কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন-তুমি কী খুঁজছিলে, জানি। ধৈর্য ধরো ডার্লিং! তুমিই ওই খুনের খবর অদূর ভবিষ্যতে জমিয়ে লিখবে। দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার প্রচারসংখ্যা এক লাফে বেড়ে যাবে।
বললাম–কিন্তু আপনি তো খুনের জায়গা থেকে চলে এলেন! আপনিই বলেন, খুনির পিছনে দৌডুনোর আগে যে খুন হয়েছে, তার পিছনে দৌডুনো উচিত।
কর্নেল হাসলেন-দৌড়ুনোর জন্যই তো কলকাতা ফিরে এসেছি।
–দীপনারায়ণবাবুর খুনের সূত্র এই বিশাল শহর কলকাতায় খুঁজে পাবেন? খড়ের গাদায় উঁচ খোঁজার ব্যাপার হবে না?
কর্নেল চুপচাপ কফি শেষ করে বললেন-সওয়া আটটা বাজে। এখনই একবার বেরিয়ে পড়া যাক। শিগগির ঘুরে আসব। হালদারমশাইয়ের ন-টা নাগাদ আসবার কথা। কুইক জয়ন্ত!
কর্নেলকে এসব ক্ষেত্রে প্রশ্ন করা বৃথা। শুধু বলবেন–চলো তো! আমি পথ দেখাব।
নিচে কর্নেলের একটা খালি গ্যারাজ ঘর আছে। একসময় ওঁর একটা লালরঙের ল্যান্ডরোভার গাড়ি ছিল। পুরোনো গাড়ি। বারবার ঝামেলা বাধাত। তাই বিক্রি করে দিয়েছিলেন। সেই গ্যারাজে আমার ফিয়াট গাড়িটা থাকে।
কর্নেল গ্যারাজের তালা খুলে দিলেন। আমি গাড়ি বের করলাম। কর্নেল আমার বাঁপাশে বসে বললেন–বাইনোকুলার বা ক্যামেরার দরকার নেই। শুধু দর্শন করে আসব।
দারোয়ান সেলাম ঠুকে গেট খুলে দিল। তারপর কর্নেলের নির্দেশে অলিগলি ঘুরতে ঘুরতে পার্ক স্ট্রিট, তারপর থিয়েটার রোডে পৌঁছুলাম। থিয়েটার বোড় আর সার্কাস অ্যাভিনিউয়ের মধ্যে একটা গলিরাস্তার যোগাযোগ লক্ষ্য করলাম। সেই গলিতে কিছুটা এগিয়ে কর্নেল বাঁদিক ঘেঁষে গাড়ি দাঁড় করাতে বললেন। গাড়ি থেকে নেমে এতক্ষণে বুঝলাম, দীপনারায়ণবাবু যে ফ্ল্যাটে থাকতেন, সেই ফ্ল্যাটে এখন জাহাজিবাবু বাস করে। এই ঠিকানাটা দীপনারায়ণবাবুর বোন সুনয়নী দেবী দিয়েছিলেন।
কাছে গাড়ি মেরামতের গ্যারাজে গিয়ে কর্নেল নাম্বার জিজ্ঞেস করে এলেন। তারপর আমাকে তিনি অপেক্ষা করতে বলে একটা বাড়ির খোলা দরজা দিয়ে ঢুকে গেলেন। সামনে দোতলায় ওঠার সিঁড়ি দেখা যাচ্ছিল। কর্নেল সিঁড়িতে ওঠার সময় এক মুসলিম ভদ্রলোক নেমে আসছিলেন। তাঁর মাথায় টুপি। মুখে দাড়ি। পরনে পাঞ্জাবি আর লুঙি। গলায় একটা মাফলার জড়ানো। কলকাতায় ডিসেম্বরেও শীত তীব্র নয়। কর্নেল তাকে কিছু জিজ্ঞেস করলে তিনি আঙুল তুলে কিছু দেখিয়ে নেমে এলেন। তারপর আমার দিকে একবার তাকিয়ে সোজা সার্কাস অ্যাভিনিউয়ের দিকে চলে গেলেন। তার হাতে একটা ব্রিফকেস ছিল।
একটু পরে কর্নেল নেমে এলেন। তারপর দরজা দিয়ে বেরিয়ে বললেন-ঠিকানা ঠিকই আছে। কিন্তু ওই দু-কামরা ফ্ল্যাটে থাকেন কাজি গোলাম হোসেন। পাশের ফ্ল্যাটের এক ভদ্রলোক বললেন-উনি তো এখনই বেরিয়ে গেলেন। না-ওখানে এক হিন্দু ভদ্রলোক অনেক বছর আগে থাকতেন। তারপর ফ্ল্যাটটা খালি ছিল। মালিক থাকেন দিল্লিতে। ওই ফ্ল্যাট তিনিই কাজিসাহেবকে নাকি ভাড়া দিয়েছেন। কাজিসাহেব একা থাকেন। কারও সঙ্গে মেশেন না। বদরাগি লোক বলে তাকে সবাই এড়িয়ে চলেন।
কর্নেল গাড়ির সামনে দিয়ে ঘুরে আমার বাঁদিকে বসতে যাচ্ছেন, সেইসময় তাঁর জ্যাকেটের পিছনে এক টুকরো কাগজ আঁটা দেখতে পেলাম। কাগজটা ছাড়িয়ে নিয়ে বললাম–এটা আপনার পিঠে আঠা দিয়ে আটকানো ছিল।
কর্নেল কাগজটা ছিনিয়ে নিয়ে বললেন-জয়ন্ত! আমাকে জাহাজিবাবু বোকা বানিয়ে চলে গেছে পাশ দিয়ে। যাবার সময় আমার পিঠে এটা আটকে দিয়ে গেছে। এতে লেখা আছে, দ্বিতীয়বার এলেই মারা পড়বে।
.
০৬.
অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে কর্নেল দোমোহানি সেচবাংলোয় পাওয়া হুমকির চিঠিটার সঙ্গে আজকের চিরকুটের লেখা আতশ কাচের সাহায্যে পরীক্ষা করেছিলেন। দুটো লেখাই একজনের। কর্নেল চিঠি আর চিরকুটটা টেবিলের ড্রয়ারে রেখে ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে চুরুট টানছিলেন। চোখ যথারীতি বন্ধ।
বলেছিলাম–জাহাজিবাবু লিখেছিল আপনাকে চেনে। তাহলে এই রিস্ক নিল কেন সে? ওকে তো আবার ওই ফ্ল্যাটে ফিরতে হবে। লোকটা যদি সত্যিই আপনার প্রকৃত পরিচয় জেনে থাকে, তাহলে তার এ-ও জানার কথা, আপনি তার পিছনে পুলিশ লাগিয়ে দেবেন।
কর্নেল বলেছিলেন–পুলিশ নিজে থেকেই ওখানে হানা দেবে। কারণ চন্দ্রপুর থানার ওসি রাজেনবাবু নিশ্চয় লালবাজার ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টে খবর পাঠিয়েছেন। তুমি সাংবাদিক। তোমার জানার কথা, পুলিশ সহজে কোনো বাড়তি কাজে হাত লাগায় না। পুলিশেরও আজকাল অনেক অসুবিধে আছে। কোথায় হাত দিতে গিয়ে কোন রাজনৈতিক গার্জেনের ছোবল খাবে!
-কেন? আপনি ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের ডেপুটি কমিশনার আপনার বিশেষ স্নেহভাজন মি. অরিজিৎ লাহিড়িকে ব্যাপারটা জানিয়ে দিন!
এখনও সে-সময় আসেনি। আমি চাই না পুলিশ এখনই জল ঘোলা করুক। তাতে মূল রহস্য আর কোনওদিনই জানা যাবে না। আমাকে নিজের পদ্ধতিতে এগোতে হবে। হালদারমশাই আসুন। তারপর পুরো ব্যাকগ্রাউন্ডটা কী রকম, তা হয়তো বোঝা যাবে। …
প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে কে হালদারের আবির্ভাব ঘটল সাড়ে নটায়। সবেগে ঢুকে ধপাস করে বসে বললেন-হেভি মিস্ট্রি। তাই এটু দেরি হইয়া গেল।
কর্নেল বললেন- বলুন হালদারমশাই!
হালদারমশাই একটিপ নস্যি নিয়ে যা বললেন, তা এই :
