–তা পারে। কিন্তু ব্রোঞ্জের ফলক আর কিউনিফর্ম লিপিভর্তি পার্চমেন্ট-নাঃ জয়ন্ত! আমার সামনে একটা গভীর রহস্য এসে দাঁড়িয়েছে। দীপনারায়ণ রায়ের হত্যাকাণ্ডের চেয়ে এই রহস্য জটিল।
ভৈরব কফির ট্রে নিয়ে এল। সে কিছু বলার জন্য ইতস্তত করছিল। কিন্তু কর্নেল তাকে বললেন–ঠিক আছে ভৈরব। দরকার হলে তোমাকে ডাকব।
ভৈরব চলে গেল। বললাম–আপনার রোয়িং প্রোগ্রামের কী হল?
কর্নেল আস্তে বললেন-থাক। সারাজীবন নরহত্যা দেখে আসছি। আমার সামরিক জীবনের কথাও চিন্তা করো। কিন্তু আশ্চর্য জয়ন্ত! এখনও নরহত্যা আমাকে বিব্রত করে।
-তা হলে চলুন। তিতলিপুরের জমিদারবাড়ি গিয়ে ব্যাপারটা দেখে আসা যাক। আমিও একটা হাতে-গরম খবর পেয়ে যাব। দৈনিক সত্যসবেক পত্রিকার জন্য অন্তত একটা কিছু নিয়ে যাই।
কর্নেল একটু হেসে বললেন-হ্যাঁ। খালি হাতে তোমার কলকাতা ফেরার চেয়ে এটা মন্দ কী! তা ছাড়া প্রাচীন মিশরের ফলক আর কোনো দেশের পার্চমেন্টে লেখা কিউনিফর্ম লিপির সঙ্গে তিতলিপুরের এই হত্যাকাণ্ডের যোগসূত্র তো স্পষ্ট।
রমেনবাবু কিচেনে ছিলেন। ভৈরব তাকে সাহায্য করছিল। কর্নেল শুধু বলে এলেন –একটু বেরুচ্ছি।
গাড়ি স্টার্ট দিয়ে পিচরাস্তায় পৌঁছুলাম। তারপর তিতলিপুর গ্রামে ঢোকার জন্য যে মোরাম বিছানো রাস্তা দেখেছিলাম, বাঁ দিকে ঘুরে সেই রাস্তায় কিছুটা এগোতেই পুলিশের ভ্যান, একটা জিপ আর অ্যামবুল্যান্স দেখা গেল। সেখানে গাড়ি থামিয়ে দুজনে নামলাম। কর্নেলকে দেখে ও.সি মি. হাটি এগিয়ে এলেন। সহাস্যে বললেন–এখানে তো নীল সারস নেই কর্নেলসায়েব। এখানে লাল সারসের কারবার। লাল সারসটা দীপনারায়ণবাবুর মাথার পিছনে ঠোঁট দিয়ে একটা ফুটো করে ফেলেছে।
শুনেই চমকে উঠলাম। তাহলে ভৈরব একটা খাঁটি ক্লু দিয়েছে। ..
.
০৪.
মোরাম বিছানো রাস্তাটা সোজা চলে গেছে। পুলিশের একটা বেতার-ভ্যান থেকে মাঝে মাঝে অস্পষ্ট কথা শোনা যাচ্ছে। একদল সশস্ত্র কনস্টেবল এখানে-ওখানে দাঁড়িয়ে আছে। একটু দূরে বেটন হাতে কয়েকজন কনস্টেবল ভিড় হটাতে ব্যস্ত। অ্যামবুল্যান্স হর্ন দিচ্ছিল। মি. হাটি একজন পুলিশ অফিসারকে বললেন- চ্যাটার্জিবাবু! আপনি দুজন আর্মড সেপাইকে নিয়ে অ্যামবুল্যান্সের সঙ্গে যান। দেরি করা ঠিক নয়।
অ্যামবুল্যান্স তাঁদের নিয়ে এবার হুটার বাজাতে বাজাতে শীতের দিনের নিঝুম গ্রামকে সচকিত করে চলে গেল। কর্নেল বললেন–চন্দ্রপুরে কি মর্গ আছে?
মি. হাটি বললেন–না। কৃষ্ণনগরে আছে। সেখান থেকে অ্যামবুল্যান্স আসতে দেরি করছিল। তাই এখনও আছি।
-বডি কোথায় পড়েছিল?
–দেখাচ্ছি। আসুন।
বাঁদিকে একটা ভেঙেপড়া দেউড়ি। সেখানে গেটের বদলে বাঁশের বেড়া। তার ওধারে উঠোন এবং একটা পুরোনো জীর্ণ দোতলা বাড়ি দেখা যাচ্ছিল। মি. হাটি কর্নেলকে নিয়ে ভাঙা দেউড়ির পাশ দিয়ে এগিয়ে গেলেন। আমি ওঁদের অনুসরণ করলাম। বাউন্ডারি পাঁচিল কোনওরকমে দাঁড়িয়ে আছে। ওদিকে বসতি নেই। পোড়ো জমি। ঝোপঝাড়। আগাছার জঙ্গল। একটা আমবাগান। পাঁচিলের পাশ দিয়ে এগিয়ে মি. হাটি যেখানে দাঁড়ালেন, সেখানে বাড়িটার পিছনের দরজা। কপাট দুটোর অবস্থা করুণ। দরজাটা খোলা ছিল। মি. হাটি বললেন-দীপনারায়ণবাবু এই দরজা দিয়ে বাড়ি ঢুকতে যাচ্ছিলেন। সেই সময় প্রায় পয়েন্টব্লাংক রেঞ্জে খুনি তাঁর মাথার পিছনে গুলি করেছে। এই দেখুন, বডির পজিশন দাগ দিয়ে রেখেছি। বডি উপুড় হয়ে পড়েছিল।
ছোট্ট দরজাটার সামনে কিছু হলুদ রঙের ঘাস আর গাছপালার ঝরাপাতা। তার ওপর চাপচাপ রক্তের ছোপ দেখতে পেলাম। রক্তটা তত লাল নয়।
মি. হাটি বললেন–দীপনারায়ণবাবু রাত্রে কোথায় আড্ডা দিতে যেতেন, তার বোন জানেন না। তার ঘরে খাবার ঢাকা-দেওয়া থাকত। উনি কোনও গুলির শব্দ শোনেনি। এই দরজা দিয়ে রাত্রে বাড়ি ফেরেন দীপনারায়ণবাবু। তাই দরজাটা ভেজানো থাকে। ভোরে ভদ্রমহিলা তার দাদার ঘরের সামনে গিয়ে দেখেন, দরজা তেমনি বাইরে থেকে আটকানো আছে। দরজা খুলে দেখেন, খাবার তেমনি ঢাকা দেওয়া আছে। দাদা তাহলে কোনও বন্ধুর বাড়িতে থেকে গেছেন ভেবে উনি নিচে নামেন। তারপর দেখেন, পিছনের দরজাটা হাট করে খোলা। কাছে এসে দাদাকে উনি উপুড় হয়ে পড়ে থাকতে দেখেন। মাথার পিছনে রক্ত।
কর্নেল বললেন-তার মানে, দীপনারায়ণবাবু দরজা ঠেলে খুলেছেন, সেই সময় আততায়ী তার পিছন থেকে গুলি করেছে।
–আমার ধারণা খুনি তার চেনাজানা লোক। রাতবিরেতে এই দরজা দিয়ে বাড়ি ফেরেন, তা তার জানা ছিল।
–সামনের দরজা দিয়ে বাড়ি ফিরতেন না কেন, জিজ্ঞেস করেছেন ওঁর বোনকে?
-ওই দেখুন। উলটোদিকে সাহাবাবুদের বাড়ি। তিতলিপুরে এখন গণেশ সাহা সবচেয়ে ধনী। গ্রামে বিদ্যুৎ এসেছে। দীপনারায়ণবাবুর বাড়িতে বিদ্যুৎ নেই। কিন্তু সাহাবাবুর দোতলার কার্নিশে উজ্জ্বল আলোর বা ফিট করা আছে। সারা রাত জ্বলে। শীতকালে লোডশেডিং হয় না শুনলাম। গ্রীষ্মকালে হয়। মাতাল অবস্থায় ওখান দিয়ে বাড়ি ঢোকা তার পক্ষে লজ্জার ব্যাপার।
কর্নেল দরজার বাঁদিকে একটা ঝোপের কাছে গিয়ে হাঁটু মুড়ে বসলেন। মি. হাটি তার কাছে গিয়ে বললেন–কী ব্যাপার?
কর্নেল জ্যাকেটের পকেট থেকে আতশ কাচ বের করে মাটিটা পরীক্ষা করতে থাকলেন। মি. হাটি ভুরু কুঁচকে ব্যাপারটা দেখছিলেন। একটু হেসে বললেন- আপনি আতশ কাচ সঙ্গে নিয়ে ঘোরেন। আশ্চর্য তো!
