কর্নেল বললেন–কখন ফিরেছিলেন উনি?
–দুপুরবেলা। জিজ্ঞেস করলাম, কত টাকা হারিয়েছে? বড়দা শুধু বলল, তোর শুনে কাজ নেই। আমার শেষ সম্বল কোথায় ফুটো পকেট দিয়ে পড়ে গেছে। তন্নতন্ন খুঁজে কোথাও পেলাম না।
-এবার বলুন, আপনার দাদাকে কে খুন করেছে বলে আপনার সন্দেহ হয়?
–কার কথা বলব স্যার? বড়দা কত লোককে খামোখা চটিয়ে রেখেছে। মাতাল হলে মানুষের তো জ্ঞানগম্যি থাকে না।
কর্নেল তার দিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টে তাকিয়ে বললেন–জাহাজবাবুকে সন্দেহ হয় না?
সুনয়নী আস্তে বললেন–হয়। শম্ভুদা আমাদের দূরসম্পর্কের আত্মীয়। কিন্তু লোকের কাছে শুনেছি, খুব বজ্জাত লোক। বর্ডারে চোরাচালানিদের দল পুষেছে।
-কিন্তু শম্ভুবাবু তো চন্দ্রপুরে স্থায়ীভাবে বাস করেন না শুনেছি। বছরে নাকি একবার আসেন।
-হ্যাঁ বড়দার কাছে শুনেছি, সে কলকাতায় থাকে। বড়দা যে বাসায় থাকত, সেই বাসা সে ভাড়া নিয়েছে। দুজনের মধ্যে ছোটোবেলা থেকে বন্ধুতা। বিদেশ থেকে ফিরলেই জাহাজিদা আমার জন্যও কতকিছু আনত। আমি ওগুলো কী করব? পাড়াপড়শিদের বিলিয়ে দিতাম।
-আপনার বড়দা কলকাতায় কী করতেন?
—সে দশ-বারো বছর আগের কথা। এখানকার অনেকটা জমি বিক্রি করে কীসের ব্যবসা করত। আমি তা জানি না। জিজ্ঞেসও করিনি। বিধবা হওয়ার পর এ বাড়িতে বছর সাতেক আগে বড়দা আমাকে নিয়ে এসেছিল। হাত পুড়িয়ে তাকে রান্না করে খেতে হয়। বাড়িতে একা একা থাকে। লোক রাখতে হলে মাইনে দিতে হবে। এদিকে আমারও সন্তানাদি নেই।
-আপনার বড়দা বিয়ে করেননি?
-না। সংসারে তত মন ছিল না। বিয়ে করলে আমি জানতে পারতাম। ছোটবেলা থেকে উড়নচণ্ডী স্বভাব। আর ওই নেশাভাং!
কর্নেল বললেন-শম্ভুবাবুকে আপনার সন্দেহ হয় বললেন। এর নিশ্চয় কোনও কারণ আছে?
সুনয়নী একটু চুপ করে থাকার পর চাপা স্বরে বললেন-গত সপ্তাহে একদিন শম্ভুদা সকালবেলা এল। বড়দা দোতলার ঘরে তাকে নিয়ে গেল। আমাকে চা পাঠাতে বলল। চা দিয়ে আসার কিছুক্ষণ পরে কানে এল, দুজনের কী নিয়ে ঝগড়া হচ্ছে। শম্ভুদা বলছে, অ্যাডভান্স খেয়ে হজম করবে তুমি? বড়দা বলছে, আমি দরদামে ঠকেছি। একজন আমাকে ডবল দাম দিতে চেয়েছে। এইসব কথা বুঝতে পারিনি প্রথমে। পরে মনে হল, আমাদের পূর্বপুরুষের কোনও দামি জিনিস বড়দা ওকে বিক্রির জন্য অ্যাডভান্স টাকাকড়ি নিয়েছে। তারপর শম্ভুদা চলে গেল। বড়দা তার পিছনে কথা বলতে বলতে বেরিয়ে গেল।
-কিন্তু আপনার সন্দেহের কারণ কী?
-ওই যে বললাম পরশু বড়দা হাঁপাতে হাঁপাতে বাড়ি এসে পকেট হাতড়াচ্ছিল। কোটের ভিতর-পকেটে ফুটো আছে। জিনিসটা পড়ে গেছে বলে পাগলের মতো বেরিয়ে গেল।
-বুঝেছি। অ্যাডভান্স টাকা দিয়ে শম্ভুবাবু জিনিসটা পাননি। সেটা হারিয়ে গেছে, এ কথায় বিশ্বাস করেননি। তাই রাগের বশে আপনার বড়দাকে খুন করেছেন। এই তো?
–আজ্ঞে হ্যাঁ। আমি মেয়েমানুষ। আমার সামান্য বুদ্ধিতে যা মনে হয়েছে, বললাম। পুলিশ সায়েবকেও বলেছি।
-কলকাতায় আপনার বড়দা যেখানে থাকতেন, সেখান থেকে আপনার শ্বশুরবাড়ির ঠিকানায় নিশ্চয় চিঠি লিখতেন। তেমন চিঠি কি আপনার কাছে আছে?
সুনয়নী চোখ মুছে বললেন–আছে হয়তো। একটু খুঁজতে হবে।
কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন–আমরা বারান্দায় যাচ্ছি, আপনি খুঁজে আনুন।
সুনয়নী বললেন-না, না। আপনারা বসুন।
উনি বেরিয়ে গেলে কর্নেল আলমারির বইগুলো খুঁটিয়ে দেখতে থাকলেন। তারপর বললেন–আমার ধারণা, এই প্রাক্তন জমিদার পরিবারের কেউ প্রাচীন ইতিহাসের অধ্যাপক ছিলেন।
মি. হাটি বললেন–ওগুলো ইতিহাসের বই নাকি?
-হ্যাঁ। তবে প্রত্ন-ইতিহাস আর প্রাচীন ইতিহাসের দুর্লভ সব বই।
–সুনয়নী দেবীর কাছে জানা যাবে সে-কথা।
মিনিট পাঁচেক পরে সুনয়নী একটা পোস্টকার্ড নিয়ে এলেন। বললেন–একটা চিঠি পেলাম।
কর্নেল আতশ কাছে চিঠিটা দেখে বললেন-ঠিকানা দিয়ে দীপনারায়ণবাবু আপনাকে শিগগির জবাব দিতে বলেছিলেন।
সুনয়নী বললেন–আজ্ঞে হ্যাঁ। আমবাগানে আমার একটা অংশ আছে। তাই বড়দা আমাকে চিঠি দিতে বলেছিল। ব্যবসাতে লোকসান হয়েছে। তাই আমবাগানটা তাকে বেচতে হবে।
কর্নেল খুদে নোটবই বের করে ঠিকানাটা লিখে নিলে। ও সি মি. হাটি বললেন–দেখি! দেখি পোস্টকার্ডটা।
কর্নেল তাকে বিবর্ণ পোস্টকার্ডটা দিয়ে সুনয়নীকে বললেন–শম্ভু চৌধুরি আপনার বড়দাকে টাকা দিয়ে থাকলে আপনি কি বড়দার কাছে এবিষয়ে কিছু শুনেছিলেন?
সুনয়নী বললেন–কত টাকা দিয়েছিল শম্ভুদা, তা জানি না। তবে হাতে যে-ভাবে হোক, টাকা এলে বড়দা আমাকে কিছু টাকা দিত। শেষবারে দিয়েছিল দু হাজার টাকা।
-ঠিক আছে। এবার চলি। আপনি পিছনের দরজাটা ভিতর থেকে এবার বন্ধ করে দিন। ….
সদর দরজা অর্থাৎ বাঁশের বাতা দিয়ে তৈরি আগড় খোলা ছিল। আমরা সেখানে দিয়ে বেরিয়ে গেলাম। মি. হাটি আমাদের গাড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি চাপা স্বরে বললেন জাহাজবাবু ভোরের বাসে নাকি কলকাতা গেছে। এই খুনের খবর পাওয়ার আগে আপনার কথামতো তার বাড়িতে আমাদের লোকজন পাঠিয়েছিলাম। তার বাড়ির কেয়ারটেকার বলেছে, সায়েব-হা, সায়েব…অট্টহাসি হেসে মি. হাটি ফের বললেন-ব্যাটাচ্ছেলেকে একবার টাই-স্যুট পরতে দেখেছিলাম। বর্ডারে দুজন চোরাচালানিকে ব-মাল ধরেছিলাম। জাহাজিবাবু সায়েব সেজে তাদের হয়ে কথা বলতে এসেছিল। ধমক দিয়ে বের করে দিয়েছিলাম।
