এখানে ঝরনার ধার থেকে ধাপেধাপে পাথরের সিঁড়ির মতো যে ন্যাড়া টিলাটা আকাশে মাথা তুলেছে, সেখান দিয়ে উঠলে জিনিসটা কুড়িয়ে আনা যায়। কিন্তু টোনাবাবার ভয়ে আমার এক পা বাড়ানোর সাহস নেই। মুখে তো একথা স্বীকার করা যায় না! বললুম-কর্নেল! মনে হচ্ছে একটা কিছু পড়ে আছে ওখানে। চলুন না, দেখে আসা যাক কী ওটা।
কর্নেল তখন হাঁটু দুমড়ে বসে মাটি থেকে কী খুঁটিয়ে হাতের চেটোয় তুলে রাখছেন। মুখ না ঘুরিয়ে বললেন-তুমিই দেখে এসো।
আমি দ্বিধায় পড়ে গেলুম-কালো চৌকো মতো জিনিসটা পাথর হতেও পারে। কর্নেল অমনি মুচকি হেসে বললেন–ভয় নেই জয়ন্ত, টোনাবাবার আবির্ভাব দিনের বেলা হয় না। তুমি স্বচ্ছন্দে যেতে পারো।
রাগ দেখিয়ে বললুম–আমি ভিতু নই, তার প্রমাণ কতবার পেয়েছেন।
–বিলক্ষণ পেয়েছি। তাই তো বলছি ডার্লিং, কালো মতো যে জিনিসটা দেখেছ, নিয়ে এসো।
বলে কর্নেল নিজের কাজে মন দিলেন। আমি রাইফেল বাগিয়ে পা বাড়ালাম। কয়েকটা ঝোপ ঠেলে এগিয়ে ন্যাড়া টিলার পাথুরে ধাপে যেই উঠতে শুরু করেছি, হঠাৎ ওপর দিকে খুট করে একটা শব্দ হল। চমকে উঠে মুখ তুলে যা দেখলুম, আমার তাজ্জব লাগল কয়েক মুহূর্তের জন্যে। তারপর চেঁচিয়ে উঠলুম-কর্নেল! কর্নেল!
কর্নেল সাড়া দিলেন–কী হল জয়ন্ত?
-বেড়াল! একটা বেড়াল!
–বেড়াল দেখে চ্যাঁচামেচির কী আছে ডার্লিং? বেড়াল বাঘের মাসি হলেও অতি নিরীহ প্রাণী।
–আহা, বেড়ালটা সেই কালো জিনিসটা নিয়ে পালাচ্ছে। দেখুন, দেখুন!
–তাড়া করা জয়ন্ত, তাড়া করো।
পাথরের ধাপ বেয়ে যত জোরে পারি উঠতে শুরু করলুম। কালো রঙের বেড়ালটা কিন্তু আস্তে সুস্থে পাথরের ওপর বা রেখে ওপর দিকে উঠছে। আমার দিকে ঘুরে যেন একবার বাঁকা হাসলও। তার মুখে অবশ্য সেই কালো জিনিসটা রয়েছে। তাই হয়তো পুরো হাসি হাসতে পারল না।
এই বনজঙ্গলে বনবেড়াল থাকতে পারে। কিন্তু এ বেড়াল সে বেড়াল নয়! আমি বেড়াল চিনি। আমার মাসিমার ছেলেপুলে ছিল না। এক দঙ্গল বেড়াল নিয়ে জীবন কাটাতেন। সত্যি বলতে কী, সেই মাসির বাড়ি থেকেই আমি লেখাপড়া শিখেছি। বড়ো হয়েছি। কাজেই বেড়ালের খবর আমার নখদর্পণে। কালো জিনিসটা নিয়ে যে বেড়ালটা গদাইলশকরি চালে পাহাড়ে চড়ছে, সে যে গৃহপালিত বেড়াল তাতে কোনও ভুল নেই।
ন্যাড়া টিলার চুড়োয় উঠে বেড়ালটা অদৃশ্য হল। টিলাটা বড়োজোর একশো ফুট উঁচু। হাঁপাতে হাঁপাতে সেখানে পৌঁছে দেখি বেড়ালটা ওপাশে নেমে যাচ্ছে। তখন মরিয়া হয়ে ভাবলুম, গুলি ছুঁড়ে ওকে ভয় দেখালে নিশ্চয় জিনিসটা মুখ থেকে ফেলে দেবে।
কিন্তু আমার বরাত, বেড়ালটাকে আর দেখা গেল না। আমারই বুদ্ধির ভুল! তখনই যদি গুলি ঘুড়তুম, নিশ্চয় কাজ হত।
নিচের দিকে ঝোপজঙ্গল তো আছেই, অজস্র পাথরও পড়ে আছে ধ্বংসাবশেষের মতো। বেড়ালটা খুঁজতে খুঁজতে চোখের ব্যথা হয়ে গেল। তারপর এতক্ষণে ঠাহর করলুম, যা ঘটেছে ভারী বিস্ময়কর! ওই কালো চৌকো জিনিসটা কী হতে পারে! আর এই দুর্গম জঙ্গলে একটা কালো বেড়ালই বা তা মুখে করে নিয়ে গেল কেন?
জিনিসটা যে প্রাণীর খাদ্য নয়, তা আমি হলফ করে বলতে পারি।
নিচের জঙ্গলটা একটা ছোট্ট উপত্যকা। তার ওধারে সেই ঐতিহাসিক কঙ্কগড় দুর্গ পাহাড়। সেদিকে তাকিয়ে আমার ফের চমক লাগল।
দুর্গের ওখানে একটা লোক চুপচাপ বসে আছে। শঙ্খচূড় সাপের ভয় তুচ্ছ করে ওখানে কেউ গিয়ে বসে আছে, কল্পনাও করা যায় না। কিন্তু তারপর আরও যা দেখলুম, আমার বুদ্ধিশুদ্ধি ঘুলিয়ে গেল।
সেই কালো বেড়ালটা দুর্গ-পাহাড়ে উঠেছে ইতিমধ্যে এবং সেই লোকটার কাছে পৌঁছেছে। আর লোকটা তার মুখ থেকে কালো জিনিসটা নিয়ে তাকে আদর করছে।
আমি চাপা গলায় ডাকতে থাকলুম-কর্নেল! কর্নেল! শিগগির আসুন!
সাড়া এল আমার পিছন থেকে দেখতে পাচ্ছি, জয়ন্ত।
ঘুরে দেখি, বুড়ো ঘুঘুমশাই কখন চুপিচুপি ঝরনার ধার থেকে উঠে এসেছেন এবং একটা পাথরে ঠেস দিয়ে বসে চোখে বাইনোকুলার রেখে কঙ্কগড় দুর্গের ওই বিচিত্র দৃশ্য মন দিয়ে উপভোগ করছেন।
কাছে গিয়ে বললুম-এ তো ভারি তাজ্জব ব্যাপার!
কর্নেল বাইনোকুলার নামিয়ে রেখে বললেন, তাজ্জব তাতে সন্দেহ কী! লোকটা আমাদের দেখতে পেয়েই আড়ালে লুকিয়ে গেল। জয়ন্ত, আমারই বুদ্ধির ভুল। ওই কালো বেড়ালটার কথা আমিও শুনেছিলুম। কঙ্কগড় জঙ্গলে অনেকেই নাকি ওকে দেখেছে। কিন্তু তাতে অবাক হবার কিছু ছিল না। অনেক সময় গৃহপালিত প্রাণী জঙ্গলে এসে বুনো হয়ে স্থায়ী ডেরা গাড়তে পারে সেখানে। অথচ যা দেখলুম, তাতে মনে হল-বেড়ালটা দস্তুরমতো ট্রেন্ড এবং তার মালিকও রয়েছে।
-কালো চৌকো জিনিসটা কী হতে পারে অনুমান করতে পারছেন কর্নেল?
–অনুমান হয়। বাইনোকুলারে জিনিসটা দেখলুম, জয়ন্ত। ওটা একটা নোটবই ছাড়া কিছু নয়।
–বলেন কী!
-তোমার কথার গুরুত্ব না দিয়ে ভুল করেছি ডার্লিং! যাই হোক, এখন আর পস্তিয়ে লাভ নেই। চলো, আমরা ওই দুর্গ হানা দিই। মনে হচ্ছে, ওই রহস্যময় লোকটা যেভাবেই হোক এখানে একটা নোটবই ফেলে গিয়েছিল কখন! পোষা বেড়ালকে সেটা খুঁজতে পাঠিয়েছিল।
কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। দুজনে নিচের উপত্যকায় নামতে থাকলুম।
খুব সাবধানে আমরা এগোচ্ছিলুম। কখনও ঝোপের আড়ালে কখনও পাথরের পাশ দিয়ে গুঁড়ি মেরে কতক্ষণ পরে কঙ্কগড় দুর্গ-পাহাড়ের ধারে পৌঁছেলুম। তারপর পাহাড়ে চড়া শুরু হল।
