প্রাইভেট ডিটেকটিভ করুণ হাসলেন। একটু তফাতে পানের দোকানে গিয়া জিগাইলাম, ওই বাড়িতে কে থাকে চেনো? পানওয়ালা কইল, ক্যান? কিনবেন নাকি? হরিবাবু বাড়ি বেচবেন শুনছি। হরিবাবুর পুরা নাম সে জানে না। তারপর আমি কয়েক পা আউগগাইয়া আবার বাড়িটার কাছে গেছি, অমনি আমার কে ঝাঁপ দিল। আমি চৌত্রিশ বৎসর পুলিশে চাকরি করছি। আচমকা এমন অ্যাটাকের জইন্য সবসময় রেডি থাকি। ছিলাম।
কর্নেল চোখ বুজে চুরুট টানতে টানতে কথা শুনছিলেন। আমি বললাম-তার হাতে ছোরা ছিল নাকি?
হালদারমশাই বললেন-হঃ। ঝাঁপ দেওনের সাথে সাথে অর পায়ে হেভি কিক মারছিলাম। ড্যাগারের ডগা আমার এই আঙুলে লাগল। সেকেন্ড কিক অর পেটে মারলাম। তারপর আমার ফায়ার আর্মস তাক করলাম। হাত উঠাও। আমি পুলিশ।
হালদারমশাই খি খি করে হেসে উঠলেন। বললাম–লোকের ভিড় হয়েছিল নিশ্চয়?
গোয়েন্দাপ্রবর বললেন–এটাই আশ্চর্য! কেউ বারায় নাই। লোকটা ড্রেনে পড়ছিল। আমি দেখলাম, আমারই ভ্যানিশ হওনের দরকার। অগো ফায়ার আর্মস থাকতেই পারে। বড়ো রাস্তায় ওষুধের দোকানে আঙুলে ব্যান্ডেজ বাঁধলাম। তারপর ট্যাক্সি লইয়া কর্নেলস্যারের বাড়ি আইলাম। রাস্তায় বড্ড জ্যাম। কই ষষ্ঠীচরণ? এবারে কফি লইয়া আহো।
ষষ্ঠী ভিতরের ঘরের পর্দার ফাঁকে দাঁড়িয়ে কথা শুনছিল। আমি লক্ষ্য করিনি। দেখলাম, সে হাসিমুখে অদৃশ্য হল। টিকটিকিবাবুর দিকে সে সবসময় কেমন চোখে তাকিয়ে থাকে। হালদারমশাই চলে গেলে সে হেসে অস্থির হয়। বলে, এমন মজার মানুষ দেখা যায় না। উনি
পুলিশের অফিসার ছিলেন, তা ভাবতে গেলেই অবাক লাগে।
ষষ্ঠীচরণ কফি দিয়ে যাওয়ার পর কর্নেল চোখ খুলে বললেন–একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। হালদারমশাই! বাড়িটা চিনেই আপনার চুপচাপ চলে আসা উচিত ছিল। ওরা এবার সতর্ক হয়ে উঠবে।
হালদারমশাই বললেন–কে জানে ক্যান এমন হইয়্যা গেল!
কর্নেল হাসলেন। –আসলে মাঝে মাঝে অ্যাকশনে নেমে ভুলে যান যে আপনি আর পুলিশ ইন্সপেকটার নন। একজন প্রাইভেট গোয়েন্দা।
-হঃ ঠিক কইছেন।
আমি বললাম- চৌত্রিশ বছরের পুলিশজীবনের জের আর কী!
-হঃ! ওই জেরেই মাঝে মাঝে জেরবার হই। বলে হালদারমশাই প্রাণ খুলে খি খি করে হাসলেন।
কফি খাওয়ার পর তিনি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন-কর্নেলস্যার! এবার কন, আর কী করুম?
কর্নেল বললেন–এর পর আপনাকে ছদ্মবেশে ছাড়া ওখানে যাওয়ার উপায় দেখছি না। আপনি ছদ্মবেশ ধরতে পটু। সাধু-সন্ন্যাসী বা আধপাগলা ভবঘুরে–যেটা আপনার খুশি। শুধু এটুকু আপনার জানা দরকার, ওই বাড়িতে বসে কে ক্যাপটেন সিংহের পিছনে ওই গুন্ডা লোকটাকে লাগিয়ে রেখেছে। যদি তার নাম হরিবাবু হয়, তা হলে সেই হরিবাবুর চেহারাপোশাক ইত্যাদির বর্ণনা পেলে ভালো হয়। তাই বলে সঙ্গে আমার মতো ক্যামেরা নিয়ে যাবেন না যেন। আর একটা কথা। হরিবাবু গুভা পোষে। তাই আপনার আরও সতর্ক হওয়া উচিত। হ্যাঁ–আজকের ঘটনায় বোঝা যাচ্ছে, আপনি যে ওকে ফলো করেছিলেন, তা গুন্ডাটা যেভাবে হোক, টের পেয়েছিল। এবার সে আর তার মালিক হরিবাবু দুজনেই খুব সতর্ক থাকবে।
-ঠিক! ঠিক কইছেন। বলে হালদারমশাই চলে গেলেন। ….
পরদিন সকালে লালবাজার ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের সাব-ইন্সপেকটার নরেশ ধর সাদা পোশাকে এসে হাজির। নরেশবাবু আমাদের দুজনেরই সুপরিচিত এবং কর্নেলকে অনেক কেসে সাহায্য করেছেন। নমস্কার করে উনি সোফায় বসলেন। তারপর চাপা হেসে বললেন-রাজেনদা আমাকে ঠকিয়েছিলেন। শেষে ধরে ফেললাম আমি।
কর্নেল বললেন–তা আপনাকে দেখেই বুঝেছি। চন্দ্রপুরের ও সি রাজেন হাটি আমাকে বলেছিলেন, আপনার সঙ্গে তার আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে। তবে আমি ওঁর একটা কেসের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছি, আপনি কেমন করে ধরলেন?
-কর্নেলসায়েব! থিয়েটার রোডের যে এলাকায় আপনারা দুজনে গিয়েছিলেন, সেখানে আমাদের একজন সোর্স আছে। তার কাছে শুনেছি, একজন সায়েব আর একজন বাঙালি ভদ্রলোক কাজিসাহেবের ডেরায় গিয়েছিলেন। চেহারার বর্ণনা শুনেই বুঝে ফেলেছিলাম, কারা গেছেন। তারপর রাজেনদা আজ সকালে ফের ফোন করেছিলেন। তখন ওঁকে চেপে ধরলাম। ব্যাস!
কর্নেল হাঁক দিলেন। -ষষ্ঠী! তোর নালবাজারের বাবুমশাইকে কফি খাইয়ে দে। আজ শীতটা টের পাচ্ছি যেন।
বললাম–নরেশবাবু! কাজিসাহেবের খবর কী তা-ই বলুন।
নরেশবাবু একটু হেসে বললেন-ওখানকার সোর্স আমাদের অনেক আগে বলেছিল, তার সন্দেহ হচ্ছে, ভদ্রলোক মুসলমান নন। সোর্স নিজে মুসলমান। তার মতে, মুসলমানদের কতকগুলো আদব-কায়দা ভাবভঙ্গি আছে। ওই ভদ্রলোকের মধ্যে তেমন কিছু নেই। তাই লোকটা সম্পর্কে পুলিশের খোঁজ-খবর নেওয়া উচিত। কিন্তু সমস্যা হল, কোনও ঘটনা না ঘটলে নিছক একজন সোর্সের কথায় ভদ্রলোকের পিছনে লাগার ঝুঁকি আছে। সোর্স ভুল করতেই পারে। অনেকসময় ভুল করেও বটে। তাই আমি এটা নিয়ে মাথা ঘামাইনি। খামোখা কাকেও জেরা করার সময় পুলিশের নেই। একটা কেস চাই। সে ছিল না। এতদিনে কেস পেলাম।
ষষ্ঠীচরণ কফি দিয়ে গেল। কর্নেল বললেন-কফি খান নরেশবাবু। কফি খেতে খেতে বলুন কাজিসাহেব কি ডানা মেলেছেন?
নরেশবাবু কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন-কর্নেলসায়েব! আজ আপনি না গিয়ে যদি আগে আমাদের একটু সুযোগ দিতেন! সেই দুঃখটা জানাতেই এসেছি!
