কর্নেল বললেন–খুনি এখানে ওত পেতে বসে ছিল। তার জুতোর ছাপ পড়েছে। শক্ত শুকনো মাটি বলে ছাপ তত স্পষ্ট নয়। তা হলেও আমার ধারণা, তার পায়ে যে জুতো ছিল, তার সোল রবারের। আমি এইরকম জুতো পরি। এই যে দেখছেন। পাখি-প্রজাতির কাছে যেতে হলে এই সোল জুতোয় থাকা দরকার।
–আজকাল অবশ্য এই সোলের জুতো সবাই পরে।
মি. হাটি! দীপনারায়ণবাবুর মাথার পিছনে কোথায় গুলি লেগেছিল? আমার মাথায় জায়গাটা দেখিয়ে দিন। টুপি খুলছি।
ব্যাপারটা হাস্যকর। কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে ফের টুপি পরে বললেন–দীপনারায়ণবাবু সম্ভবত লম্বা মানুষ ছিলেন?
-হ্যাঁ। আমার চেয়ে লম্বা। তার মানে, প্রায় আপনার মতো লম্বা। তবে উনি ছিলেন রোগা।
–ওঁর পরনে কি লংকোট আর ধুতি ছিল?
মি. হাটি হাসিমুখে ভুরু কুঁচকে বললেন–আপনার সম্পর্কে যা সব শুনেছি, সত্যি মনে হচ্ছে।
কর্নেল তার কথায় কান না দিয়ে সেই দরজাটার কাছে গেলেন। তারপর বললেন দীপনারায়ণবাবুকে মাথা নিচু করে ঢুকতে হত। কাজেই মাথার পিছনে নিচের দিকে গুলি করেছিল আততায়ী। সে ছিল ভিকটিমের তুলনায় বেঁটে। আর একটা কথা। সে এই নির্জন জায়গায় দীপনারায়ণের বাড়ি থেকে একটু তফাতে সামনে থেকে গুলি করতে পারত। তা করেনি। কেন করেনি?
কর্নেল স্বগতোক্তির ভঙ্গিতে প্রশ্নটা করলেন। মি. হাটি বললেন–হয়তো আচমকা সামনে কাউকে দেখে দীপনারায়ণ চেঁচিয়ে উঠতে পারতেন। তাই খুনি ঝুঁকি নেয়নি।
অতর্কিতে পিছন থেকে গুলি করে মারতে পারত। পিঠের বাঁদিকে অতর্কিতে কাছ থেকে গুলি করলেও পারত সে। কিন্তু আপনার কথাতেই আসছি। সে কোনও ঝুঁকি নেয়নি।
বলে কর্নেল আঙুল তুললেন সাহাবাবুদের বাড়ির দিকে। মি. হাটি বলে উঠলেন–ঠিক! ঠিক! মোরামরাস্তা থেকে এই পিছনের দরজায় আসতে হলে সাহাবাবুদের বাড়ির আনোর ছটা এই জায়গা অবধি পৌঁছুবে। লক্ষ্য করে দেখুন।
কর্নেল বললেন–হ্যাঁ। এই দরজার কাছে আলো পৌঁছোয় না। প্রথমত এই পাঁচিল। দ্বিতীয় ওই ছাতিম গাছটা। তাই আততায়ী আগেই এসে ওখানে অপেক্ষা করছিল। সে জানত, এক গুলিতে কাউকে চিরকালের মতো চুপ করাতে হলে মাথার পিছনে গুলি করা দরকার। মি. হাটি! সামরিক জীবনে আমি শিখেছিলাম, পিছন থেকে চুপিচুপি এগিয়ে শত্রুকে গুলি করার চেয়ে রাইফেলের নল আর বাঁট দুদিক থেকে দুহাতে ধরে মাথার পিছনে আঘাত করলে সে নিঃশব্দে লুটিয়ে পড়বে। রাইফেল কেন? একটা বেঁটে শক্ত লাঠিই যথেষ্ট।
মি. হাটি বললেন–এবার চলুন! দীপনারায়ণবাবুর বোনের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই।
দরজা দিয়ে ঢুকে বাড়ির সামনে গেলাম। বারান্দায় এক বিধবা ফরসারঙের প্রৌঢ়া মহিলা থামে ঠেসে বসে ছিলেন। তাকে ঘিরে প্রতিবেশী মহিলাদের ভিড় ছিল। একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোক মোড়ায় বসে কথা বলছিলেন। আমাদের দেখে তিনি উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার করলেন। বললেন–সুনয়নী! পুলিশ-সায়েবরা এসেছেন। তাদের সঙ্গে কথা বলো। যা-যা জানো, সব খুলে বলল।
মি. হাটি গম্ভীর মুখে বললেন–আপনারা বাইরে যান। আমরা ওঁর সঙ্গে কথা বলব।
বৃদ্ধ ভদ্রলোক এবং মহিলারা উঠোনে নেমে গেলেন। তারপর সদর দরজার বাঁশের বাতা দিয়ে তৈরি বেড়ার একটা দিক খুলে কয়েকজন মহিলা বেরিয়ে গেলেন। উঠোনের প্রান্তে একটা পেয়ারাগাছের তলায় সেই বৃদ্ধ এবং দুজন প্রৌঢ়া চাপা গলায় কথা বলতে থাকলেন।
নরুঠাকুরকে দেখতে পাচ্ছিলাম না। তার সাইকেলটাও নেই।
মি. হাটি বললেন–মিসেস রায়! ইনি কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। ইনি আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান।
সুনয়নী বারান্দায় মেঝেয় তেমনিভাবে বসে ছিলেন। উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার করে বললেন–এই . ঘরে আসুন আপনারা।
সামনের ঘরের দরজা খুলে দিলেন তিনি। পিছনের জানালা দুটো খুলে দিলেন। অবাক হয়ে দেখলাম, ঘরে তিনটে পুরোনো আলমারিতে বই ভর্তি। দেওয়ালে পুরোনো আমলের কয়েকটা বড়-বড় পোর্ট্রেট। সম্ভবত পূর্বপুরুষ জমিদারদের ছবি। একটা নড়বড়ে টেবিলের ওপর মারবেলের আঁটা আছে। কয়েকটা চেয়ার আছে। আমরা বসলে সুনয়নী দরজার কপাটে হেলান দিয়ে দাঁড়ালেন। কর্নেল বললেন–দীপনারায়ণবাবু কাল কখন বেরিয়েছিলেন?
সুনয়নী বললেন–পুলিশসায়েবকে সব বলেছি। কাল বিকেলে বেরিয়েছিল বড়দা। কিছু বলে যায়নি। কখন ফিরবে, তা জিজ্ঞেস করলে রাগ করত।
-উনি কোথায় যেতেন আপনি জানেন?
–চন্দ্রপুরে জাহাজিদার বাড়ি। নয়তো গ্রামেরই ক্লাবে দাবা খেলতে যেত। একটা কথা বলতে ভুলেছি। পরশুদিন সকালে বড়দা হাঁপাতে হাঁপাতে বাড়ি ঢুকেছিল। জিজ্ঞেস করলাম। শুধু বলল, শম্ভুকে আমি গুলি করে মারব। নেমকহারাম। বিশ্বাসঘাতক।
–ওঁর কি বন্দুক আছে?
–ছিল। কবে বেচে দিয়েছে সাহাবাবুকে। ওই আলমারিতে বই দেখছেন। তিনপুরুষ আগের দামি দামি সব বই। টাকার দরকার হলে কলকাতায় গিয়ে বেচে আসত। এই ঘরে পূর্বপুরুষের রাখা কতরকম জিনিস ছিল। একটা করে কখন কোথায় কাকে বেচে দিত বড়দা।
-পরশু অপনার দাদা আর কী বলেছিলেন মনে আছে?
সুনয়নী একটু ভেবে নিয়ে বললেন- শীতের গরম পোশাক-আশাক যা ছিল, কবে তা-ও বেচে দিয়েছিল। সম্বল ছিল একটা ছেঁড়া সোয়েটার আর পুরোনো আমলের লম্বা কোট। বড়দা পরশু কোটের পকেট, পাঞ্জাবির পকেট–সব পকেটে হাত ভরে কী খুঁজছিল। জিজ্ঞেস করলাম, জবাব দিল না। কোটের ভেতর-পকেটে ঘেঁদা ছিল। শুধু সেই কথাটা বলে দৌড়ে ওই খিড়কির দোর দিয়ে বেরিয়ে গেল।
