বলে তিনি জ্যাকেটের ভিতর পকেট থেকে তিতলিপুরের রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া ব্রোঞ্জের তক্তিটা বের করলেন। এবার আমি কৌতূহলী হয়ে উঁকি দিলাম। তক্তিটার দুই পিঠে যা খোদাই করা আছে, বইয়ের ছবিতেও হুবহু তা-ই আছে। অতএব আমাকে সল্ট লেকের ফ্ল্যাটে ফেরার কথা ভুলতে হল। বললাম–কী সব লেখা আছে, বইয়ে তা পাচ্ছেন?
কর্নেল কিছুক্ষণ পরে মুখ তুলে হতাশ ভঙ্গিতে বললেন–নাঃ! নেকারতিতির তক্তি ছিল সোনার। এটা ব্রোঞ্জের। তার মানে এটা নকল জিনিস। বিদেশের কিউরিয়ো শপে এরকম নকল জিনিস বা রেপ্লিকা বিক্রি হয়। তুমি দিল্লির লালকেল্লায় নিশ্চয় দেখেছ, মিনি তাজমহল বিক্রি হয়। জয়ন্ত! এটা নিছক রেপ্লিকা। মূল সোনার তক্তিতে কী লেখা ছিল, পণ্ডিতেরা তার পাঠোদ্ধার করেছেন।
বললাম–কী লেখা আছে, তা নিয়ে মাথাব্যথা করে কী লাভ? আপনি পার্চমেন্টে লেখা কিউনিফর্ম লিপির পাতা খুঁজে দেখুন!
কর্নেল বললেন–কিউনিফর্ম লিপি পশ্চিম এশিয়া, ইরাক আর পারস্যে প্রচলিত ছিল। নানা ভাষা নানারকমের পেরেক চিহ্নের সমাবেশ। কাজেই এক্ষেত্রে আমাকে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিতে হবে।
-মূল পার্চমেন্টটা দেখাবেন নাকি?
–মোটেও না। ওটার একটা ফোটোকপি করে নিয়ে যাব। বলব, একটা বইয়ে পেয়েছি। তবে বলা যায় না, কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরুতে পারে।
–সাপ মানে?
-তুমি জানো, আমি ইনটুশনের কথা বলি। ওটা একটা বিস্ময়কর বোধ। অনেক মানুষের মধ্যে এটা লক্ষ্য করেছি। তবে আমার সামরিক জীবনে গেরিলাযুদ্ধ শেখার সময় আমার এই বোধটা জন্মেছিল। বহুবার দেখেছি, কোনও বিপদ আসন্ন, তা হঠাৎ আমি টের পেয়েছি। চামড়ায় লেখা কথাগুলো অর্থাৎ, প্রাচীন পার্চমেন্ট পেতলের নল থেকে বের করেই গতরাতে দোমোহানির বাংলোতে মনে হয়েছিল, এটা বিপজ্জনক।
হাসতে হাসতে বললাম-ওটাও ব্রোঞ্জের তক্তির মতো নকল নয় তো?
-পার্চমেন্টটা আতশকাচে পরীক্ষা করে মনে হয়েছে খুব পুরোনো। অনেক জায়গায় পোকায় কেটেছে। ওতে কীটনাশক পাউডার মাখিয়ে রাখতে হবে।
বলে কর্নেল টেলিফোনের রিসিভার তুলে ডায়াল করলেন। সাড়া এলে বললেন-কর্নেল নীলাদ্রি সরকার বলছি। ড. মুখার্জি আছেন কি?…ড. মুখার্জি! নমস্কার! আশা করি সুস্থ শরীরে আছেন?…এ বয়সে ওরকম একটু-আধটু অসুখ-বিসুখ হয়েই থাকে। আমারও হয়। …মিলিটারি বডি? বাঃ! বলেছেন ভালো। কিন্তু এবার বডি ছেড়ে মিলিটারি অংশটা পালিয়ে যাচ্ছে। যাই হোক, কালবিকেল চারটে নাগাদ আপনার একটু সময় হবে?..ব্যাপার আপনার কাছে সামান্য। বিশ্বখ্যাত পণ্ডিত আপনি। …না, না! শুনুন! একটা গুরুতর সমস্যায় পড়েছি। আপনার সাহায্য চাই। ..ওকে, ওকে ড. মুখার্জি! ধন্যবাদ।
কর্নেল রিসিভার রেখে বললেন–ড. রথীশ মুখার্জির নাম শুনেছ?
বললাম-না। কে উনি?
-এটাই হয়, জয়ন্ত! প্রকৃত বিদ্বানরা প্রচারবিমুখ। তারা কাজ করেন আড়ালে। আর তাদের কাজের ফল ভোগ করে অন্য সব মানুষ।
আমি এবার উঠি, কর্নেল! বরং সকালে আসব।
কর্নেল হাসলেন। -তুমি সল্ট লেকের ফ্ল্যাটে ফিরেই হয়তো দেখবে, তোমার কাগজের কর্তৃপক্ষ তোমাকে কোথাও কোনও হাঙ্গামার খবর আনতে নির্দেশ দিয়েছেন। অতএব এই বৃদ্ধের ডেরায় লুকিয়ে থাকো!
–আমার চাকরি এবার যাবে!
–যাবে কী বলছ? তোমাদের চিফ রিপোর্টারকে আমি জানিয়ে দেব, একটা রোমাঞ্চকর স্টোরির পিছনে তোমাকে লড়িয়ে দিয়েছি।
কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্টে আমাকে এ ধরনের ঘটনার সময় রাত কাটাতে হয়। তাই এখানে আমার এক প্রস্থ পোশাক-আশাক আর দরকারি জিনিসপত্র রাখা আছে। কর্নেল প্রায়ই আমাকে সল্ট লেকের ফ্ল্যাটটা ভাড়া দিয়ে তার ডেরায় থাকতে বলেন। এ যাবৎ রাজি হইনি। কারণ, কখন নিছক কোনও বিরল প্রজাতির অর্কিডের জন্য ওঁর পিছনে পাহাড়-জঙ্গলে ছুটোছুটি করে বেড়াতে হবে। …
সকালে ষষ্ঠীচরণের ডাকে ঘুম ভেঙেছিল আমার। বাসিমুখে চা অর্থাৎ বেডটি খাওয়ার অভ্যাস আছে। বেডটি দিয়ে ষষ্ঠী হাসল। -বাবামশাই এখনও ছাদের বাগানে কাকের সঙ্গে যুদ্ধ করছেন। একটা হতভাগা কাক ক্যাকটাসের মধ্যে আটকে গিয়ে কেলেঙ্কারি। হাজার-হাজার কাক এসে বাবামশাইকে চাদ্দিক থেকে ঘিরে ধরেছিল। আমি ছুটে গিয়ে পটকা ফাটালুম। তারপর আধমরা কাকটা বের করে দত্তবাড়ির নিমগাছে ছুঁড়ে দিলাম। আপনি তখন বেঘোরে ঘুমুচ্ছেন। বাবামশাইয়ের দু-হাত তুলে নাচন-কোঁদন দেখলেওঃ! কুরুক্ষেত্তর!
বলে সে চলে গেল। ছাদের বাগানে কর্নেল একটা কাকতাড়ুয়া বসিয়েছিলেন। সেটা কি নেই?
প্রাতঃকৃত্যের পর পোশাক বদলে ড্রয়িংরুমে গেলাম। একটু পরে কর্নেল এলেন। -মর্নিং জয়ন্ত!
-মর্নিং বস! শুনলাম, আপনি কাকেঁদের সঙ্গে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে নেমেছিলেন?
কর্নেল অট্টহাসি হেসে ইজিচেয়ারে বসলেন। -ষষ্ঠীর খবর! ষষ্ঠী তিনটে হাইড্রোজেন বোমা ফাটিয়েছে। অতএব যোদ্ধা সে-ই।
একটু পরে ষষ্ঠী গম্ভীর মুখে কফি আর স্ন্যাক্সের ট্রে রেখে গেল। কর্নেলের হাতে এদিনের ইংরেজি-বাংলা একগাদা খবরের কাগজ ছিল। সোফার কোণে ছুঁড়ে ফেলে কফিপানে মন দিলেন। আমি কাগজগুলোয় দ্রুত চোখ বুলিয়ে তিতলিপুরের খুনের খবর খুঁজলাম। মফস্সলের সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর ছাপানোর জায়গা থাকলে ছাপা হবে। নয়তো দুমড়ে টেবিলের তলায় ফেলা হবে। নেতাগোছের কেউ খুন হলে অবশ্য অন্য কথা। দীপনারায়ণবাবুর পূর্বপুরুষ জমিদার ছিলেন। কিন্ত তিনি নিতান্ত সাধারণ মানুষ ছিলেন।
