নাতানুক নামে লোকটা প্রৌঢ়। দারুণ শক্ত সমর্থ চেহারা–বেঁটে খাটো, থ্যাবড়া নাক, কুতকুত চোখে হাসি। বুঝলুম ও খুশি হয়েছে। কুলিদের সর্দার সে। সায় দিয়ে একটা ধারালো প্রকাণ্ড দায়ের মুঠো যেভাবে চেপে ধরল, মনে হল ইয়েতির একটা ঠ্যাং সে কাটবেই। আমরা পিছনের দিকে দ্রুত এগোলুম। অবশ্য আমি কর্নেলের মতলব একটুও টের পাচ্ছি না। পাথরের বাধা পেরিয়ে অনেক কষ্টে ওঁকে অনুসরণ করছি। মনে প্রচণ্ড উত্তেজনা। তাহলে সেই কিংবদন্তিখ্যাত রহস্যময় তুষারদানব সত্যি কি স্বচক্ষে দেখার অমূল্য অভিজ্ঞতা অর্জন করতে চলেছি? আমার সঙ্গে ক্যমেরাও আছে। ফিল্ম রেডি। শুধু শাটার টেপার ওয়াস্তা। এই প্রথম দৈনিক সত্যসেবকের পাতায় সত্যিকার ইয়েতির ছবি দেখা যাবে। হে ঈশ্বর, সদয় হও!
কিন্তু কর্নেল থামবার তালে নেই। কোথায় যাচ্ছেন উনি? ফাটলের শেষে একটা ভোলা জায়গায় পড়লুম। অমনি পাহাড়ের অন্যদিক থেকে ভেসে এল তুমুল চিৎকার ও বন্দুকের শব্দ। তারপর ধোঁয়া দেখতে পেলুম। কর্নেল বলে উঠলেন—জয়ন্ত! কুইক, ওই পাথরের আড়ালে চলো।
প্রকাণ্ড পাথরের পিছনে গিয়ে বসলুম দুজনে। চেচামেচির সঙ্গে ঢাকের আওয়াজ ও বন্দুকের শব্দ বাড়তে থাকল। রুদ্ধশ্বাসে মুহূর্ত গুনছি। জানি না ইয়েতিটা কোনদিকে বেরোবে। পাহাড়ের উপর আকাশে মেঘের মতো ধোঁয়া দেখতে পাচ্ছি।
তারপর আমার পাঁজরে খোঁচা দিলেন কর্নেল। তাকিয়েই আমি হতবাক, চোখ নিস্পলক। ক্যামেরার কথা ভুলেই গেলুম। দিন দুপুরের ঝলমলে রোদে এদিকটা ভরে আছে। পাহাড়ের এ-পিঠ সম্পূর্ণ ন্যাড়া। উপরের একটা খাঁজের তলায় দাঁড়িয়ে আছে …
হ্যাঁ, সেই কিংবদন্তিখ্যাত প্রাগৈতিহাসিক তুষার মানব অথবা দানব। সেই রহস্যময় ইয়েতি! বিশাল উঁচু ও চওড়া দেহ। উলঙ্গ। সম্পূর্ণ সাদা। চামড়া যেন ভাঁজবহুল। হাঁ করে তাকিয়ে রইলুম। স্বপ্ন দেখছি না তো? আমাদের মাথার উপর পাথরের চাতালে আন্দাজ কুড়িফুট দূরত্বে প্রাণীটা দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখছে। লাফ দিলেই আমাদের উপর এসে পড়বে।
মাত্র কয়েক সেকেন্ড। তারপর কর্নেল আচমকা হাততালি দিলেন। আর অমনি ইয়েতিটা আমাদের দেখতে পেল। তারপর চাতালের অন্যদিকে সরে গেল। আমি রাইফেল তুললেই কর্নেল বললেন—ক্যামেরা জয়ন্ত, ক্যামেরা!
তখন রাইফেল নামিয়ে ক্যামেরা তুলে পটাপট কয়েকটা ছবি নিলুম। ততক্ষণে ইয়েতি লাফ দিয়েছে। চাতাল আছে ধাপে ধাপে। কয়েকটি লাফে আমাদের পাথরটার আড়ালে যেতেই কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। আমিও উঠলুম। দেখলুম, ইয়েতিটা সমতলে পড়ে দৌড়চ্ছে। একেবারে মানুষের মতো দৌড়চ্ছে। কর্নেল দৌড়তে শুরু করলেন তার পিছনে। আমি একটু ইতস্তত করে তাকে অনুসরণ করলুম। চেঁচিয়ে উঠলুম-সাবধান কর্নেল।
গাছপালার মধ্যে তখন ঢুকে পড়েছে জন্তুটা। কর্নেল কি পাগল? তিনি পিছনে দৌড়চ্ছেন—আমিও বোকার মতো দৌড়চ্ছি। হাঁফাতে হাঁফাতে বললুম, গুলি করুন। কর্নেল, গুলি!
কর্নেল আমাকে বোকা বানিয়ে জোরে হেসে উঠলেন এবং চাপা গলায় ইয়েতিটার উদ্দেশে বললেন—আমরা আপনার বন্ধু মিঃ সান্যাল! প্লিজ, একটু দাঁড়ান। আপনার কোনও ভয় নেই।
আমাদের চারপাশে ঘন জঙ্গল। ছায়া আছে। ইয়েতিটা তক্ষুণি দাঁড়িয়ে গেল। ঘুরে মানুষের কণ্ঠস্বরে বলে উঠল—কে আপনারা?
কর্নেল অকুতোভয়ে এগিয়ে গিয়ে বললেন—আমি প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। ইনি কলকাতার দৈনিক সত্যসেবকের প্রখ্যাত রিপোর্টার জয়ন্ত চৌধুরী। আর জয়ন্ত, ইনিই হলেন আদি ও অকৃত্রিম মিঃ হংসধ্বজ সান্যাল।
আমি আকাশ থেকে পড়লুম। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলুম। কর্নেল বললেন—আপাতত মিঃ সান্যাল, আপনার গায়ের প্লাস্টারগুলো আগে ছাড়িয়ে ফেলা দরকার। আপনার আর ইয়েতি সাজবার কোনও কারণ নেই। আমি সব টের পেয়েছি।
ইয়েতি ক্লান্তস্বরে বললেন—কিন্তু আগরওয়াল আর ওই শয়তান প্রতারকটার কী হবে? ওদের যে আমি শাস্তি দিতে পারলুম না! বরং আমাকেই ওরা পুড়িয়ে মারার ষড়যন্ত্র করল।
কর্নেল হাত তুলে তাকে আশ্বস্ত করে বললেন—সেজন্যে আইন আছে, মিঃ সান্যাল। এসব ব্যাপারে আপনি আমার ওপর নির্ভর করতে পারেন। কিন্তু প্রতিশোধ নিতে আপনি যে অভিনব পন্থা নিয়েছেন, তা মোটেও কাজের নয়; উল্টে আপনিই পুড়ে মরতেন।
এখন চলুন কোনও ঝরনায় গিয়ে সেখানে গায়ের প্লাস্টার খুলে আমরা তিনজনে কোনও উপজাতীয়দের গ্রামে যাব। সেখানে আপনাকে নিরাপদে রেখে আমরা দুজনে ফিরব। কথা দিচ্ছি, আগামিকাল যে কোনও সময় আমরা এসে আপনাকে নিয়ে যাব। ততক্ষণে আপনার পার্টনার আগরওয়াল এবং তার সহকারী জাল হংসধ্বজ সান্যালকে গ্রেফতার করা হয়েছে জানবেন।…
তখন বিকেল হয়েছে।
দাফাং নামে একটা গ্রামের মোড়লের বাড়ি সত্যিকার হংসধ্বজবাবুকে রেখে আমরা ফিরলুম ক্যাম্পে। দেখি, সবাই কখন ফিরেছে। আমাদের দেখে আগরওয়াল ও জাল হংসধ্বজ দৌড়ে এলেন। কর্নেল ক্লান্ত স্বরে বললেন—ইয়েতিটার পিছনে অনেকদূর গিয়েছিলুম। গুলিও করলুম। কিন্তু আমাদের বরাত। পালিয়ে গেল।
কথামতো আমি ইনিয়ে বিনিয়ে সব ব্যাপারটা বানিয়ে শোনালুম। শুনে ওঁরা খুব নিরাশ হলেন। তারপর কর্নেলের পরামর্শমতো আমি কলকাতায় আমার কাগজে খবর পাঠাতে তক্ষুণি মদিয়া যেতে চাইলুম। জিপের ব্যবস্থা হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে। অনেক রাতে সেখানে সরকারি বাংলোর চৌকিদারকে ঘুম থেকে তুলিয়ে নিজের পরিচয় দিলুম। জিপের ড্রাইভারকে বললুম—আপাতত এখানেই রাত কাটাতে চাই। কাল সকালে আমরা ফিরব। সে রাজি হল। রাস্তা দুর্গম—তাতে বৈরী নাগাদের ভয় আছে। রাতে ফেরা নিরাপদ নয়।
