সেই রাতেই কর্নেলের চিঠি নিয়ে থানায় যোগাযোগ করলুম। তারপর রাতটা বাংলোয় কাটিয়ে পরদিন সকালে ক্যাম্পে পৌঁছলুম। পুলিশ আসবে কথামতো দুপুরের মধ্যেই।
কিন্তু তখনও রহস্যের চাবিকাঠি কর্নেলের হাতে। এই ওঁর অভ্যাস।
কর্নেল কিছুক্ষণের জন্যে একবার একা জঙ্গলে ঘুরে এলেন। বিরল জাতের পাখি দেখতেই বেরিয়েছিলেন। আমি আগরওয়ালদের নানা কথায় ভুলিয়ে রাখলুম। তারপরে সবে লাঞ্চ সেরে কর্নেল ও আমি তাঁবুতে গড়াচ্ছি—পুলিশের জিপের আওয়াজ কখন শোনা যাবে সেই প্রতীক্ষা করছি—হঠাৎ আগরওয়ালের তাবু থেকে চাপা ধস্তাধস্তির শব্দ কানে এল। কর্নেল অমনি লাফিয়ে উঠে বললেন-কুইক জয়ন্ত! রিভলভার লোড করে নাও। চলে এস। দেখলুম উনিও রিভলভার হতে নিলেন! দুজনে দৌড়ে আগরওয়ালের তাঁবুতে গেলুম। কর্নেল পদা তুলেই গর্জে উঠলেন—মিঃ আগরওয়াল, দাঁড়ান!
উঁকি মেরে একপলকেই দেখলুম দৃশ্যটা। দুটো ক্যাম্প খাটের মাঝে মেঝেয় জাল হংসধ্বজকে ফেলে তার বুকে বসে আছেন আগরওয়াল। দুহাতে গলা টিপে ধরেছেন।
আগরওয়াল তখুনি উঠে কাঠ হয়ে দাঁড়লেন। কর্নেল বললেন—কাজে নেমে ঝগড়া মারামারি কাজের কথা নয় মিঃ আগরওয়াল। বখরা নিয়ে এসব ক্ষেত্রে খুনোখুনি হয়েই থাকে। তবে খুন করে ইয়েতির ঘাড়ে চাপানোের আর উপায় নেই মশাই!
আগরওয়াল ঘোঁত ঘোঁত করে বললেন—কী বলছেন, বুঝতে পারছি না।
–নিশ্চয় পারছেন। বিশেষ করে যখন সত্যি সত্যি ইয়েতির আবির্ভাব ঘটেছে। তখন সবাই টের পেয়ে গেছেন বই কি। নিশ্চয় আঁচ করেছেন, এই ইয়েতিটা আসলে কে!…কর্নেল একটু হাসলেন।—অবশ্য, আপনি যখন আমার কাছে ইয়েতির খবর নিয়ে যান, তখন একটুও ভাবেননি যে ওই ইয়েতিটা আপনার পার্টনার ও আজীবন বন্ধু হতভাগ্য হংসধ্বজ সান্যাল। তখন সত্যিকার ইয়েতির আতঙ্কেই আমার সাহায্য চেয়েছিলেন। কিন্তু এবার যখন কথায় কথায় আমি এই জাল হংসধ্বজের কাছে জেনে নিলুম যে ইয়েতির গায়ের চামড়া খসখসে শক্ত এবং ভঁজবহুল—কতকটা প্লাস্টারের মতো, তখনই আপনি সন্দেহ করতে শুরু করেন। তারপর ওই গুহার দরজায় গতকাল সকালে আমার সঙ্গে গিয়ে ঠিক আমারই মতো এমন কিছু চিহ্ন আপনার চোখে পড়েছিল, যাতে ইয়েতিটা যে কে চিনতে আপনার দেরি হয়নি। তাই তাকে পুড়িয়ে মারতে ব্যবস্থা করলেন। সবই ঠিক ছিল। বাদ সাধলুম আমি। গুহার পেছন দিকটায় আমি থাকতে চাইলুম। তাতে আপত্তির কারণ ছিল না। কারণ ইয়েতি বেরোলে নাতানুক সর্দাররা ঝোঁকের বশে তাকে মেরেই ফেলত। আপনি কৌশলে ইয়েতির লাশটা নিশ্চয় আমার অগোচরে নষ্ট করার ব্যবস্থা করতেন। কিংবা একটা গল্প রটাতেন। যাই হক, এবার আপনি দ্বিতীয় খুনের উদ্যোগে ব্যস্ত ছিলেন। কারণ, এই জাল হংসধ্বজ সব টের পেয়ে আপনাকে ব্ল্যাকমেল শুরু করেছিলেন। গত রাতে সুবিধে হয়নি—কারণ জয়ন্ত ছিল না বলে আমি জাল হংসধ্বজকে শুতে ডাকলুম। তাই মরিয়া হয়ে আজ কাজে নেমেছিলেন।
জাল হংসধ্বজ উঠে বসেছিল। হাঁফাতে হাঁফাতে বলল—সবে ঘুম এসেছে। হঠাৎ দেখি ব্যাটা আমার বুকে চেপে গলা টিপে ধরেছে। উঃ! আগে যদি জানতুম ওর মতলবটা কী!
কর্নেল বললেন—হ্যাঁ। ওর তর সইছিল না। স্পষ্ট বোঝা যায়, এরপর আগরওয়াল চাদর মুড়ি দিয়ে লাশ ঢেকে রাখতেন। আমাদের বলতেন— সান্যাল অসুস্থ, বিশ্রাম নিচ্ছেন। তারপর রাতে হইচই করে রটাতেন যে ইয়েতিটা এসেছিল! সেই গলা টিপে মেরে গেছে। বাঃ! চমক্কার সুযোগ! কারণ, গুহায় তখন ইয়েতিটা মারা পড়েনি। অতএব কি না প্রতিশোধ নিয়ে গেছে। অপূর্ব, মিঃ আগরওয়াল!
পুলিশের জিপের আওয়াজ শোনা গেল এতক্ষণে!….
আমরা মদিয়ার ডাকবাংলোয় রাত কাটাচ্ছিলুম। কলকাতা ফিরে আসছি। অরুণাচলের ইয়েতি নিয়ে ভাবছি, কর্নেল বললেন—বৎস জয়ন্ত কি হতাশায় ভুগছ?
—অবশ্যই! ইয়েতি যে গুল, সাতকাহন লেখার মানে হয় না।
—কিন্তু তার বদলে সীমান্তে গুপ্তচর চক্ৰ উচ্ছেদের কী চমৎকার একটা খবর তোমরা এবার ছাপাবার সুযোগ পেলে দেখ!
অবাক হয়ে বললুম-গুপ্তচর চক্র! তার মানে? কোথায় গুপ্তচর?
কর্নেল দাড়ি চুলকে বললেন—ও, আই অ্যাম সরি। তোমাকে মূল ব্যাপারটা তো বলাই হয়নি।
—কিছু বলা হয়নি। কেনই বা জাল হংসধ্বজ—কেন এসব ঘটল…
—এক মিনিট। বলছি সব। বলে কর্নেল চুরুট ধরালেন। আরামে হাত পা ছড়িয়ে বসলেন। তারপর বলতে শুরু করলেন : হংসধ্বজ সান্যাল লোকটি সৎ-কিন্তু নির্বোধ। তাছাড়া তাঁর মাথায় কিঞ্চিৎ পাগলামিও আছে। নানান অদ্ভুত কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে দ্বিধাও করেন না। দুর্গম এলাকায় খনি খোঁজা তাঁর বাতিক। নেফা এলাকায় তিনি সেই উদ্দেশ্যেই যাতায়াত করতেন। আর তাঁর বন্ধু। হরিহর আগরওয়াল তার উল্টো—অসম্ভব ধূর্ত। যেভাবে হোক, এই এলাকায় এসে আগরওয়াল হংসধ্বজের অগোচরে এক বিদেশি রাষ্ট্র ও বৈরী নাগাদের যোগাযোগের মূল মাধ্যম হয়ে ওঠে। হংসধ্বজ আগে জানলে তাকে বাধা দিতেন। জানলেন সীসের খনি খুঁজতে এসে যখন ক্যাম্প করা হল, তখন। বিস্ময়ে দুঃখে হতচকিত হলেন হংসধ্বজ। বোঝানোর চেষ্টা করলেন বন্ধুকে। কিন্তু তখন আর আগরওয়ালেরও ফেরার পথ নেই। বৈরী নাগাদের যে গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ, তখন উল্টো গাইলে তারা তাকে মেরে ফেলবে—আবার হংসধ্বজকেও খুন করবে।
এদিকে হংসধ্বজ তাঁকে শাসাচ্ছেন-নাগাদের সঙ্গে আর এতটুকু যোগাযোগ রাখলে পুলিশকে জানাতে বাধ্য হবেন। অবশ্য সেটা নিছক হুমকি। এই সীসের খনি আর বন্ধুত্ব দুই-ই হংসধ্বজের কাছে মূল্যবান। আগরওয়াল দেখলেন, যেদিকে পা বাড়াবেন, সেদিকেই বিপদ। যদি চিরদিনের নির্বোধ ও ছিটগ্রস্ত এই বন্ধুটি সত্যি সত্যি ঝোঁকের বশে টহলদার পুলিশ বা সেনাবাহিনীর কানে কথাটা তুলে দেন, সাংঘাতিক কাণ্ড হবে। শেষ অবধি আগরওয়ালের মাথায় খুন চড়ে গেল। ক্যাম্পে তখনও সার্ভেয়াররা পৌঁছায়নি। কেবল একদল কুলি জোগাড় করা হয়েছে। তারা স্থানীয় লোক। এসে হাজিরা দিয়েই নিজেদের গাঁয়ে ফিরে যায়। একরাতে আগরওয়াল ঘুমন্ত বন্ধুর বুকে বসে গলা টিপে ধরলেন। যখন দেহটা নেতিয়ে পড়ল, চুপিচুপি সেটা নিয়ে গিয়ে পাহাড় থেকে গড়িয়ে ফেলে দিলেন। রান্না ও অন্যান্য কাজের লোক জনা পাঁচ ছিল। তারা কেউ টের পেল না। সকালে রটিয়ে দিলেন, হংসধ্বজ রাতে মদিয়া গেছেন। ফিরতে দু একদিন দেরি হবে। ওদিকে একটা পাহাড়ের খাদে যেখানে দেহটা ফেলেছেন, তার নিচেই নদী। নদীতে গভীর বালি আছে। আশ্চর্য শক্ত প্রাণ হংসধ্বজের! পরদিন একদল উপজাতীয় শিকারি তাকে মুমূর্ষ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে তুলে নিয়ে যায় নিজেদের গাঁয়ে। সেবাশুশ্রুষা করে। তারপর সাত মাইল দূরে বাংলা মিশনারি হাসপাতালে রেখে আসে। এ ঘটনা ২০শে মে ঘটেছিল। ২৩শে মে ক্যাম্পে সার্ভেয়াররা আসে। কাজ শুরু হয়। কিন্তু রাঁধুনি চাকরবাকর সবাইকে রাতারাতি তখন সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারা এই ভূতুড়ে বন-বাদাড় থেকে পালাতে পারলে বেঁচে যায়। সব ছিল সমতলের বাসিন্দা। নতুন রাঁধুনি ও চাকর-বাকর এনেছে আগরওয়াল। আর এনেছে ওই জাল হংসধ্বজকে। হংসধ্বজের উদ্যোগে এবং তাঁর পার্টপারশিপেই খনির লাইসেন্স, সরকারি লোন ও টেকনিক্যাল সহায়তার ব্যবস্থা। অতএব হংসধ্বজ একজন থাকা চাই পাশে। পরে যখন দরকার বুঝত, তখন সে জালটাকেও খতম করে দিত এবং ইয়েতির নামেই সেটা রটাত। এই জঙ্গলে মানুষ খুন করা এমন কিছু কঠিন নয়। যাই হোক, জাল হংসধ্বজকে নিয়ে নির্বিঘ্নে কাজ চলছিল। ২৫শে মে রাতে হঠাৎ ক্যাম্পে ইয়েতির আবির্ভাব ঘটল। ভয় পেয়ে গেল আগরওয়াল।
