তখনই কর্নেল আমাকে উঠে দাঁড়াতে ইশারা করলেন। আবছা আঁধার এখন ঘন হয়েছে। কর্নেল টর্চের আলো ফেলে তার রিভলভারের নল সেই আলোতে দেখিয়ে গর্জন করে উঠলেন–কোন ব্যাটা রে?
তাঁর দেখাদেখি আমিও টর্চ জ্বেলে উৎসাহের আতিশয্যে রিভলভার থেকে তাদের মাথার উপর দিয়ে এক রাউন্ড ফায়ার করে ফেললাম।
দুটো লোক একলাফে একটা ধ্বংসস্তূপের আড়ালে চলে গেল। কর্নেল সেদিকে টর্চ জ্বেলে আবার বিকট গর্জন করে এগিয়ে গেলেন। আমি পায়ের কাছে আলো ফেলে দেখলাম, একটা পাথরের স্ল্যাব কোনাকুনি মাটির তলায় ডুবে আছে। একটা ছোট্ট শাবল পড়ে আছে। পাথরের পাশে গর্ত খুঁড়ে একগাদা মাটি তোলা হয়েছে।
কিন্তু কর্নেলের পাত্তা নেই। শুধু একবার করে টর্চের আলোর ঝলকানি দেখতে পাচ্ছি। কর্নেল ওদের তাড়া করে যাচ্ছেন সম্ভবত। এটা কি ঠিক হচ্ছে? আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি। কী করা উচিত ভেবে পাচ্ছি না। প্রায় মিনিট পাঁচেক পরেই কর্নেলের সাড়া পেলাম। চাপা স্বরে ডাকলেন–জয়ন্ত!
সাড়া দিলাম। –এখানে আছি।
কাছে এসে কর্নেল হাসিমুখে বললেন –ওরা আর এখানে আসছে না। তুমি টর্চ জ্বেলে রাখো জয়ন্ত! আমি দেখি, পেতলের নলটা পাই নাকি!
এখানকার মাটি নরম। একটু খুঁড়তেই শাবলের ঘা কোনও ধাতব জিনিসে লেগে ঠং করে শব্দ হল। তারপর কর্নেল পাথরটার তলা থেকে ফুটখানেক লম্বা একটা নল বের করলেন। নলটার ব্যাসার্ধ প্রায় দু ইঞ্চি। নলটা থেকে মাটি পরিষ্কার করে কর্নেল তার পিঠের কিটব্যাগে চালান করে বললেন-কুইক। কেটে পড়া যাক। সোজা একেবারে বাংলোতে। …
বাংলোর বারান্দায় বড্ড হিম। ঘরে বসে কফি পান করতে করতে কর্নেলকে জিজ্ঞেস করলাম–সকালে মল্লযুদ্ধ দর্শনের মতো এই ঘটনাও কি আকস্মিক?
কর্নেল হাসলেন। নাঃ! দুপুরে ড্যামের রাস্তা দিয়ে প্রায় এক কিলোমিটার হেঁটেছিলাম। প্রচুর হাঁস, সারস, একজোড়া গগনভেড় পাখিরও ছবি তুলেছিলাম। ফিমের রোলটা শেষ করে ফেলার ইচ্ছে ছিল। কেন ছিল তা আশা করি বুঝতে পারছ।
-মল্লযুদ্ধের যোদ্ধাদের ছবি প্রিন্ট করা।
–ঠিক। অবশ্য তুমি তার আগেই কুকীর্তি করে বসে আছ।
–কুকীর্তি কী বলছেন? আপনার কোনও উদ্দেশ্য থাকলে কাজটা একধাপ এগিয়ে দিয়েছি।
-নাঃ। আমি এখানে নীল সারসের ছবি তুলতেই এসেছি। কিন্তু আমার বরাত জয়ন্ত! যেখানে যাই, এই রকম গোলমেলে ঘটনায় জড়িয়ে পড়ি।
-আপনি যা বলছিলেন, তাই বলুন। মানে, জাহান খাঁর কেল্লাবাড়িতে অভিযানের ব্যাপারটা।
কর্নেল উঠে গিয়ে পর্দা তুলে বারান্দার দু-দিক দেখে এলেন। তারপর ইজিচেয়ারে বসে চুরুট ধরিয়ে বললেন –ফেরার পথে ড্যামের রাস্তার ধারে একটা গাছের তলায় বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। কয়েকটা জেলে-নৌকো সেখানে বাঁধা ছিল। ওরা রান্না চাপিয়ে গল্প করছিল। এমন সময় দুটো লোক এসে জেলেদের কাছে মাছ কিনতে চাইল। ওরা, বলল, সব মাছ ভোরবেলা চালান গেছে। মাছ কিনতে হলে ভোরবেলা এসো। কথায় কথায় লোকদুটো যে চন্দ্রপুরের বাসিন্দা, তা জানতে পারলাম। তারা জেলেদের বলল–জাহাজিবাবু পাঠিয়েছেন। জেলেরা গ্রাহ্য করল না। যে-বাবুই পাঠান, এখন মাছ কোথায়? লোকদুটো হুমকি দিল-জাহাজিবাবুকে চেনো না? ইচ্ছে করলে উনি সব নৌকো ডুবিয়ে দেবেন। জেলেদের সঙ্গে এইসব তর্কাতর্কি চলছে, আমি তখনও তো জাহাজিবাবুকে চিনি না। বাইনোকুলারে আকাশ থেকে ধনুকের মতো বেঁকে নেমে আসা হিমালয়ের হাঁস দেখছি। প্যান্ট-সোয়টার পরা লোকদুটো সিগারেট ধরিয়ে কথা বলতে বলতে চলে গেল। আমাকে তারা গ্রাহ্য করেনি। কারণ আমার মতো অনেক টুরিস্ট এ সময় ড্যামের জলে পাখি দেখতে বা বোটে রোয়িং করতে আসে।
কর্নেল একদমে কথাগুলো বলে চুপ করলেন। বললাম-তারপর?
– আমার পিছন দিয়ে যাবার সময় কানে এল ওদের টুকরো-টুকরো কথা। এখন নয় … কেল্লাবাড়ির জঙ্গলে সাঁওতালরা আসে। … রমজান পাখাড়ু? হ্যাঁ, ও ব্যাটা বড্ড বেশি সেয়ানা। …দেউড়ির কাছাকাছি…হ্যাঁ, হ্যাঁ, বাবু ঢ্যারা দেগে রেখেছে। আমি চিনি চিনি। … শাবল চাই বইকি। …পাঁচটার মধ্যেই আসবে কিন্তু। আমি থাকব। …ওদের এইসব কথা আমার কানে ঢুকিয়ে দিচ্ছিল উত্তরের বাতাস। আমি দক্ষিণে। ওরা চলেছে উত্তরে। এই বাংলোর দিকে।
বলে কর্নেল ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজলেন। দাঁতের ফাঁকে চুরুট। আমি সেই পিতলের নলটা দেখার জন্য উশখুশ করছিলাম। বললাম–কিন্তু পেতলের নলে কী আছে দেখছেন কেন?
কর্নেল চোখ বুজেই বললেন–বাংলোয় ফিরে তোমার কাছে জাহাজিবাবুর নামধাম পরিচয় পেলাম। কাজেই কেল্লাবাড়ির জঙ্গলে না গিয়ে পারিনি। এবং আমার অভিযান সফলও হয়েছে!
-আহা, নলটা!
–এখন নয়। ডিনারের পর।
–ঠিক আছে। কিন্তু সেই লোকদুটোই কি পাথরের স্ল্যাব খুঁড়ছিল?
–বোকার মতো প্রশ্ন হল, ডার্লিং।
–মানে, আপনি শিয়োর কি না জানতে চাইছিলাম।
–আজ রাতে ক্যামেরা থেকে ফিল্ম রোলটা বের করে প্রিন্ট করে ফেলব। তুমি লক্ষ্য করোনি, টর্চের আলো জ্বালবার সঙ্গে-সঙ্গে ক্যামেরার শাটার অটোমেটিক করে রেখেছিলাম। তিন মিনিট সময় দেওয়া ছিল। কাজেই ওরা খুঁড়ে নলটা বের করার আগেই আমাকে উঠে দাঁড়িয়ে ওদের চার্জ করতে হয়েছিল।
-বলেন কী! ওদের ফোটোও তাহলে উঠেছে!
–ওঠার কথা। দেখা যাক।
