কর্নেল সেই তামার ফলক সাফ করতে করতে বললেন, প্রত্যেকটি খুনের পেছনে মোটিভ বা উদ্দেশ্য থাকে। জগনের মোটিভ কী?
জানা যাবে। অশ্বডিম্ব-রহস্য ভেদ করতে পারলেই জানা যাবে।
কর্নেল হাসলেন, একটু অপেক্ষা করো। অশ্বডিম্ব এসে পৌঁছোবে।
ভীষণ চমকে গিয়ে বললুম, তার মানে? ঘোড়ার ডিমের কি ঠ্যাং গজিয়েছে–নাকি ডিম ফুটে ঘোড়ার বাচ্চা বেরিয়েছে যে আপনার ফ্ল্যাটে এসে হাজির হবে?
এই সময় কলিংবেল বাজল। কর্নেল চাপা গলায় বললেন, সম্ভবত ঘোড়ার ডিমটি এসে গেল।
ষষ্ঠী দরজা খুলে দিচ্ছে শুনতে পেলুম। তারপর দেখলুম, ঘোড়ার ডিম-টিম নয়–প্রাইভেট গোয়েন্দা কে. কে. হালদারমশাই সহাস্যে ঢুকে গুড মর্নিং জানালেন। তার কাঁধে আজ একটা–প্রায় সিমেন্টের বস্তার সাইজ কাপড়ের ব্যাগ। ধপাস করে সোফায় বসে বললেন, কফি! কফি দরকার! বাপস!
কর্নেল ষষ্ঠীকে ডেকে আরেক কাপ কফি আনতে বলে মুচকি হাসলেন, কী ডার্লিং! কী বুঝছ?
বললুম, বুঝছি, আপনার নাকি একটা তৃতীয় চোখ থাকার কথা শোনা যায়, সেটা নিছক গুজব।
-কেন, কেন?
–আপনি বললেন অশ্বডিম্বের আগমন ঘটছে। কিন্তু এলেন আমাদের হালদারমশাই।
গোয়েন্দা কৃতান্ত হালদার খি খি করে হেসে পূর্ববঙ্গীয় ভাষায় বললেন, কী কাণ্ড! হ–আমি আইছি, অশ্বডিম্ব আইছে। বড্ড টায়ার্ড। জয়ন্তবাবু, খুইল্যা দ্যাহেন।
বলে প্রকাণ্ড ঝোলাটি দুহাতে তুলে আমার দুই উরুর ওপর স্থাপন করলেন। চমকে উঠে ঝোলা খুলতেই আমার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। প্রকাণ্ড সাদা একটা ডিম! অন্তত হাত দেড়েক উঁচু তো বটেই। হালদারমশাই খি খি করে হাসতে থাকলেন। কর্নেলও অট্টহাস্য করলেন। আমি হতবাক। তাজ্জব একেবারে।
ডিমটি শোলার মতো হালকা। হাওয়াঠাসা প্রকাণ্ড ফুটবল বললেও চলে। যদিও এটা ঝকঝকে সাদা এবং নিতান্তই ডিম। কারণ এর গড়ন ডিমের মতো। কর্নেল চোখ নাচিয়ে বললেন, কি ডার্লিং, তাহলে ঘোড়ার ডিম যে সত্যি সত্যিই আছে, হাতেনাতে তার প্রমাণ পেলে তো?
ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বললুম, কিন্তু এটা হালদারমশাই পেলেন কোথায়?–বলেই নড়ে বসলুম। কৃতান্তবাবুর দিকে ঘুরে দেখি, উনি মিটিমিটি হাসছেন। বললুম, তাহলে কি কাল সন্ধ্যায় যাদুগোপালবাবুর বাড়ি থেকে আপনিই-
আমার কথা কেড়ে কৃতান্তবাবু বললেন, আবার কে? আমিই গঙ্গার দিক থেকে পাঁচিল বেয়ে উঠে বাড়ির ভেতর ঢুকেছিলুম। এই দেখুন, মাটি খোঁড়ার জন্য খুরপি নিয়ে গিয়েছিলুম।
উনি জ্যাকেটের ভেতর পকেট থেকে রিভলবার বের করার ভঙ্গিতে একটা হাতুড়ি সাইজ খুরপি বের করে কফি টেবিলে রাখলেন। খুরপিতে একটু-আধটু মাটিও লেগে আছে। বললুম, বুঝলুম। কিন্তু আপনি জানলেন কি করে যে কোথায় এটা পোঁতা আছে?
খি খি করে অভ্যাসমতো হাসলেন প্রাইভেট গোয়েন্দা কে. কে. হালদার, মশায়! ছত্তিরিশ বৎসর যাবৎ পুলিশে চাকরি করছি। গত সনে রিটায়ার কইর্যা ডিটেকটিভ এজেন্সি খুলছি। ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চে কাম করছি নয় বৎসর। তো হইল গিয়া
কথা কেড়ে বিরক্ত হয়ে বললুম, আহা! সে তো সবই জানি। কিন্তু ডিমটা ওখানে পোঁতা আছে, কী করে টের পেলেন?
হালদারমশাই এক চুমুকে কফি সাবাড় করে চাপা স্বরে বললেন, যাদুগোপালবাবুর বাড়ির পেছনে গঙ্গা। গঙ্গার ধারে জঙ্গলে ভর্তি। তো গতকাল সকালে এখান থেকে বেরিয়ে গেলুম যখন, তখন মাথায় ওই একটাই চিন্তা, ঘোড়ার ডিম তো একটা অসম্ভব ব্যাপার। এদিকে যাদুগোপালবাবু এখানে কর্নেলের কাছে কথা বলছেন। এই সুযোগে জিনিসটা দেখে আসি আগে। কিন্তু গিয়ে দেখি গেট বন্ধ। কোনো পুলিশ-টুলিশ কিছু নেই। ডাকাডাকি করলে একটা লোক–মানে ওই জগন ব্যাটাচ্ছেলে, আমাকে ভাগিয়ে দিল। তখন গলিরাস্তায় ঘুরে বাড়ির পেছনে চলে গেলুম। ডাইনে ঘুরে ঝোপজঙ্গলে ঢুকে পড়লুম। তারপর পাঁচিলের কাছে একটা ঝাকড়া গাছে উঠে বসলুম।
কর্নেল ফোড়ন কাটলেন, পুলিশের চাকরিতে গাছে চড়ার ট্রেনিংও নিতে হয়। আসামী ধরতে পাঁচিলও ডিঙোতে হয়।
হয়!-কৃতান্তবাবু উৎসাহে সায় দিলেন, কতবার কত গাছে চড়েছি। কত পেল্লায় পাঁচিল ডিঙিয়েছি!
বিরক্ত হয়ে বললুম, আহা, তারপর কী হল বলুন।
কৃতান্তবাবু খিক করে হেসে বললেন, পাঁচিলের ধারে গাছের ডালে হনুমানের মতো বসে আছি-ডালপালা আর পাতার আড়ালে লুকিয়েই বসে আছি। হঠাৎ দেখি, সেই ব্যাটাচ্ছেলে জলে বাগানের ভেতর দিয়ে এই জিনিসটা চুপিচুপি নিয়ে আসছে। এনে করল কি, ঝোপের ভেতর একটা ছোট্ট শাবল দিয়ে মাটি খুঁড়তে লাগল। গর্ত করে জিনিসটা–মানে এই ডিমটা পুঁতে মাটি ঢাকা দিল। দিয়ে একটু তফাত থেকে ঘাসের চাপড়া এনে বসিয়ে জায়গাটা স্বাভাবিক করে দিল। তারপর চলে গেল। আমি চিন্তায় পড়ে গেলুম। এ তো ভারি রহস্যময় ব্যাপার। কিন্তু এখন যদি ভেতরে ঢুকি, তাহলে ওর নজরে পড়ার চান্স আছে। কী দরকার ঝুঁকি নিয়ে? তাই সন্ধ্যাবেলা এসে ডিমটা চুরি করার মতলব করলুম।
এ পর্যন্ত শুনেই হাসতে হাসতে বললুম, বুঝেছি। কাল সন্ধেবেলা তাহলে আপনিই এটা চুরি করে এনেছেন। কী কাণ্ড!
কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বললেন, মনে পড়ছে তো জয়ন্ত? হালদারমশাই কিন্তু জগনের ফোন করার আগেই এঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। উনি ডিম চুরি যাওয়ার কথা শুনে যাননি।
