তার মানে, আমাকে দেখার পরই কাজিসাহেব ডেরা থেকে পালিয়েছে?
–তা-ই আমার ধারণা।
-কিন্তু সে আমার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমার জ্যাকেটের পিঠে একটা আঠামাখানো চিরকুট সেঁটে দিয়েছিল। তাতে লেখা ছিল, দ্বিতীয়বার এলেই মারা পড়ব। আমার মনে হয়েছিল, আমাকে সে ইচ্ছে করেই নিজের পরিচয় দিয়ে গেছে। এটা একটা চ্যালেঞ্জ।
স্যার! চন্দ্রপুরের শম্ভুনাথ চৌধুরি একসময় জাহাজে চাকরি করত। আমাদের রেকর্ডে দেখলাম, সে খিদিরপুর ডক এরিয়ার চোরাচালানি একটা দলের নেতা। তারপর রাজেনদা বললেন, চন্দ্রপুরে তার বাড়ি। সেখান থেকে সে বর্ডারে চোরাচালানি কারবার করে। কিন্তু তাকে এ পর্যন্ত প্রমাণাভাবে ধরা যায়নি। তাছাড়া সে বছরে গড়ে একবার মাত্র চন্দ্রপুরে যায়। নরেশবাবু ঘড়ি দেখে আবার বললেন–শম্ভু চৌধুরির আগেকার ডেরা ছিল খিদিরপুর এলাকায়। লোকটা ছদ্মবেশ ধরতে পারে। ওখান থেকে তাড়া খেয়ে গা-ঢাকা দিয়েছিল। পুলিশ তাকে খুঁজে বের করতে পারেনি। এদিকে সে কাজিসায়েব সেজে থিয়েটার রোডের একটা গলিতে নতুন ডেরায় বসে দিব্যি কারবার চালিয়ে যাচ্ছিল। আবার সে অন্য কোনও ডেরায় গিয়ে জুটেছে।
–ওর ঘর সার্চ করেছেন?
-হ্যাঁ। চন্দ্রপুরে একটা খুন করে এসেই সে সম্ভবত আপনার ভয়ে, রাতারাতি ঘরের জিনিসপত্র সরিয়ে ফেলেছিল। আমরা কিছু আসবাবপত্র দেখলাম। সবই ভাড়ার আসবাব। এক চিলতে চিহ্ন রেখে যায়নি লোকা।
কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন–আপনাদের ডি সি সায়েবকে এ বিষয়ে কিছু জানিয়েছেন?
নরেশবাবু হাসলেন–নাঃ স্যার! আপনার স্নেহধন্য লাহিড়িসায়েবকে জানাবার মতো কেস এটা নয়। তা ছাড়া আপনি যখন এই কেসে জড়িয়ে গেছেন, জানাতে হলে আপনিই জানাবেন।
-এখনও অরিজিৎকে জানাবার সময় হয়নি নরেশবাবু! আপনারা উড়োপাখির ডেরা খুঁজে বের করুন। পুলিশ যা পারে, তা কি আমি পারি?
-কর্নেলসায়েব! আপনি যা পারেন, তা কিন্তু পুলিশ পারে না। আপনি প্রকৃতিবিজ্ঞানী। পাখি প্রজাপতি অর্কিড ক্যাকটাসের খোঁজে আপনি কোথায়-কোথায় ঘোরেন। আপনার বাইনোকুলার আপনাকেই মানায়। পুলিশ কি বাইনোকুলারে আপনার পাখি খোঁজার মতো খুঁজলেই অপরাধীকে পেয়ে যাবে?
সরকারি গোয়েন্দা নরেশ ধর রসিক মানুষ। হাসতে হাসতে উঠে দাঁড়ালেন। কর্নেল বললেন–স্বীকার করছি নরেশবাবু! লোকটা অত ধূর্ত, তা আমি বুঝতে পারিনি। আমি আজ সকালে না গেলে হয়তো জাহাজবাবু আপনাদের হাতে ধরা পড়ত।
-না স্যার! ওটা কথার কথা হিসেবে বলেছি। জিনিসপত্র সে সরাবে বলে রেডি করেই রেখেছিল। আপনারা চলে আসবার পরই ম্যাটাডোরে সব চাপিয়ে সে চলে গেছে। আমাদের সোর্স ওই সময় পাড়ায় ছিল না। আচ্ছা, চলি।
নরেশবাবু পা বাড়িয়ে হঠাৎ ঘুরে ফের বললেন–আপনার হালদারমশাইয়ের খবর কী?
কর্নেল হাসলেন। তিনি একখান জব্বর ক্যাস পাইছেন।
নরেশবাবু আরও এক চোট হেসে নমস্কার করে বেরিয়ে গেলেন।
কর্নেল হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন-সাড়ে নটা বাজে। আমরা সাড়ে দশটা-পৌনে এগারোটা নাগাদ পৌঁছে যাব। রাস্তায় পেট্রলপাম্প আছে। ফুয়েল ভরে নেব। জয়ন্ত! ঝটপট রেডি হয়ে নাও। আমিও রেডি হচ্ছি!
অবাক হয়ে বললাম–কোথায় যাবেন?
তিতলিপুর!
–সর্বনাশ! আবার সেই সাংঘাতিক জায়গায়? হঠাৎ এ খেয়াল কেন বলুন তো?
-খেয়াল নয়, ডার্লিং! আমার মাথায় একটা থিয়োরি এসে গেছে। আজই তা যাচাই করা দরকার।
কর্নেলের এই খেয়ালি স্বভাবের সঙ্গে আমি পরিচিত। তবে আমিও তীব্র কৌতূহলী হয়ে উঠেছিলাম। তাই দ্রুত পোশাক বদলে এবং জ্যাকেটের ভিতরে আমার পয়েন্ট বাইশ ক্যালিবারের রিভলভার রেখে কর্নেলকে অনুসরণ করলাম। কর্নেলের সেই একই বেশভূষা। পিঠে আঁটা কিটব্যাগ, গলায় ঝুলন্ত বাইনোকুলার এবং ক্যামেরা।
হাইওয়েতে জায়গায়-জায়গায় জ্যাম ছিল। তিতলিপুর পৌঁছুতে এগারোটা বেজে গিয়েছিল। দোমোহানির রাস্তায় বাঁদিকে জঙ্গল রেখে একটু পরে সেই মোরাম-বিছানো পথে এগিয়ে দীপনারায়ণবাবুর বাড়ির সামনে গাড়ি দাঁড় করালাম। গ্রামের কিছু লোকজন থমকে দাঁড়িয়ে আমাদের দেখছিল। সদর দরজায় বাঁশের বাতার বেড়া আটকানো আছে। দোতলার বারান্দা থেকে সুনয়নী আমাদের দেখে নেমে এসেছিলেন।
তিনি আমাদের নমস্কার করে ভিতরে নিয়ে গেলেন। বারান্দায় দুটো চেয়ার এনে দিল একটা লোক। সুনয়নী দেবী থামে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বললেন–আপনাকে দেখে সাহস পেলাম কর্নেলসায়েব।
কর্নেল বললেন–আমি শুধু একটা কথা জানতে এসেছি। জেনেই চলে যাব।
-বলুন!
–আচ্ছা, আপনাদের পূর্বপুরুষ জমিদার পরিবারের বড়ো তরফের বংশধর ছিলেন আপনার দাদা। আমি শুনেছি, ছোটো তরফের বংশধর নরেনবাবু। সেচ বাংলোতে সবাই বলে, নরুঠাকুর। তাহলে মেজো তরফের কোনও বংশধর নিশ্চয় আছে?
সুনয়নী শ্বাস ছেড়ে বললেন–হ্যাঁ। আছে। তবে তাকে খুব ছোটোবেলায় দেখেছি। সে কলকাতায় থাকত। জাহাজে বড়ো অফিসার ছিল, তা বড়দার কাছে শুনেছি। জাহাজিবাবু শম্ভুকে তো সে-ই জাহাজে চাকরি দিয়েছিল!
–তার নাম কি অজয়েন্দু রায়?
আমাকে অবাক করে সুনয়নী দেবী বললেন–হ্যাঁ। অজয়েন্দু নারায়ণ রায়। আমার মেজদা।
.
০৮.
কর্নেলের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। আন্দাজে ঢিল উনি ছোড়েন না। আমার অজ্ঞাতসারে নিশ্চয় ওঁর হাতে কোনও সূত্র এসে গিয়েছিল। কিন্তু এবার তাহলে দেখছি রহস্যটা জমজমাট হয়ে উঠল।
