-কিন্তু কর্নেল, আপনার গলা থেকে পেটের কাছে যে ক্যামেরা ঝুলছে, উঠে দাঁড়ানোর সময় তার লেন্স অন্যদিকে ঘুরে যেতে পারে।
কর্নেল ভুরু কুঁচকে এবার তাকালেন। –তুমি সংবাদিক হলে কী করে জানি না। এতকাল ধরে তুমি আমার সঙ্গী। ক্যামেরাটা লক্ষ্য করোনি। এই দ্যাখো ক্যামেরার পিছনে একটা ক্লিপ। ওটা। আমার প্যান্টের বেলটের সঙ্গে আটকে দিলেই ক্যামেরার লেন্স সোজা থাকবে।
হাসতে হাসতে বললাম-এও কি আপনার সামরিক জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া?
কর্নেলও হাসলেন। –নাঃ! যে প্রজাপতি জাল দিয়ে ধরতে যাচ্ছি, এক হাতে তার দিকে ক্যামেরা তাকে করে শাটার টেপার অসুবিধে আছে। তার চেয়ে কোমরে ক্যামেরা আঁটা থাকলে প্রজাপতিটা জালে না ধরা পড়ুক, তার ছবিটা পেয়ে যাব। …
ঠান্ডা ক্রমশ বাড়ছিল। তাই নিয়মভঙ্গ করে কর্নেল রাত্রি সাড়ে নটায় এই ঘরেই ডিনার পাঠাতে বলেছিলেন। নরুঠাকুর আর ভৈরব দুটো ট্রেতে গরম লুচি, আলুর দম আর মুরগির মাংস রেখে গেল। কর্নেল জিজ্ঞেস করলেন–রমেনবাবু কী করছেন?
ভৈরব বলল-ম্যানেজারবাবুর স্যার ঠান্ডার ধাত। তাই এত রাতে বাইরে বেরোন না।
নরুঠাকুর বলল–ওতেই হবে তো স্যার? নাকি আরও একডজন লুচি ভেজে আনব?
কর্নেল হাসলেন। -আমার চেহারা দেখে ঠাকুরমশাই ভাবছেন, আমি লুচির পাহাড় গিলতে পারি? এই যথেষ্ট। আপনারা খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়ুন। এঁটো থালাবাটি সকালে নিয়ে গেলেই চলবে।
নরু ঠাকুর চলে গেল। ভৈরবকে ডেকে কর্নেল বললেন–তোমাদের বাংলোয় গার্ড নেই?
ভৈরব বলল–দুজন দারোয়ান আছে। পালা করে ডিউটি দেয়। গার্ডের দরকার হয় না স্যার। এ তল্লাটে চোর-ডাকাতের ভয় নেই। যারা ড্যামে বোট চালাতে বা পাখি দেখতে আসে, তারা দিনে এসে সন্ধ্যার আগে চলে যায়।
-দুপুরে যে মাছ খেয়েছি, তা কি এই ওয়াটারড্যামের?
আজ্ঞে হ্যাঁ। বাংলোয় গেস্ট এলে জেলেদের বলে আসি।
–আচ্ছা ভৈরব, তোমার বাড়ি কোথায়?
–চন্দ্রপুর স্যার।
রমেনবাবু চন্দ্রপুরের এক জাহাজিবাবুর কথা বলছিলেন। চেনো তাকে?
ভৈরব বাঁকা মুখে বলল-শম্ভু চৌধুরি সাংঘাতিক লোক স্যার। বছরে একবার বাড়ি আসে। কখন আসবে, তার ঠিক নেই। শুনলাম সে এ মাসে এসেছে। যখনই আসে, একটা করে মানুষ খুন হয়।
চমকে উঠেছিলাম। বললাম–সে কী! পুলিশ তাকে ধরে না?
ভৈরব বাঁকা মুখেই হাসবার চেষ্টা করল। পুলিশ জানতে পারলে তবে তো তাকে ধরবে!
কর্নেল হাসলেন। পুলিশ জানে না! তুমি কী করে জানতে পারো?
–আমার সন্দেহ হত আগে। পরে দেখে আসছি, যতবার জাহাজিবাবু বাড়ি আসে ততবার এলাকার কেউ না কেউ খুন হয়। গত বছর জাহাজিবাবু এসেছিল খরার মাসে। তারপর তিতলিপুরের সন্টুবাবুর লাশ পাওয়া গিয়েছিল ড্যামের জলে। জেলেরা লাশের খবর দিয়েছিল থানায়। পুলিশ এসে লাশ তুলল। মাথার পিছনে গুলির দাগ ছিল। সন্টুবাবুও অবশ্যি ভালো লোক ছিল না। বর্ডারে চোরাচালানির কারবার করত। জোরে শ্বাস ছেড়ে ভৈরব চাপা স্বরে ফের বলল–পুলিশ স্যার দেখেও দেখে না। এ পর্যন্ত আমার হিসেবে পাঁচটা খুন হয়েছে। প্রত্যেকটা লাশের মাথার পিছনে গুলির দাগ। আমার স্যার সামান্য মাথা। ক্লাস ফোর পর্যন্ত বিদ্যা। কিন্তু কারও মাথায় কেন এই সোজা ব্যাপারটা ঢোকে না জানি না।
-তুমি কি এ কথা আর কাকেও বলেছ?
–না স্যার! আমার ঘাড়ে কটা মাথা?
তবে আমাদের কাছে বলে ফেললে যে?
ভৈরব আড়ষ্ট মুখে হাসবার চেষ্টা করল। -ম্যানেজারবাবু বলছিল, আপনি স্যার মিলিটারি অফিসার। এতদিন পেটের ভিতরে কথাটা ঢুকে ছিল। আপনাকে বলে শান্তি পেলাম। মিলিটারি আমি কম বয়সে এই তল্লাটে কতবার দেখেছি স্যার! এখান থেকে পাকিস্তানের বর্ডার বেশি দূরে নয়। দুদেশে যুদ্ধ বাধার উপক্রম হলেই এই এলাকা মিলিটারিতে ভরে যেত। মিলিটারির পাওয়ার কত! স্যার এবার যদি আবার লাশ পড়ে, আপনি দয়া করে মিলিটারি ডেকে আনবেন। জাহাজিবাবুকে জব্দ করতে আপনারাই পারবেন।
কথাগুলো শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে বলেই ভৈরব চলে গেল। কর্নেলের মুখের দিকে তাকালাম। তিনি নির্বিকার মুখে মুরগির ঠ্যাংয়ে কামড় দিচ্ছেন। …
রাত দশটায় চুরুট ধরিয়ে কর্নেল দরজা বন্ধ করলেন। তারপর কিটব্যাগ থেকে প্রথমে ব্রোঞ্জের ডিমালো ফলকটা বের করলেন। ওটা কখন কী লোশনের সাহায্যে ব্রাশ দিয়ে ঘষে চকচকে করে ফেলেছেন। ওঁর কিটব্যাগে কি নেই? ফলকটার একপিঠে সারস এবং কয়েকরকম পাখি, তার ফাঁকে কতরকম রেখা দেখতে পেলাম। উলটো পিঠে অন্যরকম চিহ্ন। কর্নেলের ড্রয়িং রুমে একটা বইয়ে পেরেকের মতো লিপি দেখেছিলাম। কর্নেল বলেছিলেন, এর নাম কিউনিফর্ম লিপি। কীলকাকার লিপি বলতে পারো। তবে ও লিপি তিনহাজার বছর আগে চালু ছিল। ফলকটার মাথার দিকে একটা ফুটো আছে। এটা কি গলায় ঝুলিয়ে রাখার জন্য?
কর্নেল ততক্ষণে পিতলের নলের একটা মুখ ছুরির ডগা দিয়ে পরিষ্কার করে ফেলেছেন। একটু পরে তিনি নলের ভিতরটা আতশ কাচ দিয়ে দেখে নিলেন। তারপর একটা চিমটে দিয়ে টেনে বিবর্ণ এবং গুটিয়ে রাখা লম্বা একটা জিনিস বের করলেন। বললাম–কী ওটা?
–এটাকে বলে স্ক্রোল। প্রাচীন যুগে ভেড়া বা ছাগল জাতীয় প্রাণীর হুঁড়ির চামড়া শুকিয়ে একরকম কাগজ তৈরি করা হত। এতে কালো কালিতে কিছু লেখার পর গুটিয়ে রাখা হত। তাই ইংরেজিতে একে বলা হয় স্ক্রোল।
