জোরগলায় বললুম, কাজেই শেষ পর্যন্ত বোঝা যাচ্ছে, আমার থিয়োরি কারেক্ট। পুলিশ ঠিক লোককেই অ্যারেস্ট করেছে। তার মানে জগন নিজে ডিমটা লুকিয়ে ফেলে যাদুগোপালবাবুকে মিথ্যে কথা বলছিল ফোনে। অতএব
কর্নেল ভুরু কুঁচকে মিটিমিটি হেসে বললেন, অতএব?
বললুম, ডিমটার ভেতর কিছু রহস্য আছে।
-তার আগে বলল, তুমি ওটা সত্যি সত্যি ঘোড়ার ডিম বলে মনে করছ কি না?
হাসতে হাসতে বললুম, মোটেও না।
–তাহলে জিনিসটা কী?
ডিম্বাকৃতি হালকা জিনিসটা নাড়াচাড়া করে বললুম, তিনজন বিজ্ঞানী নাকি এটা পরীক্ষা করেছেন। তারাও এর হদিস করতে পারেননি। আমি নিতান্ত এক সাংবাদিক। আমি বড়োলজার ওই তিন বিজ্ঞানীর কাছে সাক্ষাৎকার নেব। নাম ঠিকানা আপনাকে তো যাদুগোপালবাবু দিয়ে গেছেন। কই লিখে দিন আমাকে।
কর্নেল টেবিলের ড্রয়ার থেকে নোটবুক বের করে পাতা উলটে বললেন, লেখো—
ড. বি. এ. অধিকারী, ১৭/২ হরি দত্ত, স্ট্রিট, কলকাতা-৬
ড. এন. কে. খড়াই, ৩৩২/এ, সাউথ অরবিন্দ লেন, কলকাতা-৭৬
ড. আর. পি. শর্মা, ১০১/৩/ই সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ, কলকাতা-১২।
ডিমটা এখন কৃতান্তবাবুর হাতে। নোটবইতে নাম-ঠিকানাগুলো টুকে নিয়ে দেখলুম, উনি ডিমটা নাকে ঠেকিয়ে শুঁকছেন। বললেন, কেমন একটা গন্ধ বুঝলেন কর্নেল। কতবার রগড়ে ধুয়েও দুর্গন্ধটা যাচ্ছে না।
কর্নেল এতক্ষণে ওঁর কাছ থেকে ডিমটা নিয়ে শুঁকে বললেন, হঁ অ্যামোনিয়ার সঙ্গে থাইরামাইন জাতীয় রাসায়নিক পদার্থ মেশালে এইরকম কটু গন্ধ ছড়ায়। ঘোড়া কেন, যে কোনও জন্তুর কাছে ওই দুটো জিনিস মাখিয়ে কিছু রাখলে সে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। শুধু তাই নয়, নেশাচ্ছন্ন অবস্থায় থাকলেও হিংস্র হয়ে ওঠে সে। কাছে শব্দ হলেই চমকে ওঠে এবং কামড়াতে আসে। যাই হোক, জয়ন্ত, তুমি ওই তিন বিজ্ঞানীর কাছে আমার এই অভিমতও জানাতে পারো। তাঁরা কী বলেন শোনো।
বলেই হঠাৎ অট্টহাসি হেসে উঠলেন। বললুম, হাসছেন কেন? কর্নেল। হঠাৎ হাসবার কারণ কী?
কর্নেল সমানে হাসতে থাকলেন। কৃতান্তবাবু হাঁ করে আছেন। হঠাৎ আমার সন্দেহ জাগল, কর্নেল ওই রাসায়নিক দ্রব্যের সংক্রমণে প্রাণীর মতোই নেশাগ্রস্ত কিংবা পাগলপ্রায় হিংস্র হয়ে পড়েননি তো?
আমি কাছে যেতে সাহস না পেয়ে ডাকতে থাকলুম, কর্নেল! কর্নেল! প্লিজ! ষষ্ঠীও ভেতরের দরজার পর্দা তুলে তার বাবা-মশাইকে এমন বিকট হাসতে দেখে হাঁ করে দাঁড়িয়ে গেছে।
হাসির চোটে কর্নেলের হাত থেকে প্রকাণ্ড ডিমটি মেঝেয় পড়ে গেল। পড়েই চৌচির। অমনি কর্নেল হাসি থামিয়ে বলে উঠলেন, এই রে! তারপর টুকরোগুলো কুড়োতে ব্যস্ত হলেন।
নাঃ। দিব্যি সুস্থ মানুষ মনে হচ্ছে এখন। টুকরোগুলো কুড়িয়ে হাঁক দিলেন, ষষ্ঠী। এগুলো আমার ল্যাবে রেখে আয় তো বাবা। কাগজে মুড়ে যত্ন করে রাখবি কিন্তু।
কৃতান্ত হালদারমশাইয়ের জোরালো ফোঁস শব্দ কানে এল। বললেন, এমন হাসছিলেন যে আমরা বড্ড ভয় পেয়ে গিয়েছিলুম। কেন হাসছিলেন কর্নেলস্যার?
কর্নেল নিভন্ত চুরুট লাইটার জ্বেলে ধরিয়ে বললেন, ডিমটা নিছক প্লাস্টিকে তৈরি।
ষষ্ঠীচরণ কাগজে মুড়ে খোলসগুলো নিয়ে গেল। ভেতরে কিছু নেই। ফাপা একটা নিচ্ছিদ্র ডিম্বাকৃতি খোল মাত্র এবং কর্নেল তো বলেই দিলেন, ওটা প্লাস্টিক তৈরি।
এবার কৃতান্তবাবু নড়ে বসলেন। বললেন, হ হ। আমারও হেই ডাউট হইছিল। সাহস কইর্যা কইতে পারি নাই। হ–ঠিক কইছেন। প্লাস্টিক। সঙ্গে সঙ্গে আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, যাদুগোপালবাবুর প্লাস্টিক গুডস তৈরির কারখানা আছে না?
আছে। -কর্নেল চুরুটের ধোঁয়ার মধ্যে বললেন, যাই হোক, তবু আমিই যে ঠিক বলছি, তারও প্রমাণ নেই–যতক্ষণ না ল্যাবরেটরিতে জিনিসটা পরীক্ষা করা হচ্ছে। ডার্লিং! তুমি বরং তোমার কাজটা আজই সেরে ফ্যালো। ওই তিন বিজ্ঞানীর কাছে গিয়ে ওঁদের মতামত জেনে নাও। দেরি কোরো না। বেরিয়ে পড়ো।
সন্ধ্যা ছ-টা নাগাদ কর্নেলের ফ্ল্যাটে হাজির হলুম, তখন আমি ক্লান্ত, ক্ষুব্ধ। ধপাস করে ওঁর যাদুঘর-সদৃশ ড্রয়িংরুমের ভেতর সোফায় বসে পড়ে সকালের কৃতান্তবাবুর গলায় বললুম, কফি! শুধু কফি!
.
দেখলুম, প্রাইভেট গোয়েন্দা হালদারমশাইও বসে রয়েছেন। মুখটা গম্ভীর। কর্নেল ষষ্ঠীকে ডেকে ঝটপট কফির ফরমাশ করে আমার দিকে ঘুরলেন। মুখে মিটিমিটি হাসি। বললেন, খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে তোমাকে।
-হুঁ ভীষণ ক্লান্ত।
এবং ক্ষুব্ধ দেখাচ্ছে।
–হ্যাঁ। আমি ক্ষুব্ধ খামোখা ছুটোছুটি করে
তিন বিজ্ঞানীকে খুঁজে পাওনি। -বৃদ্ধ গোয়েন্দাপ্রবর সহাস্যে বললেন, পাওনি, কারণ সত্যি সত্যি ও নামে কোনো বিজ্ঞানী নেই।
খাপ্পা হয়ে বললুম, এমনকী ঠিকানাও ভুয়ো।
কর্নেল তার সাদা দাড়িতে আঙুলের চিরুনিতে আঁচড় কাটতে কাটতে বললেন, অবশ্য ব্যারাকপুর থানার সাব-ইস্পেক্টর বারীন মণ্ডল
ওঁর কথার ওপর বললুম, ওই থানাতেও গিয়েছিলুম। বারীনবাবুর ইন্টারভিউ নিয়েছি। উনি জগনের কাছে খবর পেয়ে ব্যাপারটা দেখতে গিয়েছিলেন মাত্র। অফিসিয়াল তদন্তের প্রশ্নই ওঠে না। বললেন, হ্যাঁ–একটা প্রকাণ্ড ডিম দেখেছেন বটে। তবে ঘোড়াটার পেটের তলায় নয়। একটু তফাতে–গ্যারাজের কোনায়, ঘোড়াটার মুখের দিকে।
এবং ঘোড়াটা ঝিমোচ্ছিল।
