–তাহলে ভালুক বলে চাঁচালে ভয় পাবে কেন ডার্লিং?
পাবে এজন্যে যে সে একটা ভূত। মানুষের ভূত শুনেছি জ্যান্ত মানুষকে ভয় পায় অনেক সময়। ভালুকের ভূত জ্যান্ত ভালুকের কথায় ভয় পাবে, এতে অবিশ্বাসের কী আছে!
-হুম! কিন্তু এ লোম ভালুকের–অথচ টোনাবাবা ভালুক নয়, গোরিলা জাতীয় প্রাণী। তুমি তো ওর ফোটো দেখেছে। ভালুক বলে মনে হয়? অবিকল যেন সেই সিনেমায় দেখা কিংকং!
এ রহস্যের মাথামুণ্ডু নেই! অগত্যা আমি ঘুমোবার তালে থালুম। দুপুরে খেয়ে ভাতঘুমের বাঙালি অভ্যেস আমার বরাবর।
সেই ঘুম ভাঙার পর দেখি, ঘরে আমি একা। আলো ধূসর হয়ে গেছে। কঙ্কগড় দুর্গপাহাড়ের আড়ালে সূর্য অস্ত যাচ্ছে। পাহাড়ের মাথা লাল হয়ে গেছে। বাংলোর লনে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে বৃদ্ধ সঙ্গীটির কথা ভাবলুম। নিশ্চয় কোথাও সেই বিদঘুটে ক্যামেরার ফাঁদ পাততে গেছেন। এ বয়সে অমন সাহসের বাড়াবাড়ি না দেখালেই পারতেন!
চৌকিদারকে ডেকে একটা চেয়ার আনতে বললুম। চায়েরও ফরমাশ দিলুম। একটু পরে চেয়ারে বসে চা খেতে-খেতে চমকে দেখি, সেই মহারাজ অর্থাৎ কালো বিড়ালটা চৌকিদারের ঘরের বারান্দায় পা টিপে টিপে উঠছে। বারান্দায় একটা দোলনা টাঙানো। তাতে চৌকিদারের বাচ্চাটা ঘুমোচ্ছ। মহারাজ করল কী, একলাফে দোলনায় উঠে পড়ল। অমনি বাচ্চাটা বেজায় চ্যাঁচামেচি করে কান্নাকাটি জুড়ে দিল। চৌকিদারের বউ রান্নাঘর থেকে দৌড়ে এল খুন্তি হাতে। চৌকিদারও দৌড়ে গেল।
তারপর যা দেখলুম, কয়েক মুহূর্তের জন্যে আমার বুদ্ধিশুদ্ধি ঘুলিয়ে গেল।
ঘরের পেছনদিক থেকে দুলতে দুলতে মূর্তিমান কিংকং বেরুল যেন! হ্যাঁ, এই সেই টোনাবাবা তাতে কোনও ভুল নেই। সে দু-ঠ্যাঙে হেঁটে বারান্দায় পা দিতেই চৌকিদার ভিরমি খেয়ে গোঁ গোঁ করে পড়ে গেল। তার বউ দুর্বোধ্যভাষায় চিৎকার করে উঠেছিল। কিন্তু তার মায়ের মন। প্রথমেই সে বাচ্চাটাকে তুলে নিয়ে ঘরে ঢুকে দরজা আটকে দিয়েছে। কালো বেড়ালটা দোলনার কিনারায় আরামে বসে দুলছে। আর টোনাবাবা দরজায় ঘুষি মারছে দমাদম।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে এসব ঘটে গেল। তারপর আমার সংবিৎ ফিরে এল। কিন্তু রাইফেলের। জন্যে দৌড়ে বাংলোয় ঢুকতে গেলে যদি টোনাবাবা আক্রমণ করে? আমি অসহায় হয়ে পড়লুম কয়েক মুহূর্তের জন্যে। তারপর হঠাৎ মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল–ভালুক! ভালুক!
অমনি টোনাবাবা থমকে দাঁড়াল। আমি আরও বাজখাই গলায় চেঁচিয়ে উঠলুম–ভালুক! ভালুক!
টোনাবাবা দুলতে দুলতে নামল বারান্দা থেকে। তারপর যেই ঘরের পিছন দিকে জঙ্গলে ঢুকতে গেছে, হঠাৎ কোত্থেকে তার সামনে আবির্ভূত হলেন স্বয়ং কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। টোনাবাবা তাকে যেন ঘুষি মারবার জন্যে মুঠো তুলল। আমি আঁতকে চোখ বন্ধ করলুম।
তারপর শুনলুম কর্নেল হাসতে হাসতে বলছেন–গুড ইভনিং টোনাবাবা! গুড ইভনিং!
টোনাবাবা থেমে গেছে।
কর্নেল বললেন–হাঁ করে কী দেখছেন মশাই! আসুন, চা খাওয়া যাক। তারপর অন্য কথা।
টোনাবাবা চুপ। দোলনা থেকে বেড়ালটা দৌড়ে গিয়ে তার কাঁধে চাপল।
এবার কর্নেল খপ করে তার একটা হাত ধরে ফেললেন। টোনাবাবা ছাড়াবার চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। আমি কি স্বপ্ন দেখছি? কর্নেলের গায়ে এমন দানবের জোর আছে কখনও দেখিনি। এমন একটা কিংকংকে হিড়হিড় করে টেনে আনছেন!
লনের মাঝামাঝি এসে টোনাবাবা মানুষের ভাষায় এবং খাঁটি বাংলায় বলে উঠল-আঃ! ছাড়ুন মশাই! এ হাতের হাড় ভাঙা যে! হারামজাদা ভালুক আমার ডানহাতটা অকেজো করে দিয়েছে ছেলেবেলায়।
কর্নেল বললেন-জয়ন্ত, চৌকিদারের জ্ঞান ফেরাও। ওর বউকে বেরুতে বলো। আমাদের অতিথির জন্যে চা-ফা দরকার। তাছাড়া রাতেও ইনি আমাদের সঙ্গে থাকবেন। বলে দিয়ো।
যেতে যেতে ঘুরে দেখি, টোনাবাবা আমার খালি চেয়ারটাতে বসে পড়ল। …
ভালুকের চামড়া খুলে রেখে টোনাবাবা আমাদের সঙ্গে পরম আনন্দে চায়ে চুমুক দিতে দিতে বললেন–আহা, কতকাল পরে এমন সুস্বাদু চা খাচ্ছি। তবে শুনুন মশাই, আমি কিন্তু স্রেফ নিরিমিষ খাই। চৌকিদারকে বলে দেবেন। তবে আমার মহারাজের জন্যে বিশেষ ভাবতে হবে না। একবাটি দুধ হলেই চলবে। বেচারা বহুকাল দুধ খেতে পায় না। সেই লোভেই তো ও বাচ্চাদের বিছানায় গিয়ে দুধের শিশি হাতড়ায়। বাচ্চাগুলো এমন হিংসুটে! চ্যাঁচামেচি করে হইচই বাধায়।
কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন–মহারাজ না হয় দুধ চুরি করতে হানা দেয়, আপনি কী চুরি করতে চান টোনাবাবা?
টোনাবাবা লাজুক হেসে বললেন-আমি বাচ্চাদের খুব ভালোবাসি। একটু আদর করতে সাধ যায়। কিন্তু আমার এমনি কপাল! আজ অবধি একটা বাচ্চাও হাতাতে পারলুম না। যেমনি চুপি চুপি হানা দিই, আমার মহারাজ হারামজাদা ঘুম ভাঙিয়ে দেয় ওদের। তারপর লোকেরা ভালুক ভালুক বলে ভয় দেখায়। আমার মশাই ওই একটা আতঙ্ক। ছেলেবেলায় সেই যে ভালুকের পাল্লায় পড়েছিলুম, উঃ! সে আতঙ্ক আর কাটল না বুড়ো বয়সেও।
–হুম। কিন্তু বাচ্চা চুরি করার ইচ্ছে কেন আপনার?
টোনাবাবা খিকখিক করে হাসলেন। চোখ নাচিয়ে বললেন–পুষব। মহারাজকে যেমন পুষেছি, তেমনি পুষব, তত দিনদুপুরে বাচ্চা চুরি করা কি সহজ কাজ! লোকেরা বেদম ঠ্যাঙানি দেবে যে! তাই টোনাবাবা সেজে রাতবিরেতে হানা দিই! হি হি হি হি!
