-আমার সময় নেই। যেতে বল।
যাদুগোপাল বললেন, দাদা! ইনি বিখ্যাত লোক–কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। তুমি তো কাগজ পড়ে এঁর কত গল্প করতে!
–এখন না। পরে আসতে বল। আমি ব্যস্ত।
যাদুগোপাল হতাশ মুখে কর্নেলের দিকে ঘুরেছেন, ঠিক সেইসময় কেউ হেঁড়ে গলায় পেঁচিয়ে উঠল, চোর! চোর! পাকড়া! অমনি জগন কিরকম যেন হয়ে গেল। যাদুগোপাল বারান্দার রেলিঙে ঝুঁকে চাঁচাতে থাকলেন, পাকড়া!
কর্নেল ও আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছি। দুজনেই বারান্দার রেলিঙে যাদুগোপালের পাশে গিয়ে ঝুঁকে পড়লুম, নিচে কী ঘটছে দেখার জন্যই। কিন্তু ঘটনাটা ঘটছে পশ্চিম দিকে–যেদিকে গঙ্গা। তাই যাদুগোপালের টর্চের আলোয় কিছু দেখা যাচ্ছে না। জগন আমাদের পাশ কাটিয়ে দৌড়ে চলে গেল সিঁড়ির দিকে। কিছুক্ষণ পরেই জগনের চিৎকার ভেসে এল, ডিমচোর! ডিমচোর!
যাদুগোপাল ব্যস্তভাবে বলে উঠলেন, চলুন কর্নেল! শিগগির চলুন। জগন ডিমচোরকে ধরেছে মনে হচ্ছে।
বলে কর্নেলের হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে চললেন।
নিচে গিয়ে শুনি চ্যাঁচামেচিটা উত্তর-পশ্চিম কোণ থেকে ভেসে আসছে। সেদিকে ছুটে গেলুম তিনজনে। টর্চের আলোও দেখা যাচ্ছে সেখানে। ঝোপঝাড় লতাকুঞ্জে জায়গাটা একেবারে ঠাসা জঙ্গল। সেখানে পৌঁছে দেখলুম, সদ্য একটা গর্ত খোঁড়া হয়েছে। যাদুগোপাল বললেন, কি ঠাকুর, ও কিসের গর্ত?
এই লোকটা তাহলে হরুঠাকুর। সে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ঘোড়ার ডিমের গর্ত, ছোটোবাবু। সাইজটা দেখুন না গর্তের। চোর আজ সকালেই ডিমটা চুরি করে এনে এখানে পুঁতে রেখেছিল। এখন সুযোগ বুঝে সেটা নিয়ে গেছে।
কর্নেল বললেন, তুমি কীভাবে টের পেলে ঠাকুরমশাই?
হরু ঠাকুর বলল, আমার কান খুব খাড়া স্যার। রাতবিরেতে পাতাটি ঝরলেও শুনতে পাই। কিচেন থেকে খসখস শব্দ শুনতে পেয়েছিলুম। ওই দেখছেন কিচেন। জানালা দিয়ে টর্চের আলো ফেলে দেখি, কে এখানে কী একটা করছে, অমনি দৌড়ে এলুম। লোকটা ঘোড়ার ডিমটা নিয়ে পালিয়ে গেল।
–তাকে দেখেছ তাহলে? কেমন চেহারা?
আজ্ঞে, আবছা দেখেছি। যা জঙ্গল ওই দেখুন না জুতোর ছাপ।
লোকটা বুদ্ধিমান। গুঁড়ো এবং চাপ চাপ নরম মাটিতে জুতোর সোলের ছাপ আছে বটে। কর্নেল জিজ্ঞেস করলেন, কী বয়সি লোক মনে হল ঠাকুরমশাই?
হরুঠাকুর একটু ভেবে বলল, তা আমার বয়সিই মনে হল। হা-নাকটা বেজায় লম্বা স্যার।
-হ্যাঁ, তোমার বয়স কত হল, ঠাকুরমশাই?
–তা স্যার, ষাট-বাষট্টি হয়ে এল প্রায়।
এই সময় জগন এসে পড়ল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, পাঁচিল ডিঙিয়ে ঢুকেছিল চোর। গঙ্গার ঘাটের দরজা খুলে পালিয়ে গেছে।
কর্নেল ঝুঁকে সদ্য খোঁড়া গর্তটা দেখছিলেন। আমিও দেখতে থাকলুম। হুঁ ঘোড়ার ডিমটার যা সাইজ বলেছিলেন যাদুগোপাল, সেই সাইজের গর্তই বটে।
একটু পরে কর্নেল সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বললেন চলুন যাদুগোপালবাবু! ব্যাপারটা দেখছি সত্যি রহস্যময়!
যাদুগোপাল পা বাড়িয়ে উত্তেজিতভাবে বললেন, রীতিমতো রহস্যময়। অ্যাই জগন–ঘাটের দরজায় খিল দিয়েছিস? দিসনি তো? যা-যা-খিল দিয়ে দে..চলুন কর্নেল।
হলঘরের বারান্দায় পৌঁছেছি, তখন আলো জ্বলে উঠল। লোডশেডিং বাবুদের মতিগতি বোঝ দায়। দেখেটেখে মনে হয়, কে যেন কলকাতাবাসীদের সঙ্গে মজার খেলা খেলছে। আলো-আঁধারি খেলা। হলঘরে ঢুকে কর্নেল হঠাৎ বললেন, আচ্ছা যাদুগোপালবাবু, আপনাদের প্লাস্টিক গুডসের কারবারের দেখাশোনা করার জন্য কোনো ম্যানেজার রেখেছেন নিশ্চয়?
এই প্রশ্নে যাদুগোপাল একটু অবাক হয়ে বললেন, রেখেছি। কিন্তু
কর্নেল বললেন, না–এমনি জানতে ইচ্ছে হল। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, এই ঘোড়ার ডিমের রহস্যের পেছনে অন্য কারও হাত আছে।
যাদুগোপাল চাপা স্বরে বললেন, ঠিক বলেছেন। আমারও তাই সন্দেহ। সে জন্যই দাদার সঙ্গে আপনার কথাবার্তা হওয়া দরকার। চলুন আরেকবার দাদার মুডটা ট্রাই করা যাক। চলুন। এ রহস্য ভেদ করতেই হবে।
এখন আলো জ্বলছে। আমরা টানা বারান্দা হয়ে দোতলায় প্রাণগোপালবাবুর ঘরের সামনে পৌঁছোলম। দরজা তেমনি খোলা। নিচু টেবিলে মোমটা তেমনি জ্বলছে। কিন্তু ঘরে এখন বিদ্যুতের আলো। সেই আলোয় শিউরে উঠে দেখলুম, প্রাণগোপালবাবু ইজিচেয়ারের পাশে উপুড় হয়ে পড়ে আছেন। পিঠে পাঞ্জাবি ছাপিয়ে চাপ চাপ রক্ত। যাদুগোপাল দৃশ্যটা দেখামাত্র দুহাতে মুখ ঢেকে প্রচণ্ড আর্তনাদ করে উঠলেন, দাদা!..
কর্নেলের ন্যাওটা এবং সঙ্গী হওয়ায় এযাবৎ বিস্তর খুনখারাপি আর রহস্যময় কাণ্ডকারখানা দেখেছি। কিন্তু এই অশ্বডিম্ব-রহস্য এবং প্রাণগোপালবাবুর হত্যা-রহস্যের মতো যুগল রহস্যের ঘোরপ্যাঁচ কখনও দেখিনি। মনে মনে বলছিলাম, ওহে বৃদ্ধ গোয়েন্দাপ্রবর! এবার দেখি তোমার টেকো মাথার ঘিলুর শক্তি কতখানি! এবার তোমার ঋষিসুলভ সাদা দাড়ি ছিঁড়েও কুল পাবে না!
সক্কালে আমাকে ওঁর ড্রয়িংরুমে দেখে গোয়েন্দাপ্রবর মুচকি হেসে বললেন, কী জয়ন্ত? তোমাদের দৈনিক সত্যসেবক তো এইমাত্র পড়লুম, এক জব্বর অন্তর্তদন্তের সূত্রপাত করেছ। কিন্তু তুমিও যে পুলিশের থিয়োরি মেনে জগনকে হত্যাকারী শাব্যস্ত করবে, ভাবতেও পারিনি।
ষষ্ঠীচরণ কফি দিয়ে গেল। কফিতে চুমুক দিয়ে বললুম, ঘটনাস্থলে আমিও ছিলুম। প্রাণগোপালবাবুকে যখন জীবিত দেখেছি তখন জগন সেখানে ছিল। ডিমচোরের ব্যাপারটা নিয়ে চ্যাঁচামেচি শুরু হলে আমরা নিচে গেলুম। তারপর একমাত্র জগন ছাড়া আর সবাই-মানে, যাদুগোপালবাবু আর হরুঠাকুর আমাদের সামনে উপস্থিত ছিল। জগন এল অন্তত মিনিট কুড়ি পরে। এসে বলল, চোর খুঁজতে গিয়েছিল। তারপর আমরা ওপরে গিয়ে দেখলুম প্রাণগোপালবাবু খুন হয়ে পড়ে আছেন। কাজেই জগন ছাড়া ওই সময় আর কারুর পক্ষে খুন করার সুযোগ ছিল না।
