এই সময় বাংলোর কুকনরুঠাকুর এসে আমাদের সেলাম দিল। তারপর ট্রে-তে সাজিয়ে প্লেট, কফির পট আর কাপগুলো নিয়ে গেল। রমেনবাবুকে মুচকি হেসে চাপা স্বরে বললেন–একেই বলে ভাগ্য স্যার! তখন তিতলিপুরের জমিদারদের কথা বলছিলাম, নরু–মানে নরেন সেই বংশের ছোটোতরফের বংশধর। ওর পূর্বপুরুষের দাপটে এক সময় বাঘে-গোরুতে এক ঘাটে জল খেত! পূর্বজন্মের কাজের ফল। আর কী বলব?
কর্নেল অ্যাশট্রেতে চুরুট ঘষে নিভিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। মাথায় টুপি চাপালেন। টাকে ইতিমধ্যে যথেষ্ট হিম লেগেছে মনে হল। তারপর ঘরে ঢুকে ওঁর কিটব্যাগ পিঠে এঁটে বেরিয়ে এলেন। গলায় ক্যামেরা, বাইনোকুলার ঝুলিয়ে বললেন-জয়ন্ত! তুমি বিশ্রাম করো। আমি একবার ড্যামের ওদিকে ঘুরে আসি।
তারপর তিনি পশ্চিমে সদর গেট দিয়ে বেরিয়ে গেলেন। একটু পরে বাংলোর নিচু বাউন্ডারি ওয়ালের ওপাশে তাকে দেখা গেল। বুঝলাম ড্যামের বাঁধের রাস্তা ধরে এগিয়ে যাবেন। কতদূর যাবেন, তা তিনিই জানেন।
রমেনবাবু জিজ্ঞেস করলেন-কর্নেলসায়েবেরও কি ঘোষালসায়েবের মতো পাখির নেশা আছে?
বললাম–নীল সারসের খোঁজে চললেন। এতক্ষণ কথা বলে বোঝেননি?
-তাই বটে! আপনি রেস্ট নিন স্যার! আমি নিজের কাজে যাই।
–এক মিনিট! আচ্ছা রমেনবাবু, তিতলিপুরের পাশ দিয়ে আসবার সময় রাস্তায় এক ভদ্রলোককে দেখলাম। ফরসা ঢ্যাঙা গড়ন। ধুতি আর ছাইরঙা লংকোট পরে আছেন! মাথার চুল সাদা। গোঁফদাড়ি কামানো। চেহারায় আভিজাত্য আছে। ষাটের বেশি বয়স বলে মনে হল। আর
রমেনবাবু হাসলেন। -বুঝেছি। আপনি যাকে দেখেছেন, তিনি তিতলিপুরের জমিদারদের বড়োতরফের বংশধর। দীপনারায়ণ রায়। কলকাতায় কী চাকরি করতেন শুনেছি। এখন রিটায়ার্ড। তবে মাঝে মাঝে তিতলিপুরে এসে বোনের বাড়িতে থাকেন। কিন্তু উনি কবে এসেছেন, জানি না।
উনি অন্য এক ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলছিলেন। এ ভদ্রলোকের পরনে প্যান্ট আর। সোয়েটার ছিল। শ্যামবর্ণ, একই বয়সের লোক। মাথার চুল সাদা। কিন্তু কাঁচাপাকা গোঁফ আছে। কী দুজনে তর্কাতর্কি হচ্ছিল মনে হল।
রমেনবাবু নড়ে উঠলেন। -বুঝেছি! বুঝেছি! চন্দ্রপুরের জাহাজিবাবু।
-জাহাজিবাবু মানে?
জাহাজে চাকরি করতেন। শম্ভুনাথ চৌধুরি। শম্ভুবাবুকে এ তল্লাটের লোকে জাহাজবাবু বলে। সত্যি বলতে কি, শম্ভুবাবুর সঙ্গে দীপনারায়ণবাবুর আত্মীয়তা আছে। সঠিক খবর জানি না। তবে চন্দ্রপুরে শম্ভুবাবুর পূর্বপুরুষও জমিদার ছিলেন।
–ওঁরা তর্কাতর্কি করলেও মনে হল, দুজনের মধ্যে বন্ধুতা আছে।
–আছে। ছোটোবেলায় দেখেছি শম্ভুবাবু ছুটি নিয়ে দেশের বাড়িতে ফিরলেই প্রায় প্রতিদিন দীপনারায়ণবাবুর সঙ্গে আড্ডা দিতে আসতেন। তবে তর্কাতর্কি হচ্ছে দেখেছেন, ওটা স্যার স্বাভাবিক। আজকাল দেশে যা ঘটছে, তা নিয়ে মানুষে-মানুষে মতান্তর হতেই পারে। একেক গ্রামে দুটো-তিনটে করে দল হয়েছে। ওই যে বললাম মতান্তর! মতান্তর থেকে মনান্তর। তা থেকে মারামারি। খুনোখুনি! ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় ছোটোবেলায় পদ্যে পড়েছি। চলি স্যার!
বলে রমেনবাবু হন্তদন্ত বাংলোর সামনের দিকে গেলেন। দেখলাম, দারোগাবাবু সদলবলে ফিরে আসছেন। আমি ঘরে ঢুকে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। এখানে জলাধারের আবহাওয়ায় শীতটা বড় জোরালো। কম্বল টেনে নিলাম। …
কর্নেলের ডাকে উঠে বসলাম। ঘড়ি দেখে নিলাম। একটা পাঁচ। কর্নেল বললেন–স্নান করে ঘুমোতে পারতে। বাথরুমে গিজার আছে। গরম জল পেতে।
বললাম–আপনি কতদূর ঘুরলেন?
–অনেক দূর।
–নীল সারসের খোঁজ পেলেন?
-নাঃ। তবে ফিলমের রোলটা শেষ করেছি। আজ রাত্রেই বাথরুমকে ডার্করুম বানিয়ে ফিলমগুলো ডেভেলাপ, ওয়াশ আর প্রিন্ট করে ফেলব।
বলে কর্নেল অর্থপূর্ণ হাসলেন। আমি বললাম–আমি দুই মল্লযোদ্ধার পরিচয় পেয়ে গেছি। চেহারার বর্ণনা দিতেই রমেনবাবু বললেন, ধুতিপরা লোকটি দীপনারায়ণ রায়। আর প্যান্টপরা। লোকটি-
কর্নেল চোখ কটমটিয়ে বললেন–জয়ন্ত! তুমি বড্ড বোকামি করে ফেলেছ। রমেনবাবুর বাড়ি তিতলিপুরে। তুমি ওঁকে কি প্রকৃত ঘটনাটা বলেছ?
–আমার মাথাখারাপ? আমি দুজনকে রাস্তায় তর্কাতর্কি করতে দেখেছি। এই বলেছি।
কর্নেল বললেন–তাহলেও তুমি ঠিক করোনি। রমেনবাবু কী বললেন বলো!
রমেনবাবুর কাছে যা শুনেছিলাম, চাপা স্বরে তা জানিয়ে দিলাম। কর্নেলের মুখের গাম্ভীর্য তবু কাটল না। গলার ভিতরে বললেন–সমস্যা হল, রমেনবাবু আমরা এখানে থাকার সময় দৈবাৎ তার গ্রামে গিয়ে যদি দীপনারায়ণ রায়কে আমাদের পরিচয় দেন, কী ঘটবে বুঝতে পারছি না।
চমকে উঠে বললাম-কেন?
কর্নেল একটু চুপ করে থাকার পর বললেন-যে জিনিসটা নিয়ে দুজনের মধ্যে কাড়াকাড়ি এবং শেষে ধস্তাধস্তি বেধেছিল, ওদের দুজনেরই দৃঢ় বিশ্বাস জন্মাবে, সেটা আমিই কুড়িয়ে পেয়েছি। কারণ আমিই গাড়ি থেকে নেমে ওদের ছবি তুলতে এগোচ্ছিলাম। কুড়িয়ে পাওয়া জিনিসটা কয়েন নয়।
–জিনিসটা তাহলে কী?
–ডিমালো গড়নের একটা ব্রোঞ্জের সিল। নাকি ওটা সিল নয়। ওতে একটা সারসের মূর্তি আছে। তা ছাড়া কয়েকটা চিহ্ন আছে। আমার মনে হয়েছে, ওটা মিশর থেকে কেউ চুরি করে এনেছে। মিশরের প্রাচীন চিত্রলিপিতে কিছু কথা লেখা আছে ওতে। জয়ন্ত! হয়তো আমরা না জেনে বিষধর সাপের ল্যাজে পা দিয়েছি। …
