রিসিভার রেখে কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুট লাইটার জ্বেলে ধরালেন। বললাম-বাঃ! এই একটা কাজের কাজ করলেন। কিন্তু জাহাজবাবু শম্ভুনাথ চৌধুরির নামটা ওঁকে দিলেন না কেন?
কর্নেল ধোঁয়ার মধ্যে বললেন-জয়ন্ত! কান টানলে মাথাও আসে। …
লাঞ্চের পর সবে অভ্যাসমতো ডিভানে একটু ভাতঘুম দিতে শুয়েছি, হয়তো ঘুমিয়েও পড়েছিলাম, কর্নেলের ডাকে উঠে বসতে হল। উনি সহাস্যে বললেন–মুখে জলের ঝাপটা দিয়ে এসো। সাড়ে তিনটে বাজে। বিকেল চারটেতে ড. রথীশ মুখার্জির সঙ্গে দেখা করার কথা। উনি থাকেন ওল্ড বালিগঞ্জ প্লেসে। শিগগির রেডি হয়ে নাও…
ওল্ড বালিগঞ্জ প্লেসে একটা পাঁচিলঘেরা বাড়ির গেটের সামনে কর্নেল নামলেন। দেখলাম, তাঁকে সেলাম ঠুকে দারোয়ান গেট খুলে দিল। মন দিয়ে এগিয়ে কর্নেলের নির্দেশে একপাশে গাড়ি দাঁড় করালাম। দোতলার বারান্দা থেকে এক সৌম্যকান্তি বৃদ্ধ, মাথায় কর্নেলের মতো টাক, দাড়ি নেই, কিন্তু একটুখানি গোঁফ আছে, পরনে পাঞ্জাবির ওপর শাল জড়ানো, সহাস্যে বললেন–আসুন! আসুন কর্নেলসায়েব!
নিচে একটি মধ্যবয়সি লোক দাঁড়িয়ে ছিল। সে নমস্কার করে কর্নেল ও আমাকে নিচের ঘরে নিয়ে গেল। বসার ঘর। কিন্তু চারদিকে শিলিং অবধি র্যাকে বই ঠাসা। বসার ঘর থেকে সিঁড়ি উঠে গেছে দোতলায়। সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে কর্নেলের হাত ধরে সেই বৃদ্ধ ভদ্রলোক টানতে টানতে একটা ঘরে ঢোকালেন। এ ঘরটাও বইয়ে ঠাসা। এক প্রান্তে বিশাল সেক্রেটারিয়েট টেবিল। পিছনে জানালা। বিকেলের এক চিলতে রোদ এসে টেবিলে পড়েছে। বই ছাড়া ঘরে এখানে-ওখানে টুলের ওপর নানারকম মূর্তি চোখে পড়ল।
কর্নেল আমার সঙ্গে ড. মুখার্জির আলাপ করিয়ে দিলেন। ড. মুখার্জি সেই লোকটাকে শিগগির কফি আনতে বললেন। আমরা তার মুখোমুখি বসলাম।
ড. মুখার্জি মুচকি হেসে বললেন–আপনাকে দেখলেই রহস্যের গন্ধ পাই। এখনও পাচ্ছি।
কর্নেল হাসলেন। –এবারও লিপিরহস্য!
-কী লিপি?
–পার্চেমেন্টে লেখা কিউনিফর্ম লিপি।
ড. মুখার্জি সকৌতুকে চাপা স্বরে বললেন–গুপ্তধন? আমি বলি গুপ্তধন ইজ লুপ্তধন! দেখি আপনার পার্চমেন্ট।
কর্নেল বললেন-সমস্যা হল, মূল পার্চমেন্টটা হাতে পাইনি। ফোটোকপি এনেছি। বলে তিনি জ্যাকেটের ভিতর পকেট থেকে পার্চমেন্ট স্কোলের মতো গুটিয়ে রাখা একটা একই সাইজের ফোটো বের করে ওঁর হাতে দিলেন।
ড. মুখার্জি ব্যথভাবে ফোটোকপিটা সোজা করে টেবিলল্যাম্পের আলোয় চারটে কাচের পেপারওয়েট চারকোণে চাপা দিলেন। তারপর প্রকাণ্ড আতশ কাচ দিয়ে কিছুক্ষণ লিপিগুলোর, দিকে তাকিয়ে রইলেন।
কর্নেল তীক্ষ্ণদৃষ্টে ড. মুখার্জিকে লক্ষ্য করছিলেন। একটু পরে বললেন–পাঠোদ্ধার সম্ভব কি?
ড. মুখার্জি বললেন–ওপরে বামকোণে এই রেখাগুলো কারুকার্য নয়। আরবি লিপিতে লেখা আছে : আল-কাহিয়রা কাজিনাত আত্-তুহাত্। তার মানে, কায়রো মিউজিয়াম। আল-কাহিরোকে আমরা বলি কায়রো।
-তাহলে এটা কায়রো জাদুঘরের পার্চমেন্ট? কিন্তু লিপি তো কিউনিফর্ম! মিশরে এ লিপি তো প্রচলিত ছিল না বলেই জানি। আপনি অবশ্য আমার চেয়ে আরও বেশি জানেন।
এই সময় সেই লোকটা ট্রেতে কফি আর বিস্কুট নিয়ে এল। টেবিলে ট্রে একপাশে রেখে সে চলে গেল। ড. মুখার্জি বললেন–আপনারা কফি খান। আমি একটু আগে খেয়েছি। এক মিনিট! বলে তিনি পাশের র্যাক থেকে একটা প্রকাণ্ড বই দুহাতে টেনে আনলেন। তারপর সেটার সূচিপত্র। দেখে একটা পাতা বের করলেন। কয়েকটা পাতা উলটে তিনি হাসলেন। পেয়েছি এটা হিটাইট লিপি। বর্তমান তুরস্কের বোগাজ কই নামে একটা পাহাড়ি জনপদে প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ থেকে উনিশ শতকে পাপিরাসে লেখা একটা চিঠি উদ্ধার করা হয়েছিল। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্দশ শতকে হিটাইট অর্থাৎ হাত্তির রাজা সুপ্পিলুলিউমাসকে মিশরের কিশোর রাজা তুত-আংক-আমন অর্থাৎ তুতানখামেনের অকালমৃত্যুর পর তাঁর বিধবা বালিকাবধূ নেকারতিতি এই চিঠিতে অনুরোধ করেছিলেন, তিনি পুনর্বিবাহ করতে চান। কিন্তু মিশরে তার অনেক শত্রু আছে। তাই তিনি হাত্তিদেশের একজন বর চান। কিন্তু কর্নেলসায়েব! প্যাপিরাসে লেখা সেই চিঠির এটা একটা নকল কপি। মূল প্যাপিরাসে লেখা চিঠিটা নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ প্রত্নবিদ উইলিয়াম রাইট পার্চমেন্টে এই কপি করেন। …
.
০৭.
হিটাইট বা হাত্তিদেশের প্রাচীন ইতিহাস নিয়ে ড. মুখার্জির বক্তৃতা আমার ক্রমশ মাথা ধরিয়ে দিচ্ছিল। লক্ষ্য করছিলাম, কর্নেলও উশখুশ করছেন। পণ্ডিতদের পাল্লায় পড়লে এই দুরবস্থা থেকে রেহাই নেই। সন্ধ্যা সাতটা বাজতে চলেছে। কর্নেলের ইশারায় আমি কাচুমাচু মুখে বললাম স্যার! আমাকে কাগজের অফিসে ফিরতে হবে। আমি কর্নেলকে পৌঁছে দিয়ে চলে যাব। ভেবেছিলাম। তো জ্ঞানার্জনের লোভ সম্বরণ করতে পারলাম না।
ড. মুখার্জি বললেন–তা এতক্ষণ বলবেন তো? কর্নেলসায়েব আর একদিন আসুন। মিশরের বিধবা রাজবধূ নেকারতিতির সঙ্গে কোনও হিটাইট রাজপুত্রের সত্যি বিয়ে হয়েছিল কিনা, তার প্রমাণ মেলেনি। যাই হোক, কর্নেলসায়েব! এটা নকল কপি হলেও পার্চমেন্টটা কায়রো মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। সেই নকলের দামও কম নয়। মার্কিন ধনীরা লক্ষ ডলারে হাতাতে চাইবে। আপনি এটার মূল কপি কোথাও কি দেখেছেন?
