অবাক তো বটেই, অস্বস্তিতে অস্থির হয়ে বললুম–সে কী! কই তোমায় তো বলেননি!
-বললে তুমি ভয় পেতে।
–কেন?
আবার নাক ডাকা শুরু হল হঠাৎ। কয়েকবার ডেকেও সাড়া পেলুম না। জানি, বুড়োর এই হেঁয়ালির স্বভাব বরাবর। এখন মাথা ভাঙলেও প্রশ্নের জবাব পাব না। তাই চুপচাপ শুয়ে রইলাম। কিন্তু কী এক অজানা ভয়ে বুক টিপটিপ করতে থাকল।
বাইরে জ্যোৎস্নার বান ডেকেছে। জানলাগুলোর ওপরকার পাল্লা খোলা। এলোমেলো বাতাস বইছে শুনতে পাচ্ছি। বারবার জানলার দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে, হঠাৎ দেখতে পাব কালো এক রস্যময় প্রাণীকে–যে সন্ধ্যাবেলায় কর্নেলের পিছু নিয়েছিল এবং মানুষের মতো দু-পায়ে হাঁটে।
অবশ্য ভালুকেরও এখন দু-পায়ে দাঁড়ানোর অভ্যাস আছে। কিন্তু কর্নেল বললেন ওটা ভালুকই নয়! তাহলে ওটা কী? তাকে ভয় পাবারই বা কী আছে?
আতঙ্ক বেড়ে গেল। কিন্তু উঠে গিয়ে যে জানালা বন্ধ করব, সে সাহসও নেই। তাছাড়া জানলা বন্ধ করলে বন্ধ ঘরে আমার শ্বাসকষ্ট শুরু হতে পারে, এমন অভ্যাস।
সে-রাতে রাইফেলের বাঁটে হাতে রেখে সাতপাঁচ ভাবতে-ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলুম। সেই ঘুম ভাঙল চৌকিদারের ডাকে। সে বেড-টি এনেছে।
বাইরে কুয়াশা জমে আছে তখনও। কিন্তু পাখপাখালির ডাক শোনা যাচ্ছে। উঠে বসে হাত বাড়িয়ে চা নিলুম। তারপর ডালুম-কর্নেল! উঠলেন নাকি?
চৌকিদার বলল–বড়াসাব অনেক আগে উঠেছেন স্যার। উঠে জঙ্গলে গেছেন। আমি বারণ করলুম, শুনলেন না।
হুঁ, ঝরনার ধারে ওঁর আজব ক্যামেরাটি আনতে গেছেন নিশ্চয়। ক্যামেরাটি এমন আজব যে। ওতে অদৃশ্য আলোয় ছবি ওঠে। ক্যামেরা গাছের ডালে ঝুলিয়ে শাটারের সঙ্গে আটকানো একটা তার মাটিতে নিচে পুঁতে রাখাই যথেষ্ট। লেন্সের সামনে ১৮০ ডিগ্রি এবং তিরিশ মিটার অবধি মাটিতে কিছু চলাফেরা করলেই সেই সূক্ষ্ম স্পন্দন তার বেয়ে শাটারে চলে যাবে এবং শাটার ক্লিক করবে। ছবি উঠে যাবে। তারপর ফিল্মের রিলও অটোমেটিক পদ্ধতিতে গুটিয়ে পরবর্তী ছবি ওঠার ব্যবস্থা করবে।
বললুম-ওহে চৌকিদার, রাতে তোমরা এত চ্যাঁচামেচি করছিলে কেন?
চৌকিদার ভয় পাওয়া গলায় বলল–স্যার, রাতে বাংলোয় ফের টোনাবাবা এসেছিল। আমরা স্বামী-স্ত্রী মিলে খুব চ্যাঁচামেচি করে ওকে তাড়িয়ে দিলুম।
–টোনাবাবা মানে? তোমরা তো বারবার ভালুক ভালুক বলে চাঁচাচ্ছিলে!
চৌকিদার চাপা গলায় বলল-স্যার, ভালুকের নাম না করলে টোনাবাবা পালিয়ে যেত না। ও ভালুককে খুব ভয় পায়।
ওর কথা শুনে অবাক হয়ে মশারি তুলে বেরুলুম। চৌকিদার এবার মশারিটা খাটের মাথার ওপর গুঁজে দিতে ব্যস্ত হল। আমি ওর দিকে তাকিয়ে বললুম-ওহে, তোমাদের এই টোনাবাবাটি কী জিনিস বলো তো!
চৌকিদার মাথা নেড়ে বলল–তা তো আমি জানি না হুজুর। সবাই ওকে টোনাবাবা বলে। তবে এই পরপর দু-রাত্তির হল সে বাংলোয় কেন হানা দিচ্ছে বুঝতে পারছি না।
-টোনাবাবা মানুষ, না জন্তু?
–তাও জানি না হুজুর।
–দেখতে কেমন?
চৌকিদার ভয় পাওয়া চোখে তাকিয়ে বলল–দেখতে কতকটা ভালুকের মতো বটে, তবে দু-পায়ে হাঁটে। ধুকুর পুকুর করে ওকে দৌড়ে যেতেও দেখেছে এলাকার লোকে। একবার কাঠুরেরা ওকে তাড়া করেছিল। তাদের কাছে শুনেছি, টোনাবাবার গায়ে কুড়ুলের কোপ বসে না-যেন পাথর! কঁপডিহির সাঁওতালরা নাকি তীর ছুঁড়ে দেখেছে, সব তীর ডকাস করে পড়ে যাচ্ছে গা থেকে আর ভেঙে দুমড়ে যাচ্ছে।
.
চৌকিদার নিশ্চয় বাড়াবাড়ি করছে ভেবে বললুম–যতসব গাঁজাখুরি গল্প। ঠিক আছে, আজ রাতে তোমাদের টোনাবাবা হানা দিক, তখন দেখব তার গায়ে রাইফেলের গুলি বেঁধে নাকি?
চৌকিদার বড়োসড়ো চোখে তাকিয়ে জোরে মাথা দুলিয়ে বলল-খবরদার স্যার, খবরদার! কক্ষনো গুলি ছুঁড়বেন না। গত শীতে এক শিকারিবাবু এসেছিলেন এই বাংলোয়। তিনি জঙ্গলে গিয়ে আর ফেরেননি। কাঠুরেদের কাছে পরে জানা গেল, তিনি টোনাবাবাকে গুলি করেছিলেন। আর টোনাবাবা তাঁর বন্দুক কেড়ে টুকরো করে ফেলেছিল। তাকেও এক থাপ্পড় মেরেছিল। তাতে উনি একেবারে দলাপাকানো লাশ হয়ে জঙ্গলে পড়েছিলেন। বরং টোনাবাবাকে দেখতে পেলে ভালুক বলে চাঁচাবেন-দেখবেন তক্ষুনি পালিয়ে যাবে।
জংলি এলাকার লোকেদের কুসংস্কার বা অন্ধ বিশ্বাসের ব্যাপারটা আমার জানা আছে। তাই চৌকিদারের কথায় অবাক হলাম না। কিন্তু স্বয়ং বিচক্ষণ কর্নেল নীলাদ্রি সরকারও এমন কিছুর। ইশারা দিচ্ছিলেন গতরাতে। সেটাই আমার ভাবনার কথা! একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
চৌকিদার এরপর টোনাবাবার এককাহন গল্প শুনিয়ে ছাড়ল। গল্পগুলো প্রায় একই রকম। কিন্তু। একটা অদ্ভুত মিল সব গল্লেই রয়েছে। টোনাবাবার আবির্ভাব দিনে হয় না। সে আসে অন্ধকারে। আরও মজার কথা, কেউ সাড়া পাবার আগে বাচ্চা ছেলেমেয়েরা যেন তার আসাটা টের পায়। কারণ তারা আচমকা ঘুম ভেঙে বেজায় কান্নাকাটি জুড়ে দেয়। গতরাতে চৌকিদারের বাচ্চাটা আচমকা কেঁদে উঠেছিল বলেই না ওরা টের পেয়ে গিয়েছিল টোনাবাবা আসছে।
গল্প শুনতে শুনতে দেখি, এতক্ষণে আমার বৃদ্ধ বন্ধুবর ফিরে আসছেন। টুপিতে শুকনো পাতা, মাকড়সার জাল আটকে আছে। কাঁধে সেই বিদঘুটে ক্যামেরা আর দূরবিন যন্ত্রটি ঝুলছে। পিঠে রাইফেল বাঁধা আছে। বারান্দায় উঠে টুপিটা ঝেড়ে সাফ করে বললেন-সুপ্রভাত জয়ন্ত। আশা করি, ক্লান্তি দূর করার মতো সুনিদ্রা হয়েছে।
