-চাওয়ালা হেসে উঠল। দোমোহানি গ্রাম নয় স্যার। দুটো নদী উত্তর আর পুবদিক থেকে এসে মিশেছে। সেখানে আগের দিন ছিল অথই জলের বিল। গরমেন্ট বছর দশেক আগে সেই বিলের চারদিকে বাঁধ দিয়ে ড্যাম করেছে। আর স্যার, ওই পথের ওপাশে যে জঙ্গল ছিল, সেটাকে করেছে ফরেস্ট।
কর্নেল ঘড়ি দেখে বললেন–নটা পনেরো। জয়ন্ত! আর তাড়াহুড়ো নয়। আস্তে ড্রাইভ করো।
গাড়িতে উঠে বললাম-জঙ্গলে প্রজাপতি, অর্কিড, আর পাখি-টাখি দেখতে দেখতে যাবেন।
কর্নেল তাঁর প্রকাণ্ড শরীর আমার বাঁপাশে ঢুকিয়ে বললেন-তুমি পাখির সঙ্গে টাখি বললে। বলা যায় না, আমরা টাখিরও দর্শন পেতে পারি।
বলে তিনি চুরুট ধরালেন। কাত্যায়নীতলায় ডাইনে ঘুরে পূর্বমুখী একটা সংকীর্ণ পিচরাস্তায় আস্তে এগিয়ে গেলাম। কলকাতার রাস্তায় প্রায়ই এই স্পিডে আমাকে গাড়ি চালিয়ে দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার অফিসে পৌঁছুতে হয়।
রাস্তাটা মসৃণ নয়। এবড়োখেবড়ো। আমাদের ডাইনে আমবাগান, ঝোপ-জঙ্গল, কোথাও পুরোনো কালের দালানকোঠার ধ্বংসস্তূপ এবং এসবের ফাঁকে তিতলিপুরের ঘর-বাড়ি চোখে পড়ছিল। মাঝে মাঝে ডাইনে একটা করে মাটির রাস্তা, একটা মোরামবিছানো রাস্তা আর পায়ে চলা রাস্তা তিতলিপুরের ভিতরে ঢুকে গেছে। কিন্তু বাঁদিকে টানা জঙ্গল। ঝোপঝাড় যত, তত উঁচু গাছ এবং শালবন। এই শীতে শালবনের চেহারা রুক্ষ, হতশ্রী। পাতা ঝরে গেছে। তবে চিরহরিৎ গাছপালা যেন তাদের দারিদ্র্য ঢেকে রেখেছে।
কর্নেল বাইনোকুলারে অর্কিড প্রজাপতি বা পাখি–আমি বলেছি পাখি-টাখি, অভ্যাসমতো খুঁজছেন। কিছুদূর চলার পর রাস্তা ডানদিকে বাঁক নিল। বাঁদিকে একটানা জঙ্গল, চাওয়ালার ফরেস্ট। ডানদিকে সিঙ্গাপুরি কলাবাগান। কখনও আমবাগান। হঠাৎ কর্নেল বললেন –ডার্লিং! তুমি টাখির কথা বলছিলে। এবার সত্যিই টাখি দেখতে পাবে। স্পিড বাড়াও।
কিছুটা এগিয়েই দৃশ্যটা চোখে পড়ল।
দুজন ভদ্রলোক রাস্তার উপর মল্লযুদ্ধ করছেন। একজনের পরনে প্যান্ট, ফুলহাতা সোয়েটার। অন্যজনের পরনে ধুতি আর গলাবন্ধ লম্বাকোট। দুজনে পরস্পরকে ধরে জাপটাজাপটি করছিলেন। তারপর ওই অবস্থায় রাস্তার পাশে ঘাসে গিয়ে পড়লেন। আশ্চর্য ব্যাপার, দুই যোদ্ধাই প্রবীণ। দুজনেরই মাথার চুল সাদা।
আমাদের গাড়ির প্রতি তাদের দৃকপাত নেই। কর্নেল সত্যিই বলেন, হিংসাজনিত ক্রোধ মানুষকে অন্ধ করে। কর্নেলের ইশারায় আমি যতটা সম্ভব নিঃশব্দে দুই মল্লযোদ্ধার প্রায় হাতবিশেক দূরে গাড়ি দাঁড় করালাম। আমি হাসছিলাম না। কারণ তাদের হুম হাম হুঙ্কার, ফোঁস ফোঁস শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ এবং পরস্পরের পোশাক টানাটানি দেখে মনে হচ্ছিল, এবার একজন। অপরজনের বুকে বসে গলাটিপে মেরে ফেলবেন।
আবার তারা উঠে দাঁড়িয়ে বিকট হুঙ্কার দিয়ে পরস্পর মল্লযুদ্ধে রত হতেই কর্নেল গাড়ি থেকে নামলেন। তারপর ক্যামেরা তাক করে এগিয়ে গেলেন। শাটার টেপার শব্দ কানে আসছিল।
এতক্ষণে অদ্ভুত ঘটনা ঘটে গেল। দুই যোদ্ধারই চোখ পড়ল কর্নেলের দিকে। অমনই প্যান্ট-সোয়েটারপরা শ্যামবর্ণ ভদ্রলোক যেন দিশাহারার মতো বাঁদিকের জঙ্গলের ভিতরে সবেগে। উধাও হয়ে গেলেন। ধুতি-লংকোটপরা ফরসা ভদ্রলোকও ডানদিকে আমবাগানের ভিতরে একই বেগে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।
কর্নেল তাঁর বিখ্যাত অট্টহাসি হেসে বললেন তা হলে জয়ন্ত! আমরা সত্যিই একটা টাখি দেখলাম। তাই না?
গাড়ি থেকে নেমে বললাম কিন্তু কর্নেল, ব্যাপারটা অস্বাভাবিক।
–কেন অস্বাভাবিক?
–আমাদের দেখে ওঁরা অমন করে পালিয়ে গেলেন কেন?
–বরং বলে আমাকে দেখে। কারণ আমি রাস্তায় নেমে ওঁদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম।
–তা অবশ্য ঠিক। কিন্তু তা হলেও ওঁরা দিশেহারা হয়ে পালিয়ে গেলেন। এর কারণ কী?
-তোমার কী ধারণা? একটু ভেবে বলল জয়ন্ত!
একটু ভেবে নিয়ে বাঁ হাতের ওপর ডান হাতের থাপ্পড় মেরে হাসতে হাসতে বললাম-বুঝেছি। দুজনেই দস্তুরমতো ভদ্রলোক। তাই লজ্জায় অপ্রস্তুত হয়ে কেটে পড়লেন আর কী!
কর্নেল তাঁর সাদা দাড়ি মুঠোয় চেপে ধরে কী যেন ভাবছিলেন। বললেন-না জয়ন্ত! ক্যামেরা। আমার এই ক্যামেরাই ওঁদের পালানোর কারণ।
কথাটা এবার মনে ধরল। বললাম–হ্যাঁ, হ্যাঁ। ঠিক তা-ই। দুজনেই ভদ্রলোক। বুড়োবয়সে ওইভাবে মল্লযুদ্ধ করছেন। আর আপনি ক্যামেরায় সেই অদ্ভুত ঘটনার ছবি তুলতে যাচ্ছেন। সেই ছবি এলাকার পরিচিত লোকে দেখলে হাসাহাসি করবে। সেই ভেবেই ওঁরা রণক্ষেত্র থেকে পালিয়ে গেলেন। কিন্তু আমি আপনার ক্যামেরার কয়েকটা ক্লিক শুনতে পেয়েছি।
কর্নেল বললেন–হ্যাঁ। আমার হাতে ক্যামেরা এবং আমার উদ্দেশ্য টের পেয়েই ওঁরা পালিয়েছেন। তো-তুমি রণক্ষেত্র বললে। রণক্ষেত্রে ওটা কী পড়ে আছে?
বলে তিনি পিচরাস্তার ডানদিকে পিচ আর পাথরকুচির টুকরো উঠে গিয়ে যে ছোট্ট গর্ত হয়েছে, সেখান থেকে কী একটা জিনিস তুলে নিলেন। জিজ্ঞেস করলুম-পকেট থেকে কয়েন পড়ে গেছে। নিশ্চয়-যা যুদ্ধ চলছিল।
কর্নেল জিনিসটা তার জ্যাকেটের ভিতর-পকেটে ঢুকিয়ে রেখে গাড়িতে উঠলেন। আমিও উঠে পড়লাম। স্টার্ট দিয়ে লক্ষ্য করলাম, আমার বৃদ্ধ বন্ধুর মুখ হঠাৎ বেজায় গম্ভীর হয়ে উঠেছে। তিনি বললেন-এবার স্পিডে চলো, জয়ন্ত! দশটার মধ্যেই আমার সেচবাংলোয় পৌঁছুনোর কথা।
