যাদুগোপালবাবু ধাতস্থ হয়ে বসলেন। রুমালে চোখ মুছতে থাকলেন। বললেন, দাদাকে চিরদিন সহোদর বলেই জেনেছি। আমাকে মানুষ করেছেন দাদা। আর তাকে আমি-ওঃ!
কৃতান্তবাবু কী বলতে যাচ্ছিলেন, কলিংবেল বাজাল। কিন্তু এবার আর উঠে দাঁড়ালেন না সেলাম ঠোকার জন্য। মুখটা কেমন বাঁকা।
ডি. সি. ডি. ডি. অরিজিৎ লাহিড়ী ঘরে ঢুকেই বললেন, মাই ওল্ড ম্যান! ইউ আর রাইট–একেবারে কাঁটায় কাঁটায় রাইট। ওটা পাওয়া গেছে। কৃতান্তবাবু এতক্ষণে উঠে খট করে সেলাম ঠুকলেন। অরিজিৎ তার দিকে তাকালেন না।
যাদুগোপালবাবুকে দেখে কর্নেলকে জিজ্ঞেস করলেন, ইনি কে? কর্নেল পরিচয় করিয়ে দিলেন। অমনি যাদুগোপালবাবু হাউমাউ করে কেঁদে বলে উঠলেন, এঁরা সাক্ষী স্যার! এঁদের জিজ্ঞেস করুন, আমি
লাহিড়ীসায়েব বললেন, কর্নেল! একবার ফোন করব।
স্বচ্ছন্দে। -কর্নেল কোনার দিকে তুলে রাখা ফোনটা দেখিয়ে দিলেন।
লাহিড়ীসাহেব ফোনে কার সঙ্গে চাপা গলায় কিসব কথাবার্তা বলে সোফায় এসে বসলেন। যাদুগোপালবাবুর পাশেই বসলেন। লাহিড়ীসায়েবের হাতে একটা ব্রিফকেস। নিচু টেবিলটাতে রেখে মৃদু হেসে কর্নেলকে বললেন, মর্গের রিপোর্ট পাওয়া গেছে।
কর্নেল বললেন, কী আছে রিপোর্টে?
লাহিড়ীসায়েব ব্রিফকেস সামান্য খুলে একটা কাগজ বের করে কর্নেলকে দিলেন। যাদুগোপালবাবু চাপা উত্তেজনায় সোজা হয়ে বসে বললেন, কী লিখেছে রিপোর্টে, কর্নেলস্যার?
কর্নেল একটু হেসে বললেন, বলছি। কাল আমি ও জয়ন্ত ঠিক কটা নাগাদ আপনার বাড়ি গিয়েছিলুম, যাদুগোপালবাবু?
যাদুগোপাল হকচকিয়ে বললেন, টাইম তো দেখিনি স্যার। সন্ধ্যাবেলায় গিয়েছিলেন। ঠিক সাড়ে ছটায়। কর্নেল বললেন, গিয়ে দরজার বাইরে থেকে আপনার দাদাকে বই পড়তে দেখলুম। কথাও বললেন
কর্নেলস্যার! তার আগে সিঁড়িতে ওঠার সময় লোডশেডিং হয়েছিল। তখন দাদাকে–অ্যাই জগনা বলে চাঁচাতেও শুনেছিলেন।
কর্নেল নির্বিকার মুখে বললেন, হ্যাঁ আপনার মুখস্থ আছে দেখছি। যাই হোক, মর্গের রিপোর্ট বলছে, আপনার দাদার মৃত্যু হয়েছে বিকেল চারটে থেকে ছ-টার মধ্যে। তার মানে, সাড়ে ছটার পর আমরা যখন প্রাণগোপালবাবুর ঘরের সামনে যাই, তখন উনি মৃত–অন্তত মর্গের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের মতে। খটকা আমারও লেগেছিল রক্তের চেহারা এবং ছড়িয়ে পড়ার ধরন দেখে। আঁচ করেছিলাম, খুনটা সেই মুহূর্তে হয়নি–বিশেষজ্ঞের রিপোর্টে তা যাচাই হয়ে গেল।
যাদুগোপাল ভাঙা গলায় বললেন, ভুল, ভুল রিপোর্ট। ডাক্তার ঘুষ খেয়েছে জগনার কাছে। দাদা জগনের সঙ্গে কথা বলছে, তাও শুনেছেন। জগন মোমের আলো ঠিক জায়গায় বসিয়ে দিল। তখন দাদা বললেন, ঠিক আছে। তুই যা। তারপর জগন আপনাদের কথা বলল। তখন দাদা
বাধা দিয়ে কর্নেল লাহিড়ীসায়েবের দিকে একটা চোখ রেখে বললেন, যাদুগোপালবাবু, টেপরেকর্ডার নামে একটা যন্ত্র আছে, জানেন তো?
যাদুগোপালবাবু উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই কৃতান্তবাবু তাকে টেনে বসিয়ে দিলেন। আর সেই মুহূর্তে লাহিড়ীসায়েব একটি ছোট্ট টেপরেকর্ডার বের করলেন ব্রিফকেস থেকে। যন্ত্রটায় ধুলো-কাদা মাখা। লাহিড়ীসায়েব একটু হেসে কর্নেলকে বললেন, আপনি গ্যারাজে ঘোড়ার জাবনা খাওয়া পাত্রের তলায় খুঁজতে বলেছিলেন। ঠিক সেখানেই পাওয়া গেছে। তবে মেঝেয় পোঁতা ছিল।
কর্নেল বললেন, হ্যাঁ–ওটাই সম্ভাব্য জায়গা বলে মনে হয়েছিল।
লাহিড়ীসায়েব টেপটা চালিয়ে দিলেন। কিছুক্ষণ পরে খ্যানখেনে গলায়–গতকাল সন্ধ্যায়। শোনা সেই চ্যাঁচামেচি শোনা গেল : অ্যাই জগনা!…তার আন্দাজ দুমিনিট পরে : ঠিক আছে, তুই যা। …আমার সময় নেই। যেতে বল। ..এখন না। এখন না। পরে আসতে বল। আমি ব্যস্ত।
টেপ বন্ধ করে দিলেন লাহিড়ীসায়েব। কর্নেল বললেন, আমাকে নিজের নির্দোষিতার সাক্ষী রাখতে চেয়েছিলেন যাদুগোপালবাবু। এই বিকৃত স্বরে কথাবার্তা ওঁরই। দারুণ হত্যা পরিকল্পনা! জগন ওঁর সহকারী হয়েছিল টাকার লোভে।
লাহিড়ীসায়েব বললেন, জগন সব কবুল করেছে। হিরে-মুক্তোর ব্যাপারটা সত্যি। তাই নিয়েই দুই ভাইয়ে ইদানীং ঝগড়াঝাটি চলছিল।
কর্নেল বললেন, জগনকেও সন্দেহ করা যেত না। অ্যারেস্ট করার কারণ খুঁজে পেত না পুলিশ। কারণ সে আমাদের সঙ্গে থাকত। কিন্তু আমাদের হালদারমশাই নাক গলাতে গিয়ে গণ্ডগোল করে। ফেলেছিলেন। উনি অশ্বডিম্ব চুরি না করতে গেলে জগন অমন করে দৌড়ে যেত না। কিছুক্ষণের জন্য সে আমাদের সঙ্গছাড়া হয়েছিল। তাই তার ওপর সন্দেহ হওয়া স্বাভাবিক। নইলে পুলিশ বাইরের অজ্ঞাত পরিচয় খুনির পেছনে হন্যে হত। ঘোড়ার ডিম খুঁজে বেড়াত। -কর্নেল হাসতে থাকলেন।
বললুম, কিন্তু দ্বিতীয়বার গিয়ে প্রাণগোপালবাবুকে উপুড় হয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছি।
কর্নেল বললেন, নিচে চোর চোর চ্যাঁচামেচি শুনে জগন, ঘর থেকে দৌড়ে বেরুনোর সময় বুদ্ধি করে আগেই মৃত প্রাণগোপালকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। ভুলে যেয়ো না, তখন চোর চোর শুনে আমাদের চোখ অন্যদিকে ঘুরে গেছে। সেই সুযোগ সে নিয়েছে। এমনকী লোডশেডিংও সাজানো ব্যাপার। কারণ আমার চোখ এড়ায়নি, পাড়ায় আলো ছিল। শুধু ওই বাড়িটাই অন্ধকার হয়ে গেল। জগনই সিঁড়ির মাথায় দ্বিতীয় একটা মেইন সুইচ অফ করে দিয়েছিল। দ্বিতীয়বার গঙ্গার ঘাটের দরজা বন্ধ করার অছিলায় তাকে সরিয়ে দেওয়ার মানেই হল আমাদের অসাক্ষাতে যেন সে আবার মেইন সুইচ অন করে দেয়। করেও ছিল তাই।
