হয়েছে। কিন্তু, হাই ওল্ড ম্যান! আপনার ক্যামেরার রাতের ফসল টোনাবাবার একটি ছবি নয় তো!
কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন–তুমি কি টোনাবাবার কাহিনি শুনছিলে চৌকিদারের কাছে? জয়ন্ত, এ-কাহিনি যতই অবিশ্বাস্য হোক, তোমার দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকায় সত্যি ছাপার যোগ্য। অতএব, একজন রিপোর্টার হিসেবে তোমার কর্তব্য, টোনাবাবা সম্পর্কে আরও খবর জোগাড় করে কলকাতায় তোমার কাগজের অফিসে পাঠানো। হিড়িক পড়ে যাবে ডার্লিং! সত্যসেবকের বিক্রি ঝটপট বেড়ে যাবে।
-তাতে আর সন্দেহী কী? তবে বুঝতেই পারছেন, একালের পাঠক টোনাবাবার চেয়ে রাজনীতিবাবার খবরেই বেশি আসক্ত। বরং যদি টোনাবাবার ছবি দিতে পারেন, চেষ্টা করব খবর পাঠাতে। ছবিসহ খবর ছাপলে তবে লোকে বিশ্বাস করবে।
কর্নেল ঘরে ঢুকে ক্যামেরা নিয়ে সটান বাথরুমে ঢুকলেন। বুঝলাম, আপাতত ওটাই ওঁর ডার্করুম। ক্যামেরা খুলে ফোটো রিল বের করে ডেভেলপ এবং প্রিন্টের কাজে ব্যস্ত হবেন। কুড়ি-পঁচিশ মিনিটের মধ্যেই ওঁর রাতের ফসলের নমুনা চাক্ষুষ করতে পারব।
চৌকিদার চলে গেল। আমি বারান্দায় গিয়ে কিছুক্ষণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখলুম। পাহাড় ও জঙ্গল জুড়ে শেষরাতের কুয়াশা সবে মিলিয়ে যাচ্ছে এবং ঝকমকে রোদ ফুটেছে। এই বাংলোটা একটা টিলার ওপর। উত্তরে আবাদি এলাকা বাংলোর নীচেই শেষ হয়েছে। দক্ষিণ থেকে শুরু হয়েছে কঙ্কগড় ফরেস্ট ব্লক। পঞ্চাশ বর্গমাইল জুড়ে ঘন জঙ্গল। কদাচিৎ ফাঁকা এলাকায় একটা করে আদিবাসী গ্রাম।
নিচে গাছপালার ফাঁকে ঝরনা সরু সাদা ফিতের মতো যেন বাতাসে তিরতির করে কেঁপে উঠছে। তার ওপাশে একটা ন্যাড়া পাহাড়ের মাথায় সেকালের কঙ্কগড় দুর্গের ধ্বংসাবশেষ দেখা যাচ্ছে। শুনেছি, কয়েকটা ঘর এখনও নাকি টিকে আছে। কিন্তু শঙ্খচূড় সাপের ভয়ে কেউ ওদিকে পা বাড়ায় না।
আমি টোনাবাবার কথা ভাবছিলুম। ব্যাপারটা সত্যি রহস্যজনক। কিন্তু…
আমার ভাবনায় বাধা পড়ল কর্নেলের চাপা উত্তেজনাপূর্ণ কণ্ঠস্বরে। -জয়ন্ত, জয়ন্ত! চলে এসো!
ঘরে ঢুকে দেখি, টেকো দাড়িয়াল বুড়ো প্রায় ধেই ধেই নাচার ভঙ্গিতে টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে দুই ঠ্যাং ফেলছেন। পাশে গিয়ে উঁকি মেরে আঁতকে উঠলুম।
প্রিন্টগুলো ছোট্ট সাইজের। কিন্তু এ যে সেই প্রখ্যাত সিনেমা কিং কং-এর একটা রিল!
ঝরনার ধারে অবিকল কিং কং-এর মতো একটা বিদঘুটে গোরিলা জাতীয় প্রাণী হাত-পা ছড়িয়ে বসে যেন স্নান করছে জল ছড়িয়ে। আশপাশের গাছ, ঝোপ বা পাথরের সঙ্গে তুলনা করে মনে হল, প্রাণীটা অন্তত ফুট ছয়েকের বেশি উঁচু নয় এবং ছাতির মাপ প্রায় পঞ্চশ ইঞ্চি! হাত দুটো গোরিলার মতোই লম্বাটে।
হতভম্ব হয়ে বললুম–সর্বনাশ! এ যে দেখছি একটা গোরিলার ছবি!
কর্নেল একটু হেসে বললেন–কঙ্কগড়ে গোরিলা! অসম্ভব জয়ন্ত। গোরিলা আফ্রিকার প্রাণী। অবশ্য একসময় মালয়ের জঙ্গলে একধরনের গোরিলা বাস করত শুনেছি। কিন্তু তারা ওরাংওটাং-এরই একটা শ্রেণি। আশা করি, তুমি জানো ওরাংওটাং ওই এলাকারই প্রাণী।
–তাহলে কী এটা!
কর্নেল রহস্যময় হেসে বললেন-বড়োজোর এটুকুই বলতে পারি যে ইনিই হলেন কঙ্কগড়ের আতঙ্ক সেই টোনাবাবা এবং যার খোঁজে আমি তোমাকে নিয়ে এখানে পাড়ি জমিয়েছি।
অবাক হয়ে বললুম–সে কী! আপনি তো এসব কিছু বলেননি! শুধু বলেছেন, জঙ্গলে বেড়াতে যাচ্ছি। বেড়াব এবং সুযোগ পেলে দু-চারটে শিকারটিকারও করব।
–ডার্লিং, সব কথা খুলে বললে তুমি এমন হুট করে এ বুড়োর সঙ্গে বেরিয়ে পড়তে না।
–কেন? আমাকে অত ভিতু ভাবছেন কেন?
কর্নেল আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন-জয়ন্ত, আগেই যদি সব কথা তোমাকে জানিয়ে দিতুম, তাহলে তুমি আসার আগেই তোমার দৈনিক সত্যসেবকে ফলাও করে ছেপে দিতে এবং হইচই পড়ে যেত। তাতে আমার তদন্তের প্রচুর অসুবিধা ঘটত।
-বুঝলুম। কিন্তু আপনি কীভাবে টোনাবাবার কথা জানলেন?
–আমার এক বন্ধুর ছেলে অসীম ছিল দুরন্ত প্রকৃতিব পিকারি। ফরেস্ট দফতরের অনুমতির তোয়াক্কা করত না। লুকিয়ে চোরা শিকারিদের সাহায্যে জঙ্গলে ঢুকে শিকার করত. সম্প্রতি কঙ্কগড়ে সে লুকিয়ে শিকার করতে ঢুকেছিল। তারপর আর ফেরেনি। আমার বন্ধু রিটায়ার্ড ডাক্তার মেজর শঙ্করনাথের অনুরোধেই আমি তাই খোঁজখবর নিতে শুরু করেছিলুম। তারপর হঠাৎ টোনাবাবার কথাটা জানতে পারি। যাই হোক, বাকিটা বুঝতেই পারছ! এবার এসো, আমরা ব্রেকফাস্টে বসি। ডার্লিং, সবার আগে সবসময় উদরটা পূর্ণ করা দরকার। শূন্য উদরে কোনও কাজ করা যায় না।
ঘুরে দেখলুম, চৌকিদার ট্রে নিয়ে ঘরে ঢুকেছে। হুঁ, বুড়োর নাকের বাহাদুরি! আগেই টের পেয়ে গেছেন। এজন্যেই সবাই ওঁকে বলে বুড়ো ঘুঘু..
.
০২.
চৌকিদার টোনাবাবার হাতে খুন হওয়া এক শিকারির কথা বলেছিল। কর্নেলকে কথাটা জানিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু উনি তেমন কান করে শুনলেনই না। শুধু বললেন–এমন ঘটনা আরও ফুটেছে শুনেছি।
কিছুক্ষণ পরে আমরা ঝরনার ধারে গেলুম। ছবিতে জায়গাটা যেমন দুর্গম দেখাচ্ছিল আদতে অতটা নয়। কর্নেল সেখানে হেঁটমুণ্ডে ঘুরে কী যেন খুঁজে বেড়ালেন কতক্ষণ। আমি গুলিভরা রাইফেল হাতে চারদিকে কড়া নজর রাখলুম। ঘন ঝোপজঙ্গল আর গাছপালার মধ্যে ছোটোবড়ো অজস্র পাথর পড়ে আছে। পাথরের আড়ালে টোনাবাবা ওত পেতে বসলে দেখা যাবে না। সেই সময় হঠাৎ চোখ পড়ল, ওপর দিকে একটা সাদা পাথরের খাঁজে কালো কী একটা পড়ে আছে! জিনিসটা চৌকো মতো এবং কালো।
