আমি এসব কথাবার্তার মাথামুণ্ডু বুঝতে পারছি না। চুপচাপ শুনে যাচ্ছি। শুধু টের পাচ্ছি, এই টোনাবাবা ভদ্রলোকের খুলির ভেতরকার নরম বস্তুটিতে নিশ্চয় কোনও গণ্ডগোল ঘটেছে।
হ্যাঁ, ঠিক তাই। আমাদের খাওয়াদাওয়া শেষ হবার পর ফের লনে গিয়ে বসে আছি, এমন সময় একটা জিপ এসে উপস্থিত হল। কয়েকজন অফিসার গোছের ভদ্রলোক এগিয়ে এসে বললেন–নমস্তে কর্নেলসাব! কই, আমাদের পেশেন্ট ভদ্রলোক কোথায়?
অবাক হয়ে দেখি, টোনাবাবা কখন চেয়ার থেকে ছিটকে গেছেন এবং আলোছায়ায় ভরা লনে ফুলগাছের আড়ালে হামাগুড়ি দিচ্ছেন এবং কাঁধে মহারাজও রয়েছে।
টর্চের আলো পড়তেই উঠে দাঁড়িয়ে বিকট চেঁচিয়ে বললেন-যাব না। কিছুতেই যাব না।
অফিসাররা তাকে ধরে ফেললেন। তারপর টানতে টানতে জিপের দিকে নিয়ে গেলেন। বেড়ালটা ওঁর কাঁধ আঁকড়ে বসে রইল।
টোনাবাবাকে নিয়ে জিপ চলে গেলে এতক্ষণে বললুম-হে বৃদ্ধ ঘুঘুপাখি! এসবের অর্থ কী?
কর্নেল হোহো করে হেসে বললেন–এখনও বোঝোনি জয়ন্ত! টোনাবাবা কিছুদিন আগে রাঁচির পাগলাগারদ থেকে পালিয়ে এসেছেন। আজ দুপুরে আমি প্রতাপগড়ে গিয়ে ট্রাংক কল করে এসেছিলুম।
-এবার বুঝলুম। তবে অর্ধেক বুঝিনি। কে টোনাবাবা?
–ভদ্রলোকের নাম দিবাকর মুখুজ্জে। নামকরা উকিল ছিলেন রাঁচি আদালতে। একমাত্র পুত্র ট্রাক দুর্ঘটনায় মারা যাবার পর ক্রমশ মস্তিষ্কবিকৃতি ঘটেছিল। তারপর…বাধা দিয়ে বললুম-ভালুকের চামড়া পেলেন কোথায় উনি?
–তোমাকে আমার বন্ধু মেজর শংকরনাথের কথা বলেছি। তাঁর ছেলে অসীম বিনা লাইসেন্সে কঙ্কগড় জঙ্গলে শিকারে এসে বাড়ি ফেরেনি, তাও বলেছি। কাল সন্ধ্যাবেলা ঝরনার ওখানে হঠাৎ অসীমের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। সে একটা বাঘ না মেরে কিছুতেই বাড়ি ফিরবে না। কোন পাহাড়ি গুহায় সে লুকিয়ে আছে বলল।
যাই হোক, কথায়-কথায় অসীম বলল, সে একটা প্রকাণ্ড ভালুক মেরে চামড়া ছাড়িয়ে নুন মাখিয়ে শুকোতে দিয়েছিল। সেই চামড়াটা হারিয়ে গেছে। তা এই শুনেই আমার কেমন সন্দেহ হল। তারপর অসীমের কাছেই শুনলুম, ভাঙা দুর্গে বেড়াল কাঁধে নিয়ে একটা লোককে বেড়াতে দেখেছে। লোকটা গুনগুন করে গানও গাইছিল। গানটা শোনো।
বলে কর্নেল সুর ধরে গাইতে লাগলেন :
টানা বাবা টানা, ভূতানিকে টানা
টানা বাবা টানা, টান টোন টানা…
বললুম-এ আবার কিসের গান?
কর্নেল বললেন–১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে যাত্রা নামে একজন ওরাওঁ টানা ভগত নামে এক আন্দোলন শুরু করেন। এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল ওরাওঁ জাতির কুসংস্কার দূর করা। অথচ আশ্চর্য, সেই টানা ভগতআন্দোলন শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়ে যায়। টোনাবাবা নামে এক ভূতের সৃষ্টি হয়। কুসংস্কারের শক্তি এমনি! এক ভূত তাড়ালে আরেক ভূত এসে জোটে। যাই হোক, সম্ভবত কাঠুরেরা ওই গান শুনেই ভেবেছিল জঙ্গলে টোনাবাবার আবির্ভাব ঘটেছে। দিবাকরবাবুও সুযোগ বুঝে নিজেকে টোনাবাবা করে তুলেছিলেন।
এসব শোনার পর কঙ্কগড়ের রহস্য আমার কাছে মুছে গেল। তাই বললুম–আর কী হবে এখানে থেকে? যেখানে রহস্য নেই, সেখানে তো আপনারও মন বসে না।
কর্নেল হাসলেন-রহস্য নেই কে বলল! জঙ্গল, পাহাড়, দুর্গের ধ্বংসাবশেষ–এ সবে রহস্যের শেষ নেই। এক রহস্যের পর্দা তুলে দেখি সামনে আরেক রহস্যের পর্দা দাঁড় করানো। তুমি জানো, আমি ওই ঝরনার ধারে একটা শিলালিপি আবিষ্কার করেছি। আমার ধারণা ওই দুর্গে খুঁজলে অনেক বিস্মৃত ইতিহাস উদ্ধার করা সম্ভব হবে। ডার্লিং! আগামী প্রত্যুষে আমরা দুর্গে অভিযান করব।
আঁতকে উঠে বললুম-রক্ষে করুন! শঙ্খচূড় সাপের কথা ভেবে এখনও বুক কাঁপছে।
কর্নেল আমার একটা হাত নিয়ে সস্নেহে বললেন-বৎস জয়ন্ত, কঙ্কগড়ের ওই আতঙ্ক আছে বলেই আমাদের অভিযান রীতিমতো অ্যাডভেঞ্চার হয়ে উঠবে। চলো, শুয়ে পড়া যাক। সকাল-সকাল উঠতে হবে। …
২.১০ তিতলিপুরের জঙ্গলে
০১.
সময়টা ছিল ডিসেম্বরের মাঝামাঝি। কর্নেল কোন সূত্রে খবর পেয়েছিলেন, তা জানি না। দোমোহানি নামে কোন অজ পাড়াগাঁ এলাকার জলাধারে নাকি একঝক নীল সারস এসেছে। কর্নেলের মতে, এই সারস নাকি অতিশয় দুর্লভ প্রজাতির। অতএব তাকে আমার ফিয়াট গাড়িতে চাপিয়ে দোয়োহানি যাচ্ছিলাম।
চৌত্রিশ নম্বর জাতীয় সড়কে পঞ্চাশ কিলোমিটার এগিয়ে একটা ছোট্ট বাজারে পৌঁছে কর্নেলের নির্দেশে গাড়ি দাঁড় করিয়েছিলাম। সেখানে একটা চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে মাটির ভাঁড়ে দুজনে চা খেলাম। কর্নেল চা পছন্দ করেন না। তিনি কফি খান, আমার হিসেবে ঘণ্টায় কমপক্ষে দু-বার। কিন্তু সেখানে কফি পাওয়া যায় না।
চায়ের দাম মিটিয়ে কর্নেল চাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলেন –তিতলিপুর আর কতদূরে?
চাওয়ালা একগাল হেসে বলল–স্যার! এটাই তো তিতলিপুর।
–এখান থেকেই তো দোমোহানি যাওয়া যায়?
–আজ্ঞে স্যার। চাওয়ালা আঙুল তুলে অদূরে একটা বিশাল বটগাছ আর জীর্ণ মন্দির দেখাল। ওই যে দেখছেন কাত্যায়নীতলা। ডাইনে ঘুরে চলে যান। পিচরাস্তা যেন ছাড়বেন না। তা মোটরগাড়িতে ধরুন বিশ-তিরিশ মিনিটে পৌঁছে যাবেন।
আমি কর্নেলের এই অভিযানের লক্ষ্যবস্তু বলতে শুধু জানি দুটো কথা। জলাধার আর নীল সারস। তাই নিছক কৌতূহলে কর্নেলকে এতক্ষণে জিজ্ঞেস করলাম-দোমোহানি গ্রামে বিদ্যুৎ আছে কি?
