ইয়েতিটা সেও স্বচক্ষে দেখল। একেবারে সত্যিকার আতঙ্ক। সার্ভেয়াররা পালিয়েছে। কুলিরা ভেগে গেছে। তাই সে কলকাতায় গিয়ে আমার শরণাপন্ন হল। কোন এক সূত্রে আমার সঙ্গে তার অল্পস্বল্প চেনা ছিল। আমি ইয়েতিটা ধরতে বা হত্যা করতে পারলে তার সীসের খনি এবং গুপ্তচরচক্র দুটোই বজায় থাকে।
এবার প্রশ্ন করলুম—ইয়েতির প্ল্যান হংসধ্বজবাবুর মাথায় এল কীভাবে?
কর্নেল হেসে উঠলেন। বললেন—মে মাসের মাঝামাঝি এই এলাকায় একজোড়া দশফুট উঁচু মানুষের মতো প্রাণী ধরা পড়ে উপজাতীয়দের হতে। সে খবর তোমরাও বক্স করে ছেপেছিলে। আসলে আমার ধারণা ও দুটো একজাতের ভালুক।
বললুম-হংসধ্বজবাবুর মাথায় তাহলে ওই থেকেই ইয়েতি সেজে প্রতিশোধের বাসনা গজায়?
কর্নেল আরও জোরে হাসলেন—ভদ্রলোক রীতিমতো পাগল। অনায়াসে কোনও সেনাবাহিনীর কাছে বা টহলদার পুলিশকে জানাতে পারতেন। তা না করে শত মাইল দূরের বাংলা মিশনারি হাসপাতাল থেকে সারা গায়ে প্লাস্টার জড়ানো অবস্থায় রাতারাতি উধাও হন। জঙ্গলে এসে সাদা কাপড়ে বাকি অংশও জড়ান। ওই বিকটমূর্তিতে হানা দেন ২৫ মে রাতে। ভাগ্যিস, গুলি ফসকেছিল ওদের। অথচ কাণ্ড দেখ, তবু দমে যাননি ভদ্রলোক। পাগল আর বলে কাকে? অবিবাহিত লোকেরা যত বয়স বাড়ে, তত অদ্ভুত হয়ে ওঠে। তুমি ভাগ্যিস বিয়েটা সেরে নিয়েছ জয়ন্ত।
হেসে বললুম—ওই পাহাড়ের গুহায় থাকতেন হংসধ্বজ। কিন্তু খেতেন কী?
—হ্যাঁ। গুহাটা থাকার উপযোগী। আর খেতেন চুরি করে।
—চুরি করে? সে কী?
—হ্যাঁ। রাতে উপজাতিদের গ্রামে হানা দিতেন চুপি চুপি। ওই বিকটমূর্তি দেখে অমন হিংস্র লোকেরাও গর্তে সেধিয়ে যেত কিনা। কুকুরগুলোও ভয়ে কাঠ হয়ে যেত। গোটা এলাকা জুড়ে এখন ইয়েতির খবর শুনতে পাবে। ভাগ্যিস সভ্য জগতের বাইরে পাহাড় জঙ্গল এলাকা। নয়তো ধুন্ধুমার পড়ে যেত। হাঁ-জয়ন্ত শোন! এই এলাকায় ইয়েতিকে বলে বুরু। মনে রেখো, বুরু। এই উপজাতীয়রা এত সাহসী ও হিংস্র মানুষ, অথচ তারা বুরুর নাম শুনলে কেঁচো হয়ে যায়।
একটু চুপ করে থেকে বললুম-গৌহাটিতে আমাদের জাল হংসধ্বজই রিসিভ করেছিলেন। এতটুকু টের পাইনি কিন্তু।
কর্নেল বললেন—না। আমার কেমন একটু লেগেছিল। গেটে নেমপ্লেটটা যেন সদ্য বসানো হয়েছে। টাটকা চকচকে পালিশ। তাছাড়া বাড়ির চাকরগুলোও মনে হল নতুন এসেছে। মনে একটা খটকা লেগেছিল বইকি। তখন থেকেই আমার তদন্ত শুরু।
—ওর আসল নাম কী?
—চন্দ্রনাথ সিং। পাঞ্জাবি।
লাফিয়ে উঠলুম-বলেন কী! এতটুকু ধরতে পারিনি কথাবার্তায়।
কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন—আমি পেরেছিলুম। তবে যা জাল তা সহজেই যদি জাল বলে ললাকে ধরতে পারে, তাহলে জাল হতে যাবে কোন দুঃখে? এটি খাঁটি জাল। তাই ধরা কঠিন ছিল।
একটু পরে আমি বললুম—আমার রিপোর্টাজের নাম তাহলে হওয়া উচিত ছিল অরুণাচলের বুরু। কর্নেল কোনও জবাব দিলেন না। চোখ বুজে কী ভাবছেন কে জানে।…
১.০৬ ডমরুডিহির ভূত
এক
বিজ্ঞানীরা কৃত্রিম পদ্ধতিতে প্রাণ সৃষ্টির জন্য হন্যে হচ্ছেন। অথচ প্রকৃতিতে কী অনায়াসে সবসময় প্রাণ সৃষ্টি হয়ে চলেছে।-বলে কর্নেল নীলাদ্রি সরকার নিভে যাওয়া চুরুটটি ধরালেন। তারপর সাদা দাড়িতে হাত বুলোতে থাকলেন। এটা ওঁর চিন্তা-ভাবনার লক্ষণ। আর মুখটাও বেশ গম্ভীর।
একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলুম-হঠাৎ প্রাণ নিয়ে মাথাব্যথার কারণ কী জানতে পারি?
–একটুকরো কাঠ জয়ন্ত! ছোট্ট একটুকরো কাঠ!
সোফার শেষপ্রান্তে হেলান দিয়ে বসে প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে কে হালদার—আমাদের প্রিয় হালদারমশাই খবরের কাগজ পড়ছিলেন। তড়াক করে সোজা হয়ে বললেন, কাঠ দিয়া মার্ডার?
কে কারে মারল?
বুঝলুম ডিটেকটিভ ভদ্রলোক প্রাণ এবং একটুকরো কাঠ এই দুটি কথা শুনেই উত্তেজিত হয়ে উঠেছেন। চৌত্রিশ বছর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগে চাকরির পর প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সি খোলা এবং রহস্যের খোঁজে ছোঁকছোঁক করে বেড়ানো তাঁর পক্ষে অবশ্য খুবই স্বাভাবিক। আজ সকালে কর্নেলের ড্রয়িং রুমে তার আবির্ভাব দেখে আশা করেছিলুম নিশ্চয়ই কোনও রহস্যময় কেস হাতে পেয়েছেন এবং শলাপরামর্শের জন্য কর্নেলের সাহায্য নিতে এসেছেন।
কিন্তু প্রায় একঘণ্টা কেটে গেছে এবং ষষ্ঠীচরণের তৈরি স্পেশাল কফি শেষ করে খবরের কাগজে ড়ুবে গেছেন। তত বেশি নস্যিও নেননি। কাজেই বুঝতে পেরেছিলুম, ওঁর হাতে কোনও কেস নেই।
বৃদ্ধ প্রকৃতিবিদ ওঁর কথায় কান না দিয়ে বললেন, আমার ছাদের বাগানে অনেকদিন থেকে ওই কাঠের টুকরোটা পড়ে ছিল। বর্ষা এবং এই শরৎকালের সব বৃষ্টি খেয়ে কালো হয়ে গিয়েছিল। কাল ভোরে গিয়ে দেখি, ওতে কয়েকটা খুদে ছত্রাক গজিয়েছে। আশ্চর্য! আজ গিয়ে দেখলুম, ছত্রাকগুলো ইঞ্চিটাক চওড়া হয়েছে। তারপর হঠাৎ কোথা থেকে একটা প্রজাপতি এসে ছত্রাকে বসে পড়ল। প্রাণ টেনে এনেছে প্রাণকে। সত্যি জয়ন্ত! প্রকৃতিতে এ এক বিস্ময়কর ঘটনা। খুবই রহস্যময়। হালদারমশাই হেসে উঠলেন, -গ্রামাঞ্চলে ওগুলিরে ব্যাঙের ছাতা কয়।
কর্নেল সায় দিয়ে বললেন, —কথাটা লাগসই। কুনো ব্যাঙেরা ঠাণ্ডা সঁতসেঁতে জায়গায় থাকতে ভালবাসে। কারণ বেচারারা গরম সহ্য করতে পারে না। তবে প্রজাপতিরাও ছত্রাক ভালবাসে। ছত্রাক তাদের খাদ্যও বটে।
বললুম, —কিন্তু এই সামান্য ব্যাপার নিয়ে আপনার এত চিন্তার কারণ কী?
