পাহাড়ের এদিকটা ঢালু। কাজেই তত বেশি কষ্ট করতে হল না। কিন্তু শেষ পঁচিশ ফুট একেবারে খাড়া দেয়াল। সমস্যায় পড়া গেল দেখছি। বেড়ালটা তখন কোন পথে উঠেছিল, চিনতে পারছি না আমরা।
কর্নেল বললেন–এক কাজ করা যাক। পাঁচিলের ধারে-ধারে এগিয়ে ঝরনার মাথার দিকে যাই, এসো। কাল সন্ধ্যার একটু আগে দেখে গেছি ওদিকটা। পাঁচিলটা ওদিকে ভেঙে গেছে। নিশ্চয় ওঠার রাস্তা পেয়ে যাব।
পাঁচিলের নিচে পা ফেলার জায়গা খুব সামান্যই। অতি কষ্টে এবং সাবধানে এগোতে হল। কিছুক্ষণ পরে আমরা ঝরনার মাথায় গিয়ে পৌঁছোলুম। এখানে একটা চওড়া চত্বর থেকে প্রস্রবণ জলপ্রপাতের মতো পাঁচশো ফুট নিচে সশব্দে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। জলের গর্জনে কান পাতা দায়!
হঠাৎ কর্নেল থমকে দাঁড়ালেন। তারপর ফিশফিশ করে বললেন–সাপ! নোড়ো না।
দেখেই আঁতকে উঠলুম। মাত্র পনেরো-কুড়ি ফুট দূরে একটা পাথরের খাঁজে লম্বা হয়ে বিশাল একটা সাপ মনের সুখে জল খাচ্ছে। তার জিভটা লকলক করছে। সাপটা যে শঙ্খচূড়, তাতে ভুল নেই।
একটু পরে সাপটা ঘুরে পাথর বেয়ে উঠতে থাকল।
তারপর হঠাৎ বিকট হিসহিস শব্দ করে মাথা তুলল। তার প্রকাণ্ড ফণা অন্তত পাঁচ ফুট খাড়া হয়ে রইল। কর্নেল ফিশফিশ করে বললেন-কিছু দেখেছে সাপটা!
কী দেখেছে, সেটা আমাদেরও চোখে পড়ল। সেই কালো বেড়ালটা! একটা পাথরের ফাটল থেকে রুক্ষ একটা গাছ মাথা তুলেছে। মনে হল গাছে পাখির বাসা আছে। বেড়ালটা নিশ্চয় ছানাগুলো চুরি করে খেতে এসেছে। সাপটার গর্জন শুনেই সে থমকে গেছে এবং জুলজুলে চোখে তাকিয়ে আছে। দাঁতগুলো বেরিয়ে পড়েছে তার।
সাপের সঙ্গে বেজির লড়াই দেখেছি। কিন্তু বেড়ালের সঙ্গে সাপের লড়াই কল্পনা করে দম আটকে এল উত্তেজনায়। আমি রাইফেল বাগিয়ে ধরলুম। হতচ্ছাড়া শঙ্খচূড় যদি বেড়ালটাকে মেরে ফেলে আমার কষ্ট হবে। অমন শিক্ষিত বেড়াল সচরাচর দেখা যায় না!
শঙ্খচূড় কয়েকফুট এগিয়ে হিস করে ফণা ঝাড়ল। আর বেড়ালটা এক লাফে পিছিয়ে গিয়ে গররর গ্যাঁও করে উঠল। মনে হল, বেড়ালটা খুব ফিচেল। সাপটার সঙ্গে সে তামাশা করছে। সাপটা এইতে বেজায় রেগে গেল। সে ফের চক্কর তুলে লাফ দেবার ভঙ্গিতে আরও কয়েক ফুট এগিয়ে গেল। তার চক্করটা এখন প্রায় ফুট পাঁচেক উঁচু। এপাশ-ওপাশে দুলছে। বেয়াদব প্রাণীটাকে চরম দণ্ড দেবার জন্যে সে যেন অস্থির! রাগে অপমানে ক্রমাগত ফুঁসছে।
কিন্তু ব্যাপারটা আর এগোল না। হঠাৎ ওপারে কোথাও কার গলা শোনা গেল-মহারাজ! মহারাজ! পালিয়ে আয়!
কর্নেল এক ঝটকায় আমাকে টেনে প্রকাণ্ড একটা পাথরের আড়ালে নিয়ে গেলেন। আমরা লুকিয়ে পড়লুম। সেখান থেকে উঁকি মেরে দেখলুম, সেই লোকটা দুর্গের ওপর থেকে ঝুঁকে হাত নেড়ে বেড়ালটাকে ডাকছে। মহারাজ! অ্যাই হতভাগা! মারা পড়বি যে! পালিয়ে আয় বলছি!
বেড়ালটার নাম তাহলে মহারাজ! সে মুখ তুলে লোকটাকে দেখল। তারপর দ্বিধার সঙ্গে আস্তে আস্তে রণস্থল ত্যাগ করল। তবে যাবার আগে সাপটাকে ধমক দিতে ভুলল না। পাথরের ধাপে লাফ দিতে দিতে ওপরে অদৃশ্য হলে সাপটা ফণা গুটিয়ে চলতে শুরু করল।
কর্নেল লোকটাকে দেখছিলেন। ফিশফিশ করে বললেন–সাবধান জয়ন্ত, নড়ো না। দেখতে পাবে!
মহারাজ লোকটার কাঁধে গিয়ে চড়েছে। সে ওকে আদর করতে করতে সরে গেল ধ্বংসাবশেষের আড়ালে। আমরা উঠলুম।
কর্নেল বললেন–থাক জয়ন্ত। এখন আর ওপরে গিয়ে কাজ নেই। লোকটাকে ভালোভাবে দেখে নিয়েছি। মুখটা চেনা মনে হল! কিন্তু কিছুতেই স্মরণ করতে পারছি না। এসো ফেরা যাক।
বললুম–এমন দুর্গম জায়গায় ও কী করে? ভারি আশ্চর্য তো!
কর্নেল কোনও কথা না বলে আমার হাত ধরে টানলেন। আমরা আগের পথে নামতে শুরু করলুম….
.
০৩.
দুপুরে খাওয়ার পর বিছানায় গড়াচ্ছি। সেই সময় দেখি, কর্নেল টেবিলে একটুকরো কাগজে কীসব রেখে আতশ কাচ দিয়ে দেখছেন। জিজ্ঞেস করলুম-ওগুলো কী?
কর্নেল একটু হেসে জবাব দিলেন–টোনাবাবার নোম।
-তাই বলুন! আসা অবধি দেখছি, মাটির ওপর ঝুঁকে হামাগুড়ি দিয়ে কী খুঁজছেন। তাহলে টোনাবাবার লোম খুঁজতেই হন্যে হচ্ছিলেন কাল থেকে?
-হ্যাঁ ডার্লিং।
–লোম ইজ লোম। আতশ কাচ দিয়ে অত খুঁটিয়ে দেখার কী আছে!
–আছে বৎস। একসময় ট্যাক্সিডার্মি অর্থাৎ চামড়াবিদ্যায় কিছু জ্ঞানগম্যি ছিল। তখন শিকারের নেশা ছিল। তাই শিকার-করা জন্তুর চামড়া কীভাবে অবিকৃত রাখা যায়, তার হদিস পেতে ওই বিদ্যার চর্চা করেছিলুম! দেখা যাক, সেই জ্ঞান কাজে লাগাতে পারি নাকি!
-কী কাজে লাগাতে চান, শুনি?
–প্রথম কথা, এ লোম কোন্ জন্তুর জানতে চাইছিলুম। জানলুম। দ্বিতীয় কথা, এ লোম যে-জন্তুর গা থেকে খসে পড়েছে, সে জীবিত না মৃত, সেটা জানার দরকার ছিল। জেনে গেলুম।
-বাঃ! তাহলে ওই জ্ঞান দুটো আমাকেও বিতরণ করুন। জ্ঞানী হই আপনার মতো।
কর্নেল আমার তামাশায় কিন্তু হাসলেন না। গম্ভীর মুখে বললেন–আশ্চর্য, বড়ো আশ্চর্য জয়ন্ত! এ লোম নিতান্ত ভালুকের। অথচ আমি জানি, টোনাবাবা মোটেও ভালুক নয়। তাছাড়া সে ভালুক ভালুক বলে চাঁচালে ভয় পেয়ে পালায়। আর তার চেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার এ লোম মরা ভালুকের।
হতভম্ব হয়ে বললুম–ওরে বাবা! তাহলে কি ওটা একটা ভালুকের প্রেতাত্মা?
