–হ্যাঁ!
এবং বারীনবাবুর ডিমটার দিকে এগোলে চিঁহি ডাক ডেকে ওঁকে কামড়াতে এসেছিল।
এবার অবাক হয়ে বললুম, তাহলে আপনি তো সবই জানেন দেখছি।
ষষ্ঠী কফি আনল। চুমুক দিলুম। ষষ্ঠী কফিটা দারুণ করে। ক্লান্তি জুড়িয়ে গেল। কর্নেল একটু হেসে বললেন, জানি-মানে, কাল সকালে যাদুগোপালবাবু চলে যাওয়ার পর বিজ্ঞানীত্রয়ের খোঁজে বেরিয়েছিলুম। পাত্তা না পেয়ে ব্যাপাকপুর থানায় গিয়েছিলুম। এসবের জন্যই যাদুগোপালবাবু সঙ্গে যেতে অনুরোধ করা সত্ত্বেও সঙ্গে যাইনি। সন্ধ্যায় যাব বলেছিলুম। ডার্লিং! তুমি তো জানো, আমি আগে ভালো করে চারদিক না দেখেশুনে কোনো কাজে পা বাড়াইনে।
কৃতান্তবাবু বারবার ঘড়ি দেখছিলেন। বললেন, সাড়ে ছটা বেজে গেল। এখনও তো লালবাজার থেকে ডি. সি. ডি. ডি. সায়েব এলেন না।
বললুম, ডি. সি. ডি. ডিমানে গোয়েন্দা দফতরের কর্তা অরিজিৎ লাহিড়ী?
কর্নেল শুধু মাথা দোলালেন।
কৃতান্তবাবু একটু অস্থিরভাবে বললেন, পুলিশের আর সে ডিসিপ্লিন নাই। সব ভাইঙ্গা তছনছ হইয়া পড়ছে। রেগুলারিটি নাই। কিছু নাই। কথা দিয়া, কথা রাখেন না কেউ। আমাগো আমলে কী অবস্থা আছিল কহন যায় না। একবার হইল কি
বাধা পড়ল ওঁর কথায়। কলিংবেল বাজল। অমনি কৃতান্তবাবু নড়েচড়ে এবং হাসিমুখে ঝটপট উঠে দাঁড়ালেন। চাপা গলায় বললেন, সায়েব আইয়া পড়েছেন।
প্রাক্তন ইস্পেক্টর কৃতান্ত হালদার ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের ডেপুটি কমিশনার সায়েবকে স্যালুট ঠোকার জন্য অ্যাটেনশানভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রয়েছেন দেখে হাসি পাচ্ছিল। কিন্তু তার বরাত! লাহিড়ীসায়েবের বদলে যিনি এলেন, তিনি যাদুগোপাল।
মুখে গভীর শোকের ছাপ। কর্নেল আস্তে বললেন, বসুন যাদুগোপালবাবু।
যাদুগোপালবাবু ক্লান্তভাবে বসলেন। পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখ মুছে ভাঙা গলায় বললেন, জগন যে এমন বিশ্বাসঘাতকতা করবে, কল্পনাও করিনি। দুধ দিয়ে সাপ পুষেছিলুম, কর্নেল!
কৃতান্তবাবু বসে পড়েছেন। মুখটা গম্ভীর। কর্নেল বললেন, আচ্ছা যাদুগোপালবাবু, জগন কেন আপনার দাদাকে খুন করল? এ সম্পর্কে আপনার কী ধারণা?
যাদুগোপালবাবু বললেন, একটা সন্দেহ হচ্ছে
–হুঁ, বলুন।
-মায়ের কাছে শুনেছিলুম, বাবা নাকি একবার নিলামে বহু টাকা দামের হিরে মুক্তোর অলংকার কিনেছিলেন। কিন্তু সেগুলো বাবা কোথায় রেখে গেছেন, হদিস পাওয়া যায়নি। এখন। আমার মনে হচ্ছে, দাদার কাছেই সেগুলো লুকোনো ছিল। গত বছর কারবারে প্রচণ্ড লোকসানের শকে দাদার মাথায় গণ্ডগোল দেখা যায়। আমাদের প্লাস্টিক গুডস তৈরির কারখানা আছে। এখন মনে হচ্ছে, দাদা গোপনে একটা প্লাস্টিকের খোল তৈরি করে
কৃতান্তবাবু বলে উঠলেন, ঘোড়ার ডিম বলুন। অশ্বডিম্ব।
যাদুগোপাল একটু বিরক্ত হলেন বোঝা গেল। বললেন, আঃ! কথাটা শুনুন আগে। ওটাই দাদার পাগলামি। জিনিসগুলো ওই ডিমের গড়ন খোলের ভেতর ঢুকিয়ে মুখটা সিল করে দিয়েছিলেন। তারপর পাগলামির ঝোঁকে আমার ঘোড়াটার কাছে রেখে এসেছিলেন। স্রেফ পাগলামি ছাড়া কারণ খুঁজে পাচ্ছি না। যাই হোক ধূর্ত জগন কীভাবে তা টের পেয়ে জিনিসটা চুরি করে বাগানে পুঁতে রেখে আমাকে কাল সকালে এখানে মিথ্যে ফোন করেছিল।
কর্নেল সায় দিয়ে বললেন, ঠিক, ঠিক!
যাদুগোপাল শ্বাস ফেলে বললেন, কাল সন্ধ্যোয় ওটা…
আমি বাধা দিয়ে বললুম, কিন্তু হরু ঠাকুর যখন চোর চোর বলে চাঁচায়, তখন তো জগন আমাদের সঙ্গে ছিল।
যাদুগোপালবাবু জোরে মাথা নেড়ে বললেন, না না। ওর কোনো লোককে বলা ছিল। সেই লোকই ওর কথামতো বাগানে ঢুকে জিনিসটা ঠিক জায়গা থেকে তুলে নিয়ে পালায়। জগনকে তো জানেন না। পাড়ায় ওর চ্যালার অভাব নেই।
কর্নেল বললেন, তা সম্ভব বটে।
যাদুগোপালবাবু জোর দিয়ে বললেন, ঠিক তাই। চোর তাড়ানোর ছলে শয়তানটা ওপরে গিয়ে দাদাকে খুন করে। তারপর ভালোমানুষ সেজে গঙ্গার দিকের দরজা খুলে আমাদের কাছে আসে। আমরা তখন বাগানে।
–ঠিক, ঠিক। আপনার কথায় যুক্তি আছে।
এবার যে জন্য আপনার কাছে ছুটে এলুম, বলি। -যাদুগোপালবাবু কান্না জড়ানো স্বরে বললেন, ব্যাটাচ্ছেলে আমার নামে পুলিশকে কিসব বলেছে। পুলিশ আমাকে জেরায় জেরায় জেরবার করে দিচ্ছে। আমিই নাকি ষড়যন্ত্র করেছিলুম দাদাকে খুন করার জন্য। অথচ দেখুন, আপনি আর জয়ন্তবাবু সাক্ষী। দাদাকে আমরা তিনজন জীবিত অবস্থায় বই পড়তে আর কথাবার্তা বলতে শুনেছি।
কর্নেল জোরগলায় বললেন, হ্যাঁ–শুনেছি। আপনি আমাদের সঙ্গেই ছিলেন সারাক্ষণ।
এবারে দয়া করে পুলিশকে সেই কথাটা বলুন, স্যার।
–কাল রাত্রে তো পুলিশকে আমরা বলেছি সেকথা।
-আজ আবার পুলিশ উলটো গাইছে। জগন নাকি কিসব কবুল করেছে। আমাকে যে কোনো সময় পুলিশ অ্যারেস্ট করবে মনে হচ্ছে। তাই আপনার কাছে ছুটে এলুম কর্নেল স্যার! আপনারা আমার সাক্ষী।
আমি দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার অন্তর্তদন্তের দ্বিতীয় দফা হিসেবে যাদুগোপালবাবুর বক্তব্য নোট করছিলুম। সায় দিয়ে বললুম, আলবাত সাক্ষী আমরা। কিন্তু তিন বি
বিজ্ঞানী টা আর বলা হল না। কর্নেল চোখ কটমটিয়ে বললেন, থামো তো তুমি! এই কাগজের লোকগুলো তিলকে তাল করতে ওস্তাদ।
তারপর যাদুগোপালবাবুর দিকে মিঠে গলায় বললেন, একটু বসুন। কৃফি খান। লালবাজার থেকে ডি. সি. ডি. ডি. সায়েব এসে যাবেন। আমরা তাকে বলব-হা, সুস্পষ্ট ভাষায় বলব, আপনার দাদাকে আমরা জীবিত অবস্থায় দেখেছি এবং তখন আপনি আমাদের সঙ্গে ছিলেন। ঘরে পর্যন্ত ঢোকেননি। এমনকী, হরুঠাকুরের চ্যাঁচামেচি শুনে যখন নিচের বাগানে যাই, তখনও আপনি আমাদের সঙ্গে ছিলেন। আপনার সঙ্গে আমরা বাগান থেকে ফিরে ফের যখন ওপরে আপনার দাদার ঘরে যাই, তখন ওঁকে নিহত অবস্থায় দেখি। কাজেই আপনাকে খুনি শাব্যস্ত করার কোনো উপায় নেই–পুলিশ যাই বলুক। আপনি কিছু ভাববেন না।
