–দ্বিতীয় পয়েন্ট?
গোয়েন্দাপ্রবর চাপা স্বরে বললেন–ক্যাপটেন সিংহ আমার মক্কেল। কিন্তু তিনি আমারে কিছু কথা নিশ্চয় গোপন করছেন। আমার মনে হয় কী জানেন কর্নেল স্যার? কমু?
নিশ্চয়। কী মনে হয়, তা খুলে বলুন।
–অজয়ে রায় ক্যাপটেন সিংহেরে প্যাকেটখানা রাখতে দেন নাই। সিংহসায়েবই অজয়েন্দুবাবুর থেক্যা ওটা চুরি করছিলেন। জাহাজডুবির সময় অজয়েন্দুবাবুরে উনিই সম্ভবত আরব সমুন্দুরে ধাক্কা মাইরা ফেলছিলেন।
কর্নেল হাসলেন। তারপর অজয়ে রায় কোনও ভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন এবং ক্যাপটেন সিংহ তাঁকে জিনিসটা ফেরত দেননি বা দিতে পারেননি। কারণ প্যাকেটটা চুরি গিয়েছিল-
কর্নেলের কথার ওপর আমি বললাম–সময়ের কথা ভুলে যাচ্ছেন। জাহাজডুবি হয়েছিল দশবছর আগে। আর ক্যাপটেন সিংহের ঘর থেকে প্যাকেটটা শম্ভুনাথ হাতায় দু-বছর আগে। বেঁচে থাকলে অজয়েন্দুবাবু প্যাকেটটা এতবছর ধরে দাবি করতে আসেননি কেন?
হালদারমশাই বললেন-ক্যাপটেন সিংহ আমারে কিছু কথা গোপন করছেন।
কর্নেল বললেন-হ্যাঁ। আপনার অনুমান যুক্তিসঙ্গত। তবে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হল, এতদিন পরে ক্যাপটেন সিংহের গতিবিধির উপর যে নজর রেখেছে, সে কি অজয়েন্দুবাবুর চর? অজয়েন্দুবাবু কি বেঁচে গিয়েছিলেন এবং কোনও কারণে দশবছর চুপচাপ ছিলেন? কী সেই কারণ?
আমি বললাম–কিন্তু তিনি চর লাগিয়েছেন কেন? সরাসরি নিজে ক্যাপটেন সিংহের সামনে। যাচ্ছেন না কেন?
হালদারমশাই বললেন-কর্নেলস্যার! এইজন্যই কইছিলাম হেভি মিস্ট্রি। আমার মক্কেল আমারে কথা গোপন করলে আমি তারে ক্যানসেল কইরা দিমু।
কর্নেল বললেন–না হালদারমশাই! আপনার কেসে আমারও ইনটারেস্ট আছে। কেন আছে তা পরে বলব। আপাতত ক্যাপটেন সিংহের কাছে আপনার জানা দরকার, কে তাকে ফলো করে। আপনি ওঁকে রাস্তায় হেঁটে যে কৌশলে হোক, লোকটাকে দেখিয়ে দিতে বলবেন। সাবধান! উনি যেন পিছু ফিরে ইশারায় না দেখান। শুধু মুখের কথায় লোকটার বর্ণনা দেন। হালদারমশাই! চিয়ার আপ! আপনি চৌত্রিশ বছর পুলিশে চাকরি করেছেন। অবসরের সময় আপনি ছিলেন ডিটেকটিভ ইনস্পেকটার। আপনাকে বেশি কথা বলতে চাই না। তবে প্লিজ, হঠকারিতা করবেন না!
উত্তেজনায় গোয়েন্দাপ্রবরের গোঁফের ডগা তিরতির করে কাঁপছিল। তিনি বললেন-না, না কর্নেলস্যার। লোকটা ক্যাপটেন সিংহরে ফলো করে। এবার আমি অরে ফলো করুম।
বলেই তিনি উঠে দাঁড়ালেন। তারপর যাই গিয়া বলে সবেগে প্রস্থান করলেন।
কর্নেল ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুঝে টাকে হাত বুলোতে থাকলেন। একটু পরে টেলিফোন বাজল। অমনই কর্নেল চোখ খুলে সিধে হয়ে হাত বাড়ালেন টেলিফোনের দিকে। তারপর রিসিভার তুলে সাড়া দিলেন। -বলছি। …মি. হাটি! মর্নিং! বলুন। …হ্যাঁ। কাজি গোলাম হোসেন থাকেন। আমি সকালেই গিয়েছিলাম ওখানে!…কাজিসাহেবকে না পাওয়ারই কথা। …কেন একথা বলছি? মি. হাটি, লালবাজারের ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টকে বলুন, সাদা পোশাকে কাজিসাহেবের ডেরার কাছে যেন সারাক্ষণ অন্তত দুজন সশস্ত্র লোক মোতায়েন থাকে। …হা, ঠিক ধরেছেন। ওই কাজিসাহেবই পাজি জাহাজিবাবু। .. হ্যাঁ। শিয়োর। আর একটা কথা। আপনি লালবাজারকে বলুন, কড়েয়া থানা থেকেও যেন কাজিসায়েবের দিকে নজর রাখা হয়। .. হ্যাঁ। ওটা কড়েয়া থানা এলাকায় পড়ে। …ঠিক আছে। উইশ ইউ গুড লাক!…
রিসিভার রেখে কর্নেল আবার ধ্যানস্থ হলেন। বললাম–তাহলে আমরা চলে আসবার পরই লালবাজার থেকে অফিসার গিয়েছিলেন?
–হুঁ।
-জাহাজিবাবু মহা ধূর্ত। ও এখন কিছুদিন গা ঢাকা দেবে। পাড়ায় নিশ্চয় ওর পোয্য গুণ্ডা-মস্তান আছে!
–অজয়েন্দুবাবুর ব্যাপারটা যদি সত্যি হয়, অর্থাৎ উনি যদি বেঁচে থাকেন, তাহলে এতদিন কোথায় ছিলেন? উনি বেঁচে না থাকলে অন্য কেউ কি পার্চমেন্টটার কথা জানত? সে-ই কি ক্যাপটেন সিংহের ওপর নজর রেখেছে, যাতে উনি জিনিসটা কাকেও বেচলে সে জানতে পারবে?
–হুঁ।
এবার আমার জ্ঞানবুদ্ধির ফিরে এল। কর্নেলের এই মানে উনি আমার কথা শুনছেন না। এই হুঁ-র সঙ্গে আমি দীর্ঘকাল পরিচিত। তাই চুপ করে গেলাম। খবরের কাগজ টেনে নিয়ে পড়ার চেষ্টা করলাম।
কিছুক্ষণ পরে কর্নেল হঠাৎ চোখ খুলে সিধে হয়ে টেবিলের ড্রয়ার টানলেন। একটা নোটবই বের করে পাতা ওলটাতে থাকলেন। তারপর টেলিফোনের রিসিভার তুলে ডায়াল করলেন। সাড়া এলে ইংরেজিতে বললেন–ইন্ডিয়ান শিপিং কর্পোরেশন?…আমি ম্যানেজিং ডাইরেক্টর মি. অসীম সোমের সঙ্গে কথা বলতে চাই। …আমার নাম কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। ইয়া! কলোনেল!
প্রায় তিন মিনিট পরে সাড়া এল, তা বুঝলাম। কর্নেল বললেন–মি. সোম!…হা, সেই সাদা দাড়িওয়ালা বৃদ্ধই বটে! আমি আপনার সাহায্যপ্রার্থী। …ধন্যবাদ। তবে বিষয়টা একটু জটিল। আন্দাজে ঢিল ছোঁড়ার মতো। আপনি নোট করে নিলে ভালো হয়। …দশবছর আগেকার ঘটনা। জাহাজের নাম জানি না। তবে দেশি জাহাজ। কাজেই আপনাদের কাছে পুরোনো রেকর্ডে খোঁজ মিলতে পারে। পোর্ট সইদ থেকে জাহাজটা আসছিল বোম্বে। মিশরের উৎকৃষ্ট তুলো বোঝাই ছিল। … হ্যাঁ। জাহাজটার তলায় কী ভাবে ফাটল ধরে আরব সাগরে ডুবে গিয়েছিল। সেই জাহাজের ক্যাপটেনের নাম ছিল এস এন সিংহ। সৌমেন্দ্রনাথ সিংহ। এটাই জাহাজটা শনাক্ত করার একটা পয়েন্ট। …ও কে! সেই জাহাজে একজন অফিসার ছিলেন অজয়েন্দু রায়। তিনি নাকি বোম্বে থেকে উদ্ধারকারী জাহাজ সেখানে পৌঁছুনোর আগেই সমুদ্রে তলিয়ে যান। .না। লাইফ জ্যাকেট পরার সুযোগ পেয়েছিলেন কিনা জানি না। মোট কথা তিনি নাকি নিখোঁজ হয়ে যান। ..ক্যাপটেন সিংহ এখন অবসরপ্রাপ্ত। আমার বয়সি বৃদ্ধ। তাকে আমি চিনি। তার কাছেই এই ঘটনা শুনেছি। … হ্যাঁ। তিনিই বলেছেন, অজয়েন্দু রায় আরব সাগরে ডুবে মারা পড়েন। কিন্তু আমার জানার বিষয় শুধু একটা। মাত্র একটা। ..হা অজয়ে রায় সম্পর্কে আপনাদের পুরোনো রেকর্ডে কোনও তথ্য আছে কিনা। থাকলে কী সেই তথ্য?…তা সময় লাগুক। প্লিজ মি. সোম! এটা খুব জরুরি। … হ্যাঁ। একটা কে আমার হাতে এসেছে বইকি। যথাসময়ে আপনাকে জানাব। …ধন্যবাদ মি. সোম। অসংখ্য ধন্যবাদ। …
