিনা জানি না।
সুনয়নী দেবী একটু কুণ্ঠার সঙ্গে কথাটা বললেন। তাই কর্নেল বললেন–আপনি আপনার বড়দার খুনিকে শাস্তি দিতে চান না?
-হ্যাঁ! নিশ্চয় চাই। তবে..
–তাহলে সব কথা খুলে বলুন। আপনার ভয়ের কোনও কারণ নেই। আমি আপনার পাশে আছি।
একটু চুপ করে থাকার পর সুনয়নী বললেন–জাহাজ ডুবে মেজদা মারা গেছে বলে বড়দার কাছে খবর এসেছিল। বড়দা তখন কলকাতায় ছিলেন। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার, এক রাত্রে মেজদা গোপনে বড়দার কাছে এসেছিল। তার কিছু জিনিসপত্তর রেখে গিয়েছিল। বড়দা পরে আমাকে বলেছিলেন, পুলিশ তাকে খুঁজছে! বড়দা রাগি লোক ছিলেন। বলেছিলেন, অজু আমাদের রায়বংশের কলঙ্ক। আর
-হ্যাঁ। বলুন। আপনার ভয়ের কারণ নেই।
-আর জাহাজিৰাবু, মানে চন্দ্রপুরের শম্ভু চৌধুরি যখনই গ্রামে আসত, তখনই বড়দার সঙ্গে প্রায়ই আড্ডা দিত। গতবছর এমনই শীতের এক রাত্রে বড়দার সঙ্গে জাহাজিবাবু চুপিচুপি মেজদা সম্পর্কে কী সব কথা বলছিল। আমি স্পষ্ট কিছু বুঝতে পারিনি।
–আপনি আপনার বড়দার কাছে এ বিষয়ে কিছু জানতে চাননি?
–চেয়েছিলাম। কিন্তু বড়দা রেগে গিয়েছিলেন। আমাকে নাকগলাতে নিষেধ করেছিলেন।
–সেই কথাবার্তার মধ্যে এমন কি কিছু আপনি শুনেছিলেন, যা আপনার মনে পড়ে?
সুনয়নী দেবী আবার মুখ নামিয়ে আঙুল খুঁটতে থাকলেন। একটু পরে বললেন-জাহাজিবাবু বড়দাকে বলছিল, অজুর লুকিয়ে রাখা জিনিসটার বড়দা যেন তাকে দেয়। তার বদলে জাহাজবাবু বড়দাকে টাকা দেবে।
-হঁ। আর কিছু?
সুনয়নী মাথা নাড়লেন। –আর তেমন কিছু মনে পড়ছে না। ওই যে বললাম, বড়দা খুব রাগি মানুষ ছিলেন। কিছু জানতে চাইলে খাপ্পা হয়ে বেরিয়ে যেতেন।
কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুট জ্বেলে বললেন-এবার আপনার প্রশ্নের উত্তর দিই। আপনি দীপনারায়ণবাবুর লেখা যে পোস্টকার্ডটা আমাকে দেখিয়েছেন, ওতে আপনার মেজদা সম্পর্কে একটা লাইন আছে। অজু তোমার কাছে যেতে পারে। তাকে পাত্তা দেবে না। এই অজু কে, সেই নিয়ে ধাঁধায় পড়েছিলাম। আপনার কথা শুনে ধাঁধার জট খুলে গেল। আপনাকে ধন্যবাদ। এবার চলি।
কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। সুনয়নী চাপা স্বরে বললেন-মেজদাকে কেন পুলিশ খুঁজছে, দয়া করে আমাকে বলে যান কর্নেলসায়েব!
উঠোনে হাঁটতে হাঁটতে কর্নেল বললেন–ঠিক সময়ে সব জানতে পারবেন। আর একটা কথা, আপনি একটু সাবধানে থাকবেন। আমি চন্দ্রপুর থানায় বলে দেব। সাদা পোশাকে অন্তত দুজন পুলিশ আপনার বাড়িতে আপনাদের দুরসম্পর্কের আত্মীয় হিসেবে থাকবে।
-কেন একথা বলছেন?
–জাহাজিবাবু আর তার লোকেরা আপনার বড়দার ঘরে হামলা করতে পারে। কিন্তু–আপনি একটুও ভয় পাবেন না।
এবার সুনয়নী শক্ত মুখে বললেন-কর্নেলসায়েব! আমি জীবনকে অনেক দুঃখকষ্ট পেয়েছি। অনেক ঝড়ঝাপটা সামলেছি। এখন আমি মরিয়া। তা ছাড়া তিতলিপুরের রায়বংশের রক্ত আমার শরীরে আছে। রায়বাঘিনি কথাটা জানেন তো?
কর্নেল হাসলেন। -জানি। তবু আপনি সাবধানে থাকবেন। …
কলকাতা ফেরার পথে কর্নেলকে জিজ্ঞেস করেছিলাম–তাহলে একটা পুরোনো পোস্টাকার্ড থেকে আপনি অজয়েন্দুবাবুর সূত্র খুঁজে পেয়েছিলেন?
কর্নেল বাইনোকুলার চোখে রেখে বললেন–হুঁ।
-কর্নেল?
–বলো?
–সেই লাল মারুতিটা আমাদের ফলো করে আসেনি কিন্তু। এলে টের পেতাম।
কর্নেল আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়ে বললেন–এসেছিল। কিন্তু খুব দুর থেকে ফলো করেছিল। এই বাইনোকুলারে যা দেখা যায়, তোমার চর্মচক্ষুতে তা দেখা যায় না।
–সর্বনাশ! এখনও কি গাড়িটা আমাদের ফলো করে আসছে?
-না। মন্দিরের কাছে হাইওয়েতে তোমার গাড়ি বাঁক নেওয়ার সময় গাড়িটা উলটোদিকে উধাও হয়ে গেছে। সম্ভবত চন্দ্রপুরে জাহাজিবাবুর কাছে গেছে।
গাড়িটা তাহলে চন্দ্রপুরের জাহাজবাবুর?
–এ বিষয়ে আমি এখনও শিয়োর নই, জয়ন্ত।
–তাহলে যে বলছেন চন্দ্রপুরে জাহাজবাবুর কাছে গেছে?
–আমি সম্ভবত বলেছি। শিয়োর নই। …
কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্টে ফিরতে পৌনে একটা বেজে গিয়েছিল। ষষ্ঠীচরণ মুচকি হেসে বলেছিল–একটু আগে টিকটিকিবাবু ফোন করেছিলেন। আবার ফোন করবেন বাবামশাইকে।
কর্নেল চোখ কটমটিয়ে বলেছিলেন–আমাদের খিদে পেয়েছে।
-সব রেডি বাবামশাই!
কর্নেল শীতকালে সপ্তাহে মাত্র একদিন স্নান করেন। আজ তার স্নানের দিন নয়। আমি গরমজলে স্নান করে শরীরটা ঝরঝরে তাজা করে নিলাম। দেড়টা নাগাদ খাওয়াদাওয়ার পর যথারীতি ডিভানে চিত হয়ে ভাতঘুমের জন্য প্রস্তুত হলাম। কর্নেল ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজে চরুট টানছিলেন।
