তিনি স্ক্রোলটা সাবধানে মেলে ধরে বললেন–কিউনিফর্ম লিপিতে কিছু লেখা আছে। কলকাতা না গেলে এর পাঠোদ্ধার সম্ভব নয়।
এই সময় বাইরে নাইটগার্ডের চিৎকার শোনা গেল। –চোর! চোর! ভৈরবদা! ভৈরবদা! চোর! চোর!
কর্নেল বেরিয়ে গেলেন। আমিও দরজার কাছে পর্দা সরিয়ে দাঁড়ালাম। চিৎকারটা উত্তরে বাউন্ডারি পাঁচিলের দিকে শোনা যাচ্ছিল। পাঁচিলে কাঁটাতারের বেড়া বসানো আছে। ভৈরবের হাসি শুনতে পেলাম। সে বলছে–ছিঁচকে চোর। টর্চের আলোয় মুখটা চেনাচেনা লাগল। ব্যাটা ড্যামের ঠান্ডা জলে ঝাঁপ দিলে মজাটা টের পেত। ..
.
০৩.
সকালে ভৈরবের ডাকে ঘুম ভেঙেছিল। ঘড়ি দেখলাম, সাড়ে সাতটা বাজে। দরজা খোলা এবং ভৈরব চা এনেছে, এতেই বোঝা গেল কর্নেল যথারীতি প্রাতভ্রমণে বেরিয়েছেন। বিছানায় বসে চায়ে চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম-কাল রাত্রে বাংলোয় চোর ঢুকেছিল নাকি?
ভৈরব হাসল। ভিতরে ঢোকেনি স্যার। উঁকি দিচ্ছিল। ও দিকে ঝিলের মাথায় বাঁধ আছে। সেই পথে সে এসেছিল। মাধু দারোয়ানের চোখে পড়েছিল।
-তুমি বলছিলে এলাকায় চোরডাকাত নেই!
-ছিঁচকে চোর স্যার। মুখটা এক পলক দেখেছি। কেন যেন চেনাচেনা লাগল। তবে আশ্চর্য ব্যাপার স্যার, এই বাংলোয় কোনওদিন চোরের উপদ্রব হয়নি।
-কর্নেলসায়েব কোনদিকে গেছেন দেখেছ?
–না স্যার। এবেলা হাটু দারোয়ানের ডিউটি। সে জানে।
–আচ্ছা। ঠিক আছে।
ভৈরব সেলাম দিয়ে চলে গেল। বেডটি খেয়ে বাথরুমে গেলাম। দাড়ি কামিয়ে ফিটফাট হয়ে বারান্দায় বসলাম। আজ ঘন কুয়াশা। বিস্তীর্ণ জলাধার কুয়াশার আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেছে। বারান্দায় বসে কুয়াশা দেখার মানে হয় না। বাংলোর সামনে পার্কিং জোনে আমার গাড়িটা দেখার ইচ্ছে হল। কিন্তু সেখানে গিয়ে আমি চমকে উঠলাম। গাড়িটা নেই। হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। সেই সময় দারোয়ান গেটের পাশে তার ঘর থেকে কম্বলমুড়ি দিয়ে বেরিয়ে বলল–স্যার কি ওখানে কিছু খুঁজছেন?
বললাম–আমার গাড়িটা নেই।
–আপনার গাড়ি কর্নেলসায়েব নিয়ে গেছেন। আমাকে বলে গেছেন, আপনি খোঁজ করলে আমি যেন বলি।
স্বস্তির নিশ্বাস পড়ল। ঘরে ফিরে গিয়ে ওয়ার্ডরোবের ভিতরে ঝোলানো প্যান্টটা দেখলাম। ওই প্যান্টের পকেটে চাবি ছিল। অতএব বৃদ্ধ ঘুঘুমশাই আমার পকেট মেরেছেন।
কিন্তু হঠাৎ ওঁর গাড়ি দরকার হল কেন? উনি না ফিরলে এ প্রশ্নের উত্তর পাব না…।
কর্নেল ফিরলেন সাড়ে নটায়। গাড়ির শব্দ শুনে বারান্দায় বেরিয়েছিলাম। একটু পরে তাকে দেখতে পেলাম। তার মুখে হাসি ঝলমল করছে। ততক্ষণে কুয়াশা খানিকটা পরিষ্কার হয়েছে। কাছে এসে কর্নেল যথারীতি সম্ভাষণ করলেন-মর্নিং জয়ন্ত! আশা করি সুনিদ্রা হয়েছে।
-মর্নিং বস। হাসতে হাসতে বললাম। –আপনি দুটো অপরাধ করেছেন। প্রথমটা পকেটমারি। দ্বিতীয়টা আমার গাড়ি চুরি। গাড়ি নেই দেখে আমি তো ভড়কে গিয়েছিলাম। রাত্রে আমাকে জানাননি আপনার গাড়ির দরকার আছে।
কর্নেল বারান্দায় বসে টুপি খুললেন। তারপর বাঁ হাতে প্রশস্ত টাকে হাত বুলিয়ে ডান হাতে আমার গাড়ির চাবির গোছা আমাকে দিলেন। মৃদু হেসে তিনি বললেন–তোমার গাড়ি চুরি করতে হয়েছিল, তার কারণ আছে। রাত্রে মনে মনে ঠিক করেছিলাম, কেল্লাবাড়ির জঙ্গলে সত্যি নীল সারসের একটা দল এসে জুটেছে কিনা দেখতে যাব। কিন্তু রাত্রে চোর এসেছিল বাংলায়। ভোরে বেরুতে গিয়ে উত্তরে পাঁচিলটা একবার দেখার ইচ্ছে হল। কাঁটাতারের বেড়ায় কোনও ফাঁক আছে। কিনা। নেই। অথচ চোর এসেছিল! পাঁচিলের ধারে ঝাউ আর ক্যাকটাসের টব আছে। একটা করবী আছে। হঠাৎ চোখে পড়ল, একটা ভাঁজকরা কাগজ করবী গাছটার পিছনে কাঁটাতারে গোঁজা আছে। সেই কাগজটা শিশিরে ভিজে গেছে। বারান্দায় এসে সাবধানে খুলে দেখলাম, একটা হুমকি। এতে আমি ভয় পাইনি। কিন্তু এখান থেকে নির্বিঘ্নে কলকাতা ফিরতে হবে। কাজেই তোমার গাড়ি নিয়ে চন্দ্রপুর থানায় গিয়েছিলাম। ও.সি. মি. রাজেন হাটির সাহায্য দরকার হবে।
নরুঠাকুর কফি আর ম্যাক্সের ট্রে রেখে গেল টেবিলে। তারপর বললাম–চিঠিটা দেখতে পারি?
কর্নেল জ্যাকেটের ভিতর থেকে একটা ভাজকরা কাগজ বের করলেন। কাগজটা ভিজে ছিল, তা স্পষ্ট। সাবধানে খুলে দেখলাম, লাল ডটপেনের লেখাগুলো ভিজে কিছুটা অস্পষ্ট হয়ে গেছে। তবু বোঝা যাচ্ছিল।
পেতলের নলটা যেখানে ছিল, সেখানে আজ সকালে রেখে না এলে খুলি হেঁদা হয়ে যাবে। তুই কি ভেবেছিস তোর পরিচয় আমি পাইনি? কলকাতায় আমার লোক আছে। বুড়ো টিকটিকিকে লেজসুদ্ধ হাপিস করে দেব।
কর্নেলকে চিঠিটা আবার তেমনই ভাঁজ করে ফেরত দিয়ে বললাম-ল্যাজ সম্ভবত আমি।
কর্নেল তুম্বো মুখে বললেন–তুমি তো জানো জয়ন্ত! কেউ আমাকে টিকটিকি বললে আমার টাক থেকে গরম বাষ্প বেরিয়ে যায়। ওটা অশ্লীল শব্দ। কারণ ডিটেকটিভ থেকে বাংলায় টিকটিকি শব্দটা এসেছে। টিকটিকি আমি? প্রকৃতিবিজ্ঞানী কর্নেল নীলাদ্রি সরকার টিকটিকি?
কর্নেলের গাম্ভীর্য আর ক্ষোভ দেখে তাকে নিয়ে রসিকতার সাহস পেলাম না। কফি দ্রুত শেষ করে উনি চুরুট ধরালেন। তারপর হেসে উঠলেন। বললাম- হাসছেন যে! হঠাৎ গরম বাষ্পে বরফ পড়া শুরু হল নাকি?
কর্নেল কিটব্যাগ ঘরে রেখে এসে বারান্দায় বসলেন। তারপর জ্যাকেটের ভিতর থেকে একটা ফোটো বের করে বললেন–কাল সন্ধ্যায় আমার ক্যামেরা আমাকে বঞ্চিত করেনি। ছবিটার দুটো প্রিন্ট করেছিলাম। অত কিছু ভেবে করিনি। মনে হয়েছিল, ভৈরবকে দিয়ে তোক দুটোকে শনাক্ত করাব। ভৈরব চন্দ্রপুরের লোক। আর দরকার হলে পুলিশকে দিয়ে যাব।
