বললাম–শুনছি তো।
-না। তোমার মুখের লেখা পড়ে টের পাচ্ছি, তুমি হালদারমশাইকে ডিসটার্ব করতে চাও। প্রাইভেট ডিটেকটিভ খিখি করে হেসে বললেন-জয়ন্তবাবু তার নিউজপেপারের জন্য একখান স্টোরির আশা করতেই পারেন। কিন্তু এখন না।
কর্নেল বললেন–এই আপনার কেস?
-হ্যাঁ কর্নেল স্যার! তবে আমার অফিসে আসবার সময় ক্যাপটেন সিংহ ট্যাক্সি ধরছিলেন। কইলেন, অনেক অলিগলি দিয়া আসছেন। কেউ তারে ফলো করে নাই। কিংবা করছিল। কিন্তু কইলকাতার রাস্তায় কারেও গাড়ি লইয়া ফলো করা কঠিন।
কিন্তু কেউ ক্যাপটেন সিংহকে কেন ফলো করবে? তার পিছনে নিশ্চয় কোনও কারণ আছে। আপনি ওঁকে জিজ্ঞেস করেননি?
-হঃ! করছি। উনি কইলেন, কিছু বুঝতে পারেন না। আর কইলেন, লোকটা হয়তো অনেকদিন ওনারে ফলো করছে। উনি লইক্ষ্য করেন নাই। কে ওনারে ফলো করছে আর তার উদ্দেশ্য কী, আমারে তা যেভাবে হোক, জানতে হবে।
-ক্যাপটেন সিংহের সন্দেহ তার ফোন কেউ ট্যাপ করেছে। কাজেই ফোনে তাঁর সঙ্গে কথা বলা ঠিক হবে না। এখন সাড়ে সাতটা বাজে। শীতকাল বলে বেশি রাত্রি মনে হবে। আমি বলি কী, আপনি এখনই ক্যাপটেন সিংহের বাড়ি চলে যান। ওঁর বাড়িতে কে থাকে, ওঁর ঘরের বিশেষ কোনও জিনিসপত্র যদি চোখে পড়ে, এইসব জেনে নিন। তারপর কাল সকাল ন-টার মধ্যে এসে আমাকে জানাবেন। জাহাজের ক্যাপটেন কত-কত দেশ ঘুরে বেড়ান। তার অভিজ্ঞতাও বিচিত্র নয়।
ষষ্ঠী হালদারমশাইয়ের জন্য বেশি দুধ মেশানোস্পেশাল কফি আনল। গোয়েন্দাপ্রবর কফির পেয়ালা তুলে ফুঁ দিয়ে কফি পান করতে থাকলেন। লক্ষ্য করলাম, উত্তেজনায় ওঁর গোঁফের দুই ডগা মাঝেমাঝে তিরতির করে কেঁপে উঠছে।
কফি শিগগির শেষ করে তিনি বললেন–লোকটারে যে অন্য কেউ ক্যাপটেন সিংহের পিছনে ফলো করতে কইছে, এমনও হইতে পারে।
কর্নেল বললেন–এটা কি আপনার ধারণা, নাকি ক্যাপটেন সিংহ আপনাকে এ কথা বলেছেন?
উনি কইছিলেন। যে লোকটা ওনারে ফলো করে, তার চেহারা সাধারণ লোকের মতো। রোগা। পরনে যেমন-তেমন পোশাক। তবে কখনও প্যান্ট-সোয়েটার পরে। কখনও ধুতি-পাঞ্জাবির ওপর চাদর থাকে। কখনও পাজামা-পাঞ্জাবি-জহরকোট আর মাথায় টুপি। কিন্তু একই লোক।
-ক্যাপটেন সিংহ আপনাকে কী করতে বলেছেন?
-লোকটা কে, তার নাম-ঠিকানা খুইজ্যা বার করতে হইব। ক্যান যে ওনারে ফলো করে তা-ও যেভাবে হোক, তার কাছ থেইক্যা আদায় করতে হইব। তার পিছনে যে আছে, তারও নাম-ঠিকানা ওনার চাই। হেভি কেস!
কর্নেল হাসলেন। এবং আপনি বলছিলেন হেভি মিস্ট্রি! তা কত টাকার কন্ট্রাক্ট হয়েছে এই কাজে?
-হালদারমশাই চাপা স্বরে বললেন–মক্কেল নিজেই পাঁচহাজার টাকা দেবেন। অ্যাডভান্স পাঁচশো। কন্ট্রাক্ট পেপারে সই করছেন। যে ফলো করে, তারে আমি কাইলই ধরুম।
–তাড়াহুড়ো করবেন না হালদারমশাই! রাস্তায় যেন গণ্ডগোল বাধাবেন না। আমার মনে হচ্ছে, কেউ ক্যাপটেন সিংহের গতিবিধির ওপর কোনও বিশেষ উদ্দেশ্যে নজর রেখেছে।
ঘড়ি দেখে গোয়েন্দাপ্রবর যাই গিয়া বলে সবেগে বেরিয়ে গেলেন। …
কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন–জয়ন্ত! এবার বলো তুমি কী বলার জন্য উশখুশ করছিলেন।
বললাম–চন্দ্রপুরের জাহাজিবাবু আর হালদারমশাইয়ের মক্কেল ক্যাপটেন সিংহ–এই দুজনের মধ্যে জাহাজের ব্যাপারে সম্পর্ক আছে। দুজনেই জাহাজে নানা দেশে ঘুরেছেন।
–হ্যাঁ চন্দ্রপুরের জাহাজিবাবু শম্ভুনাথ চৌধুরি যে বহুমূল্য প্রত্নসম্পদ হাতিয়ে কেল্লাবাড়ির জঙ্গলে লুকিয়ে রেখেছিল, তার প্রমাণ আমাদের হাতে এসে গেছে।
-আচ্ছা কর্নেল, ওই ব্রোঞ্জের তক্তিটাও তো একটা বহুমূল্য প্রত্নসম্পদ। কিন্তু ওটা দীপনারায়ণবাবু পেলেন কোথায়? আমার অনুমান, শম্ভু চৌধুরিই ওটা দীপনারায়ণবাবুকে কোনও কারণে লুকিয়ে রাখতে দিয়েছিল। রাস্তায় হাতাহাতি সম্ভবত ওই নিয়েই।
–অনুমান নিছক থিয়োরি। যতক্ষণ না তার প্রমাণ পাচ্ছি, তা নিয়ে জল্পনা নিরর্থক।
বলে কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। তারপর ব্যাগ থেকে একটা গাবদাগোবদা পুরোনো বই নিয়ে এলেন। বইটার পাতা ওলটাতে ওলটাতে তিনি বললেন–বইটা বিভিন্ন দেশে লিপির উদ্ভব এবং বিকাশের ইতিহাস। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, প্রাচীন মিশরীয় তক্তিটার ছবি আমার পরিচিত। দেখি খুঁজে পাই নাকি।
এইসব বই দেখলেই আমার অস্বস্তি হয়। তার ওপর কর্নেল ওর মধ্যে ঢুকে গেলে কখন যে বেরোবেন, তার কোনও ঠিক নেই। ধৈর্য ধরে প্রায় আধঘণ্টা কাটিয়ে বললাম-কর্নেল! আমি এবার উঠি।
কর্নেল বইয়ের পাতায় চোখ রেখে বললেন-বাহুতে বাঁধা তাগার ছবি পাচ্ছি। রামেসিসের তাগা। এতে শেয়ালঠাকুর আনুবিসের ছবি এক পিঠে। অন্য পিঠে সাপ! এটা আমেনহোতেপের বাহুর তাগা। তেমন কিছু না। রা অর্থাৎ, সূর্যঠাকুরের ছবি আর হিজবিজবিজ-বাঃ! এটা তুংক-আমন অর্থাৎ তুতানখামেনের ছবি আর হিজবিজবিজ-বাঃ! এটা তুতাংক-আমন অর্থাৎ তুতানখামেনের তাগা। বেচারা কিশোর বয়সে মিশরের রাজা হয়ে যক্ষ্মারোগে মারা পড়েছিল। তার মমি এখন কায়েরোর জাদুঘরে আছে।
–প্লিজ কর্নেল! আমি বাড়ি ফিরতে চাই।
-কী আশ্চর্য! এটা তুতাংক-আমনের বালিকা বিধবা নেকারতিতির তাগা। জয়ন্ত! জয়ন্ত! পেয়ে গেছি। নেকারতিতির গলার তক্তি। দ্যাখো, দ্যাখো!
