লাহিড়ীসায়েব হাসলেন, কারেক্ট। নিচেই মেন সুইচ থাকে। কিন্তু আমাদের এক অফিসারের চোখে পড়ে, দ্বিতীয় একটা মেইন সুইচ সিঁড়ির মাথায় ডানদিকের দেয়ালে বসানো হয়েছে। সেটা আনকোরা নতুন।
কর্নেল বললেন, যাদুগোপালবাবুই দ্বিতীয়বার তাঁর দাদার ঘরে যাবার জন্য তাগিদ দেন মনে পড়ছে, জয়ন্ত? কারণ, এবার তাকে দেখাতে হবে, প্রাণগোপালবাবু নিহত হয়েছেন!
কৃতান্তবাবু মুখ খুললেন এতক্ষণে, কিন্তু অশ্বডিম্বটার ব্যাপার বুঝলুম না!
কর্নেল বললেন, খুব প্রাঞ্জল। আমি রহস্যটহস্যের গন্ধ পেলে ছুটে যাই-যাদুগোপালবাবু বিলক্ষণ জানেন। তাই প্লাস্টিক কারখানার আজগুবি অশ্বডিম্ব বানিয়ে পুলিশ অফিসার বারীন মণ্ডলকেও সেটা দেখিয়ে সাক্ষী রেখেছিলেন–সত্যি যেন ডিম্ব প্রসব করেছে তার ঘোড়া। তারপর আমার পক্ষে অশ্বডিম্বের প্লাস্টিক বডি টের পেতে দেরি হবে না ভেবে সেটা জগনকে বলে এসেছিলেন লুকিয়ে ফেলতে। ওটা আমাকে নিয়ে যাওয়ার একটা অছিলা। তাছাড়া পুলিশ এই খুনের সঙ্গে অশ্বডিম্ব রহস্য জড়িয়ে ধাঁধায় পড়ুক এই ছিল ওঁর উদ্দেশ্য। যাই হোক, সিঁড়িতে বুটের শব্দ শোনা যাচ্ছে, অরিজিৎ, তোমার বাহিনী আসছে।
যাদুগোপালবাবুর দিকে তাকিয়ে দেখলুম, খড়ের কাকতাড়ুয়া হয়ে বসে আছেন। ..
২.০৯ কঙ্কগড়ের রহস্য
০১.
অনেক রাতে কোথায় একটা চ্যাঁচামেচির শব্দে ঘুম ভেঙে গেল।
বালিশের পাশে টর্চ এবং মাথার দিকে গুলিভরা রাইফেল ছিল। টর্চ ও রাইফেল নিয়ে মশারি থেকে বেরিয়ে দরজা খুলতে যাচ্ছি, পাশের খাট থেকে আমার সঙ্গী ভদ্রলোকের গলা শোনা গেল-রাতদুপুরে কোথায় চললে জয়ন্ত?
ব্যস্তভাবে বললুম–বাইরে গণ্ডগোল হচ্ছে শুনতে পাচ্ছেন না?
-হুঁ, পাচ্ছি। চৌকিদার আর তার বউ ভালুক ভালুক বলে চ্যাঁচাচ্ছে।
এবার কান করে শুনি, সত্যি তাই। এই বনবাংলোর উঠোনে একটা প্রকাণ্ড মহুয়া গাছ আছে। এখন মার্চের শেষ থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত গাছটায় প্রচুর মহুয়া ফল পাকে। ভালুকের প্রিয় খাদ্য তো। কাজেই ভালুক আসাটা অস্বাভাবিক নয়।
কিন্তু চৌকিদার তার বউয়ের এত ভয় পেয়ে চ্যাঁচামেচির কী আছে! ওরা এই বনজঙ্গল এলাকারই লোক। ভালুক দেখতে অভ্যস্ত। অথচ এমন গণ্ডগোল জুড়ে দিয়েছে, যেন ডাকাত পড়েছে বাড়িতে।
বললুম-মনে হচ্ছে, ওরা বেজায় ভয় পেয়ে গেছে। ওদের সাহস দেওয়া উচিত, কী বলেন?
-তা দিতে পারো। তবে সাবধান, বেরিয়ো না। বুঝতে পারছ না, ওরাও ঘরের ভেতর থেকে চ্যাঁচাচ্ছে।
এবার খুব অবাক হয়ে বললুম-ভালুককে এত ভয় পাওয়ার কী আছে!
–আছে ডার্লিং, আছে। ওই শোনো, ওরা এবার চুপ করে গেল। অতএব তুমি চুপচাপ শুয়ে পড়ো। সারাদিন ট্রেন আর জিপগাড়িতে যে ধকল গেছে, তা সামলাতে আমাদের লম্বা একটা ঘুম দরকার।
আমার এই সঙ্গী ভদ্রলোকের হরেকরকম বিদঘুটে আচরণ আমার দেখা আছে বহুদিন থেকে। কিন্তু কঙ্কগড় বনবাংলোয় এসে অবধি যা বলছেন, তাতে আমার ভয় হচ্ছে যে নির্ঘাত ওঁর খুলির ভেতরকার নরম জিনিসটি এতদিনে কেঁসে গেছে!
অর্থাৎ যাকে বলে বাহুরে দশা! আরও সোজাসুজি বললে ভীমরতি ধরা।
সেটাও খুব স্বাভাবিক। বয়স পঁয়ষট্টি পূর্ণ হয়েছে। গত ক্রিসমাসে নিজের পঁয়ষট্টিতম জন্মদিন মহাসমারোহে পালন করেছেন। বলেছেন–ডার্লিং জয়ন্ত, আমার টাক এই শীতে রাতারাতি আরও এক ইঞ্চি বেড়ে গেছে লক্ষ্য করেছে কি? এবং দাড়ির সর্বশেষ গোপনতম অংশও সাদা হয়ে গেছে দেখতে পাচ্ছ কি? জয়ন্ত, এতদিনে আমি প্রকৃত বুড়োমানুষ হলুম। এবার আমার সন্ন্যাস ধর্ম অবলম্বন করা উচিত।
ডিসেম্বরের শীতে একথা বলার পর মার্চের শেষ দিকে মনোরম এই বসন্তকালে হঠাৎ যখন আমাকে টেনে নিয়ে কঙ্কগড় জঙ্গলে এলেন, আমার ভয় হচ্ছিল–সত্যি সন্ন্যাসী হয়ে দুর্গম বনের ভেতর একটা পাহাড়ি গুহায় বুঝি ঢুকে পড়বেন তপস্যা করতে এবং আমাকে বিষণ্ণভাবে কলকাতা ফিরে যেতে হবে একা।
কিন্তু বিকেলে এখানে পৌঁছোনো অবধি তেমন কোনও সন্ন্যাসীভাব তো দেখছিই না, বরং চপলমতি ছেলেপুলের মতো প্রজাপতির পেছনে দৌড়ুচ্ছেন–কিংবা চোখে বাইনোকুলার রেখে পাখপাখালি দেখছেন। কখনও বা হঠাৎ মাটির দিকে ঝুঁকে হেঁটমুণ্ডে কী সব খুঁজছেন! ওঁর উদ্ভুটে কাণ্ডকারখানা দেখলে তাক লেগে যায়। যাই হোক, আমি সত্যি ক্লান্ত। টর্চ ও রাইফেল যথাস্থানে রেখে মশারির ভেতর শুয়ে পড়লুম। তারপর বললুম-হেঁয়ালি না করে আসল কথাটা বলুন তো কর্নেল!
আশ্চর্য! আমার বৃদ্ধ বন্ধু কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের নাক ডাকছে! বিরক্ত হয়ে বললাম কর্নেল! আপনি কি আজকাল আফিং খাওয়া ধরেছেন?
নাকডাকা থামল। –জয়ন্ত, আফিংখোরদের নাক ডাকে না।
-জেনে খুশি হলুম। কিন্তু আমার জিজ্ঞাস্য, ভালুককে এত ভয় পাবার কী আছে–বিশেষ করে সঙ্গে যখন গুলিভরা রাইফেল রয়েছে?
–এ ভালুক সে-ভালুক নয়।
তার মানে!
–ওটা ভালুক কিনা, সে বিষয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে, জয়ন্ত।
–বাঃ! যে-ভালুক এইমাত্র এসেছিল এবং যাকে দেখে চৌকিদার ও তার বউ চাঁচাচ্ছিল, তাকে আপনি বুঝি মশারির ভেতর শুয়ে মনশ্চক্ষে দেখলেন?
-না ডার্লিং! ওই আজব প্রাণীটিকে আমি সন্ধ্যায় দেখেছি একবার। আমি যখন ঝরনার ধারে ক্যামেরা পেতে রেখে ফিরে আসছিলুম, সে আমার পিছু নিয়েছিল। সে মানুষের মতো দুপায়ে হাঁটতে পারে।
