কর্নেল কথা না বাড়িয়ে বললেন–না। একটা বিদেশি পত্রিকায় ছবি দেখে কৌতূহল হয়েছিল। …
গড়িয়াহাট রোডে বাঁক নিয়ে কিছুটা যাওয়ার পর কর্নেল চাপা স্বরে বললেন–জয়ন্ত! একটা লাল মারুতি আমাদের ফলো করছে। গাড়িটা ড. মুখার্জির গেটের একটু তফাতে দাঁড়িয়ে ছিল। লক্ষ্য রেখে চলল।
একটু পরে ব্যাকভিউ মিররে দেখলাম গাড়িটা দ্রুত এগিয়ে আসছে। কর্নেল বললেন ডানদিকের গলিরাস্তায় আচমকা মোড় নাও। তারপর আমি গোলকধাঁধায় ঘুরিয়ে মারব মারুতিটাকে।
কর্নেলের নির্দেশে অলিগলি ঘুরতে ঘুরতে একসময় চেনা রাস্তা ব্রড স্ট্রিটে পৌঁছুলাম। কর্নেল বললেন–এটা সুলক্ষণ। কেউ নিজে থেকেই জানিয়ে দিচ্ছে, সে আমাদের এই কেসে খুব জড়িয়ে আছে। কিন্তু এবার আমাদের সাবধানে এগোতে হবে। আমরা সত্যিই বিষধর সাপের ল্যাজে পা দিয়েছি।
বললাম–হ্যাঁ। লক্ষ ডলার দামের জিনিস হাতিয়েছেন। জাহাজিবাবুর মাথা খারাপ হয়ে গেছে।
কর্নেল বললেন–ব্রোঞ্জের চাকতিটা মিশরের বিধবা কিশোরী নেকারতিতির। আবার চিঠিটাও সেই রাজবধূ নেকারতিতির। দুটোই আসলের কপি। পোর্ট সইদ বন্দরও মিশরের। ক্যাপটেন সিংহের জাহাজ ওই বন্দর থেকে তুলো বোঝাই করেছিল। এ থেকে একটা স্পষ্ট ব্যাকগ্রাউন্ড দেখা যাচ্ছে। দুটো জিনিসই কায়রো জাদুঘর থেকে কেউ চুরি করেছিল। এবার প্রশ্ন হল, ক্যাপটেন সিংহ আর অজয়েন্দু রায় এই দুজনেরই কেউ চোর। অথবা তাদের কেউ অন্য কোনও চোরের কাছে দাম দিয়ে দুটো জিনিস কিনেছিলেন। বেশি দামে কারও কাছে বিক্রি করাই উদ্দেশ্য ছিল। তারপর জাহাজিবাবু ওটা ক্যাপটেন সিংহের ঘর থেকে চুরি করে দোমোহানির কাছে কেল্লাবাড়ির জঙ্গলে পুঁতে রেখেছিল।
–প্রায় একবছর ওটা পুঁতে রাখার কারণ কী হতে পারে?
কর্নেল একটু পরে বললেন–হয়তো জাহাজিবাবু উপযুক্ত খদ্দের খুঁজছিল। পাচ্ছিল না।
–ঠিক বলেছেন। এতদিনে খদ্দের পাওয়ায় সে পার্চমেন্টটা তুলে আনতে তার বিশ্বস্ত লোক পাঠিয়েছিল। তারা পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। কিন্তু কর্নেল, জাহাজিবাবু নিজে ওটা আনতে যায়নি কেন?
–চন্দ্রপুরে নিশ্চয় তার কোনও শত্রু আছে, যে ব্যাপারটা জানে এবং জাহাজিবাবুর ওপর নজর রেখেছিল। তাই সে ঝুঁকি নেয়নি। তবে সেটা জানতে হলে সাবধানে পা বাড়াতে হবে, জয়ন্ত! ধৈর্য ধরো।
অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে ষষ্ঠীচরণের তৈরি কফি খাওয়ার পর কর্নেল জানালা দিয়ে উঁকি মেরে বললেন–জয়ন্ত! লাল মারুতিটা আমার বাড়ির গেটের সামনে দিয়ে গলির ভিতর উধাও হয়ে গেল। গাড়িটা গেটের ওদিকে বড়ো রাস্তায় হয়তো দাঁড়িয়ে ছিল। তবে আমরা গাড়িটার অনেক আগে এসে গেছি।
একটু ভয় পেলাম!–গাড়ি থেকে কি কেউ আমাদের দিকে গুলি ছুঁড়ত?
কর্নেল হাসলেন। –হয়তো ছুঁড়ত। তবে আমাদের মেরে ফেলবার জন্য নয়। ভয় পাইয়ে দেবার জন্য। আর রাত্রেও তুমি আমার এখনে থেকে যাও। ই এম বাইপাসে গাড়িটা তোমাকে বিপদে ফেলতে পারে।
বললাম–ওই রাস্তায় আমি কাগজের অফিস থেকে প্রতি রাত্রে বাড়ি ফিরি। পুলিশ পেট্রলের লোকজন ছাড়াও পুলিশ সার্জেন্টরা আমার পরিচিত। তাদের বললে আমার গাড়ির সঙ্গে আমার ফ্ল্যাট পর্যন্ত যাবে। অপরাধ সংক্রান্ত স্পেশাল করেসপন্ডেন্টকে তারা খাতির করে।
এই সময় ডোরবেল বাজল। তারপর ষষ্ঠী গিয়ে দরজা খুলতেই প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে কে হালদার তেমনি সবেগে প্রবেশ করলেন এবং সোফায় বসে একটিপ নস্যি নিলেন।
কর্নেল বললেন–কিছু খবর এনেছেন আশা করি।
–আনছি। একটুখানি রেস্ট লই, তারপর কইতাছি। দেখে মনে হচ্ছিল গোয়েন্দাপ্রবর কারও সঙ্গে হাতহাতি করে এসেছেন। কারণ ডানহাতের তর্জনীতে একটুকরো ব্যান্ডেজ দেখতে পাচ্ছিলাম। একটু পরে তিনি যেন ধাতস্থ হলেন। তারপর বললেন- আপনার কথামতো সকালে আমার মক্কেলের বাড়ি গিছলাম। তারে কইছিলাম, বিকাল চারটায় তিনি য্যান বাড়ি থেইক্যা বারাইয়া দেশপ্রিয় পার্কের দিকে চলেন। আমি আপনার জইন্য ওয়েট করুম। আপনারে একখান ঠিকানা জিগাইমু। আপনি সেই সুযোগে লোকটার চেহারা আর পোশাকের ডেসক্রিপশান দেবেন। তো সেইমতো আমি লোকটার দেখলাম। পরনে প্যান্ট আর সোয়েটার ছিল। মাথায় একখান মাফলার জড়ানো ছিল। মুখে খোঁচা-খোঁচা গোঁফদাড়ি। কাঁধে কাপড়ের ব্যাগ ঝুলছে। কাজেই তারে চেনার অসুবিধা হয় নাই। সে খাড়াইয়া সিগারেট টানছিল। ক্যাপটেন সিংহ হাঁটলেন। সেও হাঁটল।
হালদারমশাই একটু চুপ করে থাকার পর আবার বললেন- দেশপ্রিয় পার্কে ক্যাপটেন সিংহ কিছুক্ষণ বইয়া ছিলেন। দেখলাম, লোকটাও একটু তফাতে খাড়াইয়া আছে। তারপর ক্যান্টেন সিংহ বাড়ি ফিরলেন। তখন পাঁচটা বাজে। সবখানে আলো জ্বলছে। লোকটা ক্যাপটেন সিংহের বাড়ি পর্যন্ত ফলো কইর্যা আবার দেশপ্রিয় পার্কের দিকে হাঁটা দিল। তখন অরে ফলো করলাম। সে একখান বাসে চাপল। আমিও চাপলাম। শরৎ বোস রোডে একখানে সে নামল। আমিও নামলাম। তারপর সে বাঁদিকে গলিতে ঢুকল। একটু পরে আরও ছোট্ট গলি। তারপর একটা বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ল। তত আলো ছিল না। যে তারে দরজা খুইল্যা দিল, সেই লোকটারে দেখি নাই। তবে বাড়িটা পুরানো। দোতলা। দরজা-জানালা বন্ধ।
তিনি আবার চুপ করলে বললাম–তা আপনার আঙুল কাটল কিসে?
