কর্নেল বললেন–পোস্টকার্ডের ঠিকানা আপনি টুকে নিয়েছেন কি?
-হ্যাঁ। আপনি যে জন্য ঠিকানাটা নিলেন, আমি সেজন্য টুকিনি। ওই ঠিকানায় আশেপাশে লোকজন রেখে তাকে পাকড়াও করতে হবে। গিয়েই কলকাতা পুলিশকে খবর দেব।
গাড়িতে উঠে কর্নেল বললেন–চলি মি. হাটি!
-আপনারা আর কদিন আছেন সেচবাংলোতে?
-নীল সারসের কয়েকটা ছবি তুলে ফেলেছি। কাজেই আজ লাঞ্চের পরই কলকাতা ফিরব। আমার নেমকার্ড তো আপনাকে দিয়েছি। দরকার হলে স্মরণ করবেন। আমিও আপনার ফোনের জন্য অপেক্ষা করব।
বাংলোয় ফিরে নরুঠাকুরকে দেখতে পেয়েছিলাম। সে বলেছিল–বড়দির কাছে গিয়ে চ্যাটাং চ্যাটাং কথা শুনে রাগ হল। নিজের বাড়িতে গিয়ে খোঁজখবর নিয়ে শর্টকাটে ফিরে এসেছি।
দুপুর একটা-পনেরোতে পাবদার ঝোলসহ লাঞ্চ সেরে আমরা কলকাতা ফিরে এসেছিলাম। ইলিয়ট রোড এলাকায় কর্নেলের তিনতলার অ্যাপার্টমেন্টে পৌঁছুতে চারটে বেজে গিয়েছিল। দেরির কারণ হাইওয়েতে একটা ট্রাক উলটে গিয়ে প্রচণ্ড জ্যাম ছিল।
দরজা খুলেই কর্নেলের পরিচারক ষষ্ঠীচরণ একগাল হেসে বলল- টিকটিকিবাবু দুপুরে ফোন করেছিলেন। বলেছি, বাবামশাই আর কাগজের দাদাবাবু কোথায় পাখি দেখতে গেছেন। কবে ফিরবেন জানি না।
কর্নেল চোখ কটমটিয়ে বললেন–কফি!
ষষ্ঠী হাসিমুখে চলে গেল। কর্নেলের জাদুঘরসদৃশ ড্রয়িংরুমে সোফায় বসে বললাম-ষষ্ঠী হালদারমশাইকে আড়ালে টিকটিকিবাবু বলে। ওঁর কানে গেলে দুঃখ পাবেন।
প্রাক্তন পুলিশ অফিসার এবং বর্তমানে প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে কে হালদারকে কর্নেলের দেখাদেখি আমিও হালদারমশাই বলি। ঢ্যাঙা শ্যামবর্ণ এই প্রাক্তন পুলিশ অফিসারের চুল খুঁটিয়ে ছাঁটা। সূচালো গোঁফ আছে। উত্তেজিত হলে উনি দাঁতে দাঁত ঘষেন বলে গোঁফের দুই ডগা তিরতির করে কাঁপে। তার চেয়ে বড়ো কথা, উনি পূর্ববাংলার ভাষায় কথা বলা ছাড়েননি। প্রশ্ন তুললে বলেন-মাই মাদার টাং! ছাড়ুম ক্যান?
কর্নেলের নির্দেশে গণেশ অ্যাভিনিউয়ে তার প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সির অফিসে ফোন করতেই সাড়া এল–ইয়েস?
বললাম–হালদারমশাই! আমরা এইমাত্র ফিরেছি। ষষ্ঠী বলল, আপনি কর্নেলকে ফোন করেছিলেন।
-জয়ন্তবাবু নাকি? কর্নেল স্যার ফিরছেন? এখনই যাইতাছি। একখান জব্বর ক্যাস পাইছি। কর্নেল স্যারের লগে কনসাল্ট করনের দরকার আছে। …
.
০৫.
কফি খেতে খেতে কর্নেলের সঙ্গে দীপনারায়ণবাবুর মৃত্যু নিয়ে আলোচনা করছিলাম। কর্নেলের মতে, মিশরীয় তক্তিটার জন্য উনি খুন হননি। তক্তিটা হাতাতে চাইলে জাহাজিবাবু সেদিনই খুন করে ওটা পেয়ে যেত, যেদিন সকালে ওঁরা দুজনে ধস্তাধস্তি করছিলেন। রাস্তা ছিল জনহীন। তাছড়া সুনয়নী বলেছেন, তাঁর বড়দার অনেক শত্রু আছে।
বললাম–কিন্তু পেতলের নলটা জাহাজিবাবু প্রায় এক বছর কেল্লাবাড়ির জঙ্গলে পুঁতে রেখেছিল কেন, বোঝা যাচ্ছে না।
কর্নেল কফি শেষ করে চুরুট ধরিয়ে বললেন-এর একশো একটা কারণ থাকতে পারে। হয়তো খদ্দের পাচ্ছিল না। কিংবা খদ্দের আসতে কোনও কারণে দেরি করছিল। এইসব প্রাচীন পার্চমেন্ট বা চামড়ায় লেখা কিউনিফর্ম লিপির একটা নিদর্শনের দাম কোটি কোটি টাকা। আমেরিকার মতো ধনী দেশের কোটিপতিরাই এসব জিনিস নানা দেশ থেকে কিনে নিয়ে গিয়ে ব্যক্তিগত জাদুঘরে রাখে। মার্কিন ধনীদের এই বাতিকটা আমি দেখেছি।
এই সময় ডোরবেল বাজল এবং কর্নেল যথারীতি হাঁক দিলেন-ষষ্ঠী!
একটু পরে সবেগে প্রবেশ করলেন প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে. কে. হালদার। তিনি ধপাস করে সোফায় বসে আগে এক টিপ নস্যি নিলেন। তারপর নোংরা রুমালে নাক মুখে বললেন-হেভি মিস্ট্রি কর্নেলস্যার! জব্বর একখানা ক্যাস পাইছি।
কর্নেল বললেন–বলুন। শোনা যাক কেমন কেস।
গোয়েন্দাপ্রবর চাপা স্বরে বললেন-আমার মক্কেলের পুরা নাম ক্যাপটেন সৌমেন্দ্রনাথ সিংহ। উনি ক্যাপটেন এস. এন. সিংহ নামে পরিচিত। সাউদার্ন অ্যাভিনিউয়ে ওনার দোতলা পৈতৃক বাড়ি। ওপরে তিনখান ঘরে নিজের জন্য রাখছেন। নিচের তিনখান ঘর ভাড়া দিছেন। সেখানে তিনখান ঘরে মুদির দোকান, স্টেশনারি স্টোর্স আর মিষ্টির দোকান। ওনার বাড়ি এখনও দেখি না। যা শুনছি, কইলাম।
–কিন্তু কেসটা কী?
-ভদ্রলোক প্রাইভেট জাহাজ কোম্পানিতে ক্যাপটেন ছিলেন। নয় বৎসর আগে রিটায়ার করছেন। তো গত সপ্তাহে হঠাৎ ওনার সন্দেহ হইছিল, উনি যেখানে যান, ওনারে একজন লোক একটু দূর থেইক্যা ফলো করে। ওনার গাড়ি ছিল। বেইচ্যা দিছেন। তো যে তারে ফলো করে, তারে চিইন্যা রাখছেন। তাড়া করলে লোকটা পলাইয়া যায়। কিন্তু তারপর আবার ওনারে ফলো করে। উনি থানায় গিছলেন। পুলিশ কইছিল, মাইনষে বুড়া হইলে চক্ষে ভুল দ্যাখে। অরা ক্যাস লয় নাই। হাসহাসি করছিল। তো আপনি জানেন কর্নেলস্যার আমি মাসে একখান-দুইখান বিজ্ঞাপন দিই। হালদার প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সির বিজ্ঞাপন দেইখ্যা উনি আইজ আমার অফিসে গেছিলেন। কইলেন, ফোনে কিছু জানাই নাই। ক্যান কী, ফোন ট্যাপ করতে পারে কেউ।
আমি চমকে উঠেছিলাম। চন্দ্রপুরের শম্ভু চৌধুরিও জাহাজে চাকরি করত। আর হালদারমশাইয়ের মক্কেলও জাহাজের ক্যাপটেন ছিলেন। কর্নেল আমার দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে বললেন–জয়ন্ত! চুপচাপ শোনো।
