ওঁর হাত থেকে ছবিটা নিয়ে দেখলাম, পাথরের স্ল্যাবটা দেখা না গেলেও আঁতকে ওঠা দুটো লোকের ছবি স্পষ্ট উঠেছে। একজন সবে ঘুরতে যাচ্ছে। অন্যজন ফুটবল খেলোয়াড়ের মতো শূন্যে লাফ দিয়েছে। ছবিটা দেখে হাসি এল। বললাম-চন্দ্রপুর থানার বড়োবাবুকে ছবির অন্য কপিটা দিয়ে এসেছেন মনে হচ্ছে।
-তুমি বুদ্ধিমান। যে শূন্যে লাফ দিয়েছে, তার নাম পঞ্চানন দাশ। ডাকনাম পাঁচু। অন্যজন কালোবরণ খটিক। ডাকনাম গলাকাটা কেলো। দাগি ডাকাত। পুলিশ ওদের খুঁজে পাচ্ছে না। এবার খুঁজে পাওয়ার চান্স আছে।
-কী ভাবে?
-জাহাজিবাবু ওদের কেল্লাবাড়ির জঙ্গলে ওত পাততে পাঠাবে। আমি পেতলের নলটা যথাস্থানে রেখে আসব।
–কী আশ্চর্য! কর্নেল নীলাদ্রি সরকার কোনো এক জাহাজিবাবুর হুমকিতে ভয় পেয়ে ওটা ফেরত দিতে যাবেন-এটা কল্পনা করা যায় না।
কর্নেল চুরুটের একরাশ ধোঁয়ার মধ্যে বললেন–হ্যাঁ। রেখে আসব, তবে ভয় পেয়ে নয়। লোক দুটোকে ফাঁদে ফেলার জন্য। পুলিশ উলটোদিক থেকে জঙ্গলে ঢুকে কাছাকাছি লুকিয়ে থাকবে। না–থাকবে না। এখনই তারা লুকিয়ে আছে। তোমার গাড়িতে একজন সাবইন্সপেকটার আর দুজন ভোজপুরি কনস্টেবলকে এনে কেল্লাবাড়ি জঙ্গলের কাছে নামিয়ে দিয়ে এলাম। কাজেই ব্রেকফাস্ট করে নিয়ে শিগগির বেরুতে হবে।
দশটা বাজে প্রায়। নরুঠাকুর ব্রেকফাস্ট দিয়ে গেল। তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে দরজায় তালা এঁটে আমরা বেরিয়ে পড়েছিলাম। কর্নেলের পিঠে কিটব্যাগটা আঁটা ছিল। গলা থেকে বাইনোকুলার আর ক্যামেরা ঝুলছিল। প্রজাপতিধরা জালের স্টিকটা পিঠের কিটব্যাগের কোনা দিয়ে বেরিয়ে ছিল।
রমেনবাবু সাইকেলে চেপে সবে ফিরছিলেন। নমস্কার করে তিনি বললেন –জেলেদের কাছে টাটকা পাবদা মাছ পেয়েছি কর্নেলসায়েব। যেন শিগগির ফিরে আসবেন।
কর্নেল বললেন–সুখবর পেলাম যাত্রার সময়। তা হলে আজ নীল সারসের দেখা পাবই। …
ডাইনে কেল্লাবাড়ির জঙ্গল আর বাঁদিকে তিতলিপুর আবছা কুয়াশায় তখনও ঢাকা। ঝিলের ধারে ঘাসে শিশির তখনও শুকোয়নি। আমরা কালকের মতো সাবধানে পা ফেলে জঙ্গলে ঢুকলাম। ধ্বংসস্তূপ আর ঘন ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে কিছুটা এগিয়ে কর্নেল হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন। তার চোখে বাইনোকুলার। নব ঘুরিয়ে দূরত্ব অ্যাডজাস্ট করে নিয়ে চাপা স্বরে বললেন–জয়ন্ত! তুমি ওই লাইমকংক্রিটের ওপর বসে থাকো। আমি শিগগির ফিরে আসছি।
বলে তিনি আমাকে অবাক করে ডানদিকে অদৃশ্য হলেন। অস্বস্তি হচ্ছিল। লাইমকংক্রিটের একটা চাঙড়ে বসে আমি রিভলভারটা জ্যাকেটের পকেট থেকে বের করলাম। কর্নেলের পাগলামি মাঝে মাঝে অসহ্য লাগে। বহুবার দেখেছি, এইভাবে আমাকে প্রতীক্ষায় রেখে উনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা কোথায় কোনও বিরল প্রজাতির পাখির পেছনে ছোটাছুটি করে বেড়ান। কিন্তু এখন তো তেমন সময় নয়। বদমাশ দুটোকে ফাঁদে ফেলার উদ্দেশ্যেই আমরা বেরিয়েছি।
আমার বিরক্তি পনেরো মিনিটের মধ্যে কেটে গেল। একটা ঝোপের ফাঁকে কর্নেলের টুপি দেখতে পেলাম। অমনি অস্ত্রটা লুকিয়ে রাখলাম। তিনি কাছে এসে আমার একটা হাত চেপে ধরে চাপা উল্লাসে বললেন–পাবদা মাছের খবরটা সত্যি সুখবর ডার্লিং। ওদিকে একটা উঁচু দেওয়াল দাঁড়িয়ে আছে। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম শকুন। তারপর দেখলাম, তিনজোড়া নীল সারস দেওয়ালের ওপর বসে রোদ পোহাচ্ছে। ক্যামেরার টেলিলেন্স ফিট করে চারটে ছবি তুলেছি। ওঃ! আজকের মতো শুভদিন জীবনে কখনও আসেনি। চিয়ার আপ জয়ন্ত! কুইক মার্চ, তবে নিঃশব্দে।
আমাকে ভাঙা দেউড়ির ওপাশে অপেক্ষা করতে বলে কর্নেল গুঁড়ি মেরে এগিয়ে গেলেন। কাল শেষ বেলায় ঘন ছায়া এবং তারপর দ্রুত আঁধার এসে পড়ায় কেল্লাবাড়ির জঙ্গল পরিষ্কার দেখতে পাইনি। এখন পাচ্ছিলাম। মিনিট দশেক পরে তিনি একটা ঝোপের আড়াল থেকে ইশারায় আমাকে ডাকলেন। কাছে গেলে চাপা স্বরে বললেন–ফায়ার আর্মস হাতে নাও। কিন্তু সাবধান! গুলি ছুঁড়ো না। এখন গুলি ছোঁড়ার দরকার হবে না।
তারপর ঝোপের পাশ দিয়ে উঁকি মেরে দেখলাম, সেই লোক দুটো এদিক-ওদিকে তাকাতে তাকাতে এগিয়ে আসছে। তারপর দুজন এককোণে দাঁড়িয়ে গেল। একজন বলল–তুমি গিয়ে মালটা নিয়ে এসো। আমি মেশিন হাতে পাহারা দিচ্ছি। বুড়ো মাইরি এমন ভয় পেয়েছে যে
তারপরই দেখলাম, বাঁদিক, ডানদিক এবং সামনের দিক থেকে একজন পুলিশ অফিসার আর দুজন দৈত্যাকৃতি কনস্টেবল বেরিয়ে এল। পুলিশ অফিসার রিভলভার তাক করে গর্জালেন–হাত ওঠাও। পিস্তলসুদ্ধ একজোড়া হাত ওপরে উঠল। দ্বিতীয় জন পালাতে যাচ্ছিল। ভোজপুরী কনস্টেবলের ছোট্ট লাঠি তার এক হাঁটুর পেছনে গিয়ে ঘা মরাতেই সে বাপ রে বলে পড়ে গেল। পুলিশ ইন্সপেকটারের হুকুমে অন্য ভোজপুরী দৈত্যটি পিস্তল কেড়ে নিয়ে তার গলার কাছে সোয়েটারের একটা অংশ খামচে ধরে পিঠে লাঠির গুঁতো মারল। সে-ও বাপ রে বলে ককিয়ে উঠল। তার সঙ্গী ততক্ষণে অন্য ভোজপুরী দৈত্যের কবলে বেড়ালছানার মতো মিউ মিউ করছে।
কর্নেল আমাকে ইশারা করে নিঃশব্দে কেটে পড়লেন। কেল্লার জঙ্গল পেরিয়ে ঝিলের ধারে এসে বললাম–একেই বলে ঘুঘু দেখেছ, ফদ দ্যাখোনি।
কর্নেল হাসলেন। -দোমোহানির বিখ্যাত পাবদা মাছের ঝোল খাব এবেলা। কী সৌভাগ্য!
