অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপটেন এস এন সিংহ সাউদার্ন অ্যাভিনিউতে বাড়ির দোতলায় একা থাকেন। তার একমাত্র ছেলে থাকে আমেরিকার বস্টনে। সে সেখানে বিয়ে করেছে। বছরে একবার এসে বাবাকে দেখে যায়। ক্যাপটেন সিংহের রান্না আর কাজকর্ম করে দিয়ে যায় একজন ঠিকে ঝি। এই মেয়েটি থাকে লেকের ধারে একটা বস্তিতে। রাস্তায় দিকের ঘরটা ক্যাপটেন সিংহের ড্রয়িং রুম। দেশবিদেশের নানারকম শিল্পদ্রব্যে সাজানো। ভিতরের দরজা দিয়ে গেলে শোবার ঘর। সেখানে আলমারি-ঠাসা বই আর দেওয়ালে টাঙানো আছে তার পারিবারিক ছবি। তৃতীয় ঘরটা কিচেন আর ডাইনিং। কিচেনের অংশটা পাটিশন করা আছে।
কথায়-কথায় ক্যাপটেন সিংহ বলেছেন, সারাজীবন ঘরছাড়া হয়ে কাটিয়েছেন। তাই তার বন্ধুবান্ধব নেই। আত্মীয়-স্বজন কলকাতার নানা জায়গায় থাকেন। তাদের সঙ্গে তার যোগাযোগ কম। অবসরজীবনে তিনি স্থানীয় একটা ক্লাবের সদস্য হয়েছিলেন। ক্লাবটা উঠে গেছে। তবে পাড়ায় কয়েকজন তাঁর বয়সি ভদ্রলোকের সঙ্গে বন্ধুতা আছে। প্রতিদিন ভোরে তাদের সঙ্গে লেকের ধারে হাঁটাহাঁটি করে আসেন। ঠিকে ঝি আসে বেলা আটটা-সাড়ে আটটায়।
হালদারমশাই জানতে চেয়েছিলেন, গতিবিধি জানার জন্য তার পিছনে লোক লাগানোর কোনও কারণ আছে বলে কি তিনি মনে করেন? ক্যাপটেন সিংহ বলেন, তেমন কোনও কারণ তিনি খুঁজে পাচ্ছেন না। তবে বছর দশেক আগে তার এক সহকর্মী তাকে একটা প্যাকেট রাখতে দিয়েছিলেন। তখন তিনি জাহাজে ছিলেন। জাহাজটা আসছিল মিশরের পোর্ট সইদ বন্দর থেকে বোম্বে। তারপর কলকাতা। তার সেই সহকর্মীর নাম ছিল অজয়েন্দু রায়। বোম্বে আসার পথে আরব সাগরে জাহাজটার তলায় ফাটল ধরে ডুবতে থাকে। বিপদসংকেত পাঠান তিনি। বোম্বে বন্দর থেকে উদ্ধারকারী জাহাজ পৌঁছোয়। কিন্তু তখন জাহাজটার পিছন দিক ডুবে যায়। অনেক নাবিক প্রাণ হারায় জলের তলায়। মোড়কটা ক্যাপটেন সিংহের ব্যাগে ছিল। ব্যাগটা তিনি সবসময় কাছে। রাখতেন। তিনি উদ্ধার পান। কিন্তু অজয়েন্দু রায়ের আর খোঁজ পাননি। জাহাজে মিশরের তুলো বোঝাই ছিল। সব নষ্ট হয়ে যায়। বোম্বেতে কিছুদিন থাকার পর ক্যাপটেন সিংহ তার কোম্পানির আর একটা ছোটো মালবাহী জাহাজ নিয়ে কলকাতা বন্দরে আসেন। তারপর প্যাকেটটা বাড়িতে রেখে খিদিরপুর ডকে নিজের কাজে ফিরে যান।
অজয়েন্দু রায়ের অধীনে একজন অফিসার ছিলেন। তাঁর নাম শম্ভুনাথ চৌধুরি। তিনি ক্যাপটেন সিংহের কাছে অজয়েন্দুবাবুর গচ্ছিত প্যাকেটের কথা কীভাবে জানতে পেরেছিলেন, এটাই আশ্চর্য! প্রায়ই এই লোকটা তার কাছে প্যাকেটটা দাবি করত। অন্যের জিনিস তিনি কেন দেবেন শম্ভুবাবুকে? তিনি ওঁকে ধমক দিয়ে বলতেন, তেমন কোনও প্যাকেট অজয়েন্দুবাবু তাঁকে দেননি। তারপর তো চাকরি থেকে ক্যাপটেন সিংহ অবসর নেন। দু-বছর আগে একদিন তিনি ব্যাংকে গিয়েছিলেন। বাড়ি ফিরে তাঁর ঠিকে-ঝি সুশীলার কাছে শোনন, এক ভদ্রলোক তার খোঁজে এসেছিলেন। তাঁকে সুশীলা ড্রয়িংরুমে বসিয়ে রেখেছিল। তারপর কখন ভদ্রলোক চলে গেছেন, সুশীলা দেখতে পায়নি। ক্যাপটেন সিংহ সুশীলাকে বকাবকি করেন। তবে সুশীলার দোষ ছিল না। তাঁকে তিনি বিশ্বাস করেন। তাই বাড়ির চাবি তাকে দিয়ে যেতেন। কারণ সুশীলা সব ঘর পরিষ্কার করত। মেঝে মুছত। যাই হোক, দিনে তার কথাটা মাথায় আসেনি। রাত্রে তিনি সন্দেহবশে বেডরুমে তার খাটে বিছানার তলা খোঁজেন। প্যাকেটটা ম্যাট্রেসের তলায় রাখা ছিল। সেটা উধাও। হয়ে গেছে।
সুশীলার কাছে আগন্তুক ভদ্রলোকের চেহারার যে বিবরণ তিনি পান, তাতে তিনি চিনতে পারেননি ভদ্রলোককে। তার মুখে ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি ছিল। পরনে টাই-সুট ছিল। তিনি পাইপ খাচ্ছিলেন।
এমন সাহেব-মানুষকে সুশীলা ড্রয়িংরুমে বসতে দেবে, এটা স্বাভাবিক। ব্যাংকটা কাছেই। কাজেই ক্যাপটেন সিংহের শিগগির বাড়ি ফেরার কথা। তবে তারপর থেকে সুশীলার হাতে চাবি দিয়ে তিনি বেরোন না। সুশীলা ঘর পরিষ্কার এবং রান্না করে চলে যাওয়ার পর তিনি দরকার হলে বাইরে যান। …
হালদারমশাইয়ের কথা শুনে উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলাম। কিন্তু কর্নেলের কথা বলার আগে আমার কোনও কথা বলা উচিত হবে না। চন্দ্রপুরের জাহাজিবাবুর সঙ্গে হালদারমশাইয়ের মক্কেলের একটা যোগসূত্র তাহলে পাওয়া গেল। ক্যাপটেন সিংহকে অজয়ে রায় যা রাখতে দিয়েছিলেন, তা জাহাজবাবুই যে ছদ্মবেশে চুরি করে নিয়ে যায়, তা-ও স্পষ্ট হল। জিনিসটা যে পিতলের নলে রাখা পার্চমেন্ট, তা-ও বোঝা গেল। শুধু বুঝতে পারলাম না, এতদিন পরে কে ক্যাপটেন সিংহের গতিবিধির ওপর নজর রেখেছে? তার উদ্দেশ্যই বা কী?
হালদারমশাই ব্রেকফাস্ট করে এসেছেন। কর্নেল ও আমি ব্রেকফাস্ট সেরে নিলাম। তারপর কফি আনল ষষ্ঠীচরণ। হালদারমশাই ফুঁ দিয়ে কফিতে চুমুক দিতে দিতে বললেন–দুইখান পয়েন্ট আমার মাথায় আইয়া পড়ছে। কমু?
কর্নেল বললেন-বলুন।
সুশীলা রোজ ঘর পরিষ্কার করত। সে নিশ্চয় প্যাকটেখান বিছানার তলায় দেখছিল। তার লগে শম্ভুনাথ চৌধুরি ছদ্মবেশে গোপনে যোগাযোগ করছিল। সুশীলা ক্যাপটেন সিংহেরে মিথ্যা কইছে। গোপনে সেই টাকার লোভে প্যাকেটখান শম্ভুনাথের দিছে। ক্যাপটেন সিংহ সুশীলার বিশ্বাস কইরা ঠকছেন। এই হইল গিয়া প্রথম পয়েন্ট।
