কিছুদূর চলার পর বাঁদিকে বাঁক নিয়ে রাস্তা সোজা এগিয়ে গেছে। এবার ডানদিকে সবুজ মাঠ এবং বাঁদিকে একই জঙ্গল–সেই ফরেস্ট টানা চলেছে। প্রায় দু কিলোমিটার পরে বাঁদিকে জঙ্গলের শেষ প্রান্তে অর্থাৎ পূর্বদিকে পুরোনো আমলের প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ দেখলাম। তার নিচে স্বচ্ছজলের ঝিল। ঝিলের ওপাশে উঁচু বাঁধ। কর্নেলকে জিজ্ঞেস করলাম–ওটা কি কোনও রাজারাজড়ার বাড়ি ছিল?
-হ্যাঁ। তবে বাড়ি নয়। কেল্লা। মোগল আমলের এক ফৌজদার জাহান খাঁর কেল্লাবাড়ি। ইচ্ছে হলে ওটা দেখে নিয়ে ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে গিয়ে দরকারি বই খুঁজে দৈনিক সত্যসেবকে একটা। রিপোর্টাজ লিখে ফেলবে।
-এবার কিন্তু আমার সন্দেহ হচ্ছে, আপনার লক্ষ্য দুর্লভ প্রজাতির নীল সারস, নাকি অন্য কিছু?
কর্নেল হাসলেন। তাই বলুন! গত রবিবার ড. জয়ন্ত ঘোষাল আপনার কাছে এসেছিলেন।
-তুমি জানো না, ড. ঘোষাল একজন প্রখ্যাত ওর্নিহোলজিস্ট!
–সেটা কী?
–ওঃ জয়ন্ত! এযুগে সাংবাদিকদের সবজান্তা হওয়া দরকার। গ্রিক ভাষায় ওর্নিহো মানে পাখি।
-তার মানে ড. ঘোষাল এক পক্ষীতত্ত্ববিশারদ। মুম্বাইয়ের সালিম আলির নাম জানি!
-বাঃ! তিনি তো আর বেঁচে নেই। একজন বঙ্গসন্তান তার মতো কৃতিত্ব অর্জন করলে খুশি হব।
এবার সামনে উঁচু জমির ওপর সুদৃশ্য বাংলো ধাঁচের বাড়ি এবং উঁচু বাঁধের ওপর সারিবদ্ধ ইউক্যালিপটাস গাছের ফাঁকে বিস্তীর্ণ জল চোখে পড়ল। জলে উত্তরের বাতাসে সমুদ্রের মতো ঢেউ দেখা যাচ্ছিল। জায়গাটা আমার ভালো লাগল।
পিচরাস্তাটা বাংলোর দক্ষিণের নিচু পাঁচিলের পাশ দিয়ে এগিয়ে ডাইনে ঘুরে বাঁধের রাস্তায় মিশেছে। সেখানে একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। মনে হল, একটা পুরো পরিবার সাইট-সিইংয়ে এসেছে। হয়তো বাঁধের ওপর পিকনিকও করবে।
দারোয়ান গেট খুলে দিল। গাড়ি সুদৃশ্য লনে নুড়ির ওপর অদ্ভুত শব্দ করছিল। কর্নেলের নির্দেশে ডানদিকের পার্কিং জোনে গাড়ি দাঁড় করালাম। কর্নেলকে দেখে একজন রোগা মধ্যবয়সি ভদ্রলোক হন্তদন্ত এগিয়ে এসে নমস্কার করলেন। –আমি স্যার বাংলোর কেয়ারটেকার রমেন বিশ্বাস। তিনি উর্দিপরা একটা লোককে বললেন-ভৈরব! তুমি সায়েবদের লাগেজ নিয়ে এসো। আসুন কর্নেলসায়েব! আমি আপনাদের রুমে পৌঁছে দিই।
পার্কিং জোনে একটা জিপগাড়ি দেখিয়ে কর্নেল বললেন–কোনও অফিসার এসেছেন বুঝি?
রমেনবাবু চাপাস্বরে বললেন–চন্দ্রপুরের বড়োবাবু–মানে, থানার অফিসার-ইন-চার্জ রাজেন হাটি। দোমোহানির উত্তরে সরকারি জমি দখল করে কিছু উটকো লোকবসতি করেছে। তাই নিয়ে এলাকার দুটো রাজনৈতিক দলের মধ্যে রেষোরেষি চলেছে। বড়োবাবু কয়েকজন আমর্ড কনস্টেবল নিয়ে সেখানে গেছেন। বাংলোর চারটে ঘরের দুটো ঘর-বলতে গেলে উনি নিজেই জবরদখল করেছেন। ইরিগেশন ডিপার্টমেন্টের বাংলো। এখন হঠাৎ আমার ওপরওয়ালা কেউ এসে পড়লে আমাকেই কৈফিয়ত দিতে হবে। কিন্তু পুলিশ বলে কথা! আমি স্যার কী করি বলুন! রামে মারলে মারবে, আবার রাবণে মারলেও মারবে…!
বাংলোর চারদিকে চওড়া বারান্দা। পূর্ব-দক্ষিণের ডাবলবেড ঘরটি কর্নেলের জন্য রাখা ছিল। পূর্ব এবং দক্ষিণের বারান্দায় বসলে বিস্তীর্ণ জলাধার চোখে পড়ে। কিন্তু পূর্বদিকে উত্তরের উদ্দাম বাতাস। আমরা দুজনে দক্ষিণের বারান্দায় বেতের চেয়ারে বসে ব্রেকফাস্ট করার পর কফি পান করছিলাম। বারান্দার নিচে রংবেরংয়ের ফুলের গাছ। তার মধ্যিখানে নুড়িবিছানো একফালি পথ। পথের শেষে গেট। উঁচু থেকে দেখতে পাচ্ছিলাম, গেটের ওধারে শানবাঁধানো ঘাটের নিচে একটা সাদারঙের বোট।
.
কেয়ারটেকার রমেন বিশ্বাসের বাড়ি তিতলিপুর। অনর্গল বকবক করা ভদ্রলোকের অভ্যাস। কর্নেলকে সারা এলাকার খুঁটিনাটি খবরাখবর দিচ্ছিলেন। একবার আমি রমেনবাবুকে তিতলিপুরের কাছে রাস্তার ওপর দুই মল্লযোদ্ধা সম্পর্কে প্রশ্ন করতে যাচ্ছিলাম। কর্নেল তা টের পেয়েই চোখ কটমটিয়ে আমাকে বললেন- নীল সারস কি অত সহজে দেখা যায় জয়ন্ত? ড. ঘোষাল সাত-সাতটা দিন ঘোরাঘুরি করার পর দৈবাৎ দেখতে পেয়েছিলেন!
আমি চুপ করে গেলাম। রমেনবাবু বললেন–কী নাম বললেন কর্নেলসায়েব? ড. ঘোষাল?
কর্নেল বললেন-হা, ড. জয়ন্ত ঘোষাল। আপনার তাকে চেনার কথা। উনি এই বাংলোয় ছিলেন।
–হ্যাঁ, হ্যাঁ। চিনতে পেরেছি। ঘোষালসায়েব এ মাসের গোড়ার দিকে এসেছিলেন। দিন ছ-সাত ছিলেন। কিন্তু রাত্রিটুকুই যা বাংলোয় কাটাতেন। ভোরবেলা বেরিয়ে যেতেন। আপনার মতো ক্যামেরা আর দূরবিন ছিল। বনবাদাড়ে আর এই ড্যামের জলে জেলেদের নৌকোয় চেপে পাখিদের ছবি তুলতে যেতেন। সঙ্গে একজন লোক দিয়েছিলাম। চন্দ্রপুরে তার বাড়ি। পাখিধরা তার পেশা স্যার! ফাঁদ পেতে পাখি ধরে কলকাতায় বেচে আসে। পুলিশের চোখে পড়লে তাকে জেল খাটতে হবে। কিন্তু পেটের জ্বালা স্যার সাংঘাতিক জ্বালা।
বললাম–কর্নেল! লোকটাকে সঙ্গী করতে পারেন! নীল সারসের খোঁজ সে নিশ্চয় রাখে।
কর্নেল কিছু বলার আগে রমেনবাবু বললেন–স্যার বললেই আমি রমজান পাখাডুকে খবর দেব।
-পাখাড়ু! অদ্ভুত পদবি তো!
রমেনবাবু হাসলেন। -হ্যাঁ স্যার। পাখি ধরে। তাই পাখাড়ু।
কর্নেল বললেন–তাকে দরকার হলে আমি আপনাকে বলব।
