.
০২.
খাওয়ার পর দক্ষিণের বারান্দায় কর্নেল ও আমি রোদে বসে আছি। এমন সময় পশ্চিমের বারান্দা ঘুরে দানবের মতো অতিকায় একজন পুলিশ অফিসার এগিয়ে এলেন। তার গায়ের রং কালো। কিন্তু পাকানো গোঁফের নিচে সাদা দাঁতের হাসি ঝকমক করছিল। কর্নেলের কাছে এসে তিনি করজোড়ে নমস্কার করে বললেন-আমার সৌভাগ্য! এখানে কর্নেলসায়েবের মতো বিখ্যাত মানুষের দর্শন পাব কল্পনাও করিনি। আপনার কত নাম শুনেছি আমাদের পুলিশ মহলে। রমেন, বলছিল, একজন কর্নেলসায়েব এসেছেন। জিজ্ঞেস করতে বলল, কর্নেল নীলাদ্রি সরকার।
কর্নেল বললেন–আপনার কথাও শুনেছি। আপনি চন্দ্রপুর থানার ও সি মি. রাজেন্দ্র কুমার হাটি।
বড়োবাবু খাকি পোশাকে ঢাকা তাঁর প্রকাণ্ড ভুঁড়ি কাঁপিয়ে অট্টহাসি হাসলেন। কর্নেলসাহেব! আপনার নাকি পিছনেও একটা চোখ আছে। যাই হোক, আমাকে এখনই থানায়। ফিরতে হবে। কিংবদন্তির নায়ককে একবার চোখের দেখা দেখতে এলাম। এই অধম যদি আপনার কোনও উপকারে লাগে, প্লিজ স্মরণ করবেন। কদিন থাকছেন স্যার?
–কিছু ঠিক নেই। আমি এসেছি দুর্লভ প্রজাতির নীল সারসের খোঁজে।
দারোগবাবু আবার হাসলেন। –আপনার এসব হবির কথাও শুনেছি। কলকাতার লালবাজারে ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টে সাব-ইন্সপেকটর নরেশ ধর আমার মাসতুতো ভাই স্যার।
বাঃ! নরেশবাবুকে বলব আপনার কথা। …
আরও কিছু কথাবার্তার পর পুলিশ অফিসার রাজেন হাটি চলে গেলেন। একটু পরে গেটের ভিতর দিয়ে সেই পুলিশ জিপটা বেরিয়ে গেল। পিছনে বন্দুক হাতে কনস্টেবলদের দেখা যাচ্ছিল।
বললাম–তখন বলছিলেন না জেনে বিষধর সাপের ল্যাজে পা দিয়েছি। এবার রাজেন হাটির মতো জাঁদরেল পুলিশ অফিসার বেদে হয়ে সাপটার বিষদাঁত ভেঙে
কর্নেল আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন-ও কথা নয়। চলো। বেরুনোনা যাক।
-কোথায় যাবেন?
–প্রশ্ন নয়। শিগগির রেডি হয়ে বেরিয়ে এসো। সঙ্গে তোমার ফায়ার আর্মস নিয়ো।
কথাটা শুনে একটা অস্বস্তিতে শরীরে যেন শিহরন ঘটে গিয়েছিল। একটু পরে কর্নেলের সঙ্গে বেরিয়েছিলাম। সদর গেট পেরিয়ে কর্নেল পিচের রাস্তায় যেদিক থেকে এসেছি, সেইদিকে হাঁটছিলেন। ডাইনে ঝিল পেরিয়ে গিয়ে কলে সোজা ঝোপঝাড়ের ভিতর দিয়ে জঙ্গলে ঢুকলেন। ঝরাপাতার স্তূপে জুতোর চাপ অদ্ভুত শব্দ করছিল। কিছুক্ষণ পরে আমরা জাহান খাঁর কেল্লাবাড়ি এলাকায় ঢুকেছিলাম। শীতের বিকেলে সেখানে এখনই গাঢ় ছায়া। ধ্বংসস্তূপে জঙ্গল গজিয়ে আছে। মাঝে মাঝে একটা ভাঙা পাঁচিল, গম্বুজ ঘর এবং গম্বুজে ফাটল, একটা দেউড়ি, তারপর মুখ থুবড়ে পড়া মসজিদ চোখে পড়েছিল। কর্নেল কখনও একটু থেমে বাইনোকুলারে চারদিক দেখে নিচ্ছিলেন। একবার আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম–নীল সারসের দলটা খুঁজছেন নাকি? কর্নেল শুধু বলেছিলেন–হুঁ।
দ্রুত দিনের আলো কমে যাচ্ছিল। ফাঁকা জায়গা থেকে অদুরে কুয়াশার পর্দা দেখতে পাচ্ছিলাম। কিছুক্ষণ পরে কর্নেল আমার কাঁধে হাত চেপে আমাকে বসিয়ে দিলেন এবং নিজেও গুঁড়ি মেরে বসলেন। তারপর কানে এল, সামনের দিকে ঝরাপাতার ওপর পা ফেলে কে যেন হেঁটে আসছে।
একসময় শব্দটা থেমে গেল। আমরা একটা ভাঙা গম্বুজের আড়ালে ছিলাম। মাটিতে বসে-যাওয়া গম্বুজের চারপাশে ঝোপঝাড়। সিগারেটের ধোঁয়ার গন্ধ ভেসে এল। এখন শীতের হাওয়াটা বন্ধ। মাঝে মাঝে পাখির ডাক শোনা যাচ্ছিল। কে সিগারেট টানছে, দেখার জন্য একটু সরে যাচ্ছিলাম। কর্নেল আমাকে টেনে ধরে বাধা দিলেন। সময় কাটছিল না। কতক্ষণ পরে আবার শুকনো পাতার ওপর শব্দ শোনা গেল। লোকটা চলে যাচ্ছে ভেবেছিলাম। কিন্তু তখনই কেউ চাপা স্বরে বলে উঠল–এত দেরি করলে কেন? অন্ধকার হয়ে যাবে শিগগির। খামোখা তার কথার ওপর অন্যজন বলল–টর্চ আনননি?
–এনেছি।
–আমিও এনেছি।
–তাহলে অসুবিধে কীসের? তুমি খুঁড়বে। আমি আলো দেখাব। আমি খুঁড়ব। তুমি আলো দেখাবে।
-বাবু দাগ দিয়ে রেখে গেছেন। কই সেই দাগ?
–এই যে। কিন্তু আমি একটা কথা ভাবছি।
ভাবছটা কী? সামান্য কাজ।
–সামান্য নয় হে! পাথরের স্ল্যাব। তলায় কতটা পোঁতা আছে কে জানে। তাছাড়া স্ল্যাবের তলায় যদি পেতলের নলটা না থাকে?
–থাকবেই। বাবু গতবছর স্ল্যাবের তলায় ওটা পুঁতে রেখে গিয়েছিলেন। তখন আমিই। স্ল্যাবটার এখানে সুড়ঙ্গ মত করেছিলাম।
–তাহলে তো তুমি সেই জায়গাটা চেনো। আমি আলো জ্বালি। তুমি সেখানটা খোঁড়ো।
এবার টর্চের আলোর একটু ঝলকানি দেখতে পেলাম। তারপর খোঁড়ার শব্দ। একটু পরে একজন বলল–আচ্ছা, ফরেস্ট গার্ডটা যদি হঠাৎ এসে পড়ে?
–তোমার মাথাখারাপ? এই শীতের সন্ধ্যায় ব্যাটারা ফরেস্টবাংলোর কাছাকাছি কোথাও থাকবে। আমরা তো গাছ কাটছি না যে সেই শব্দ শুনে দৌড়ে আসবে।
আবার মাটি খোঁড়ার শব্দ হতে থাকল। এবার কর্নেল আমাকে টেনে নিয়ে একটু পিছনে একটা ঝোপের আড়ালে। তারপর গুঁড়ি মেরে বসে শুকনো পাতার ওপর জুতোর চাপা শব্দ করতে থাকলেন।
অমনই লোকদুটো একসঙ্গে বলে উঠল–কীসের শব্দ?
–এই! কেল্লাবাড়ির জঙ্গলে সেবার বাঘ এসেছিল। বাঘ নয় তো?
–কিছু বলা যায় না। সঙ্গে মেশিন আছে। আন্দাজে গুলি ছুঁড়ব? যদি ভয় পেয়ে পালায়!
–ঠিক বলেছ। কিন্তু তোমার দিশি পিস্তলের শব্দ শুনে বাঘ যদি উলটে খেপে ওঠে?
