কর্নেল বললেন, আজ সকাল থেকে আপনার দাদার মুড খারাপ বললেন। একটু বুঝিয়ে বলুন তো?
যাদুগোপাল চাপা স্বরে বললেন, বললুম না? কিছু খাননি
-না। মানে, পাগলামির নতুন কোন লক্ষণ দেখছেন কি?
হ্যাঁ, হ্যাঁ। প্রায় লাফিয়ে উঠলেন যাদুগোপাল, দেখেছেন? আপনি না বললে খেয়ালই হত না। এজন্যই আপনার শরণাপন্ন হওয়া! দাদার গলার স্বর কেমন বদলে গেছে। ভাঙা-খনখনে-কেমন যেন…., উপযুক্ত শব্দ হাতড়াচ্ছিলেন যাদুগোপাল। শেষে বললেন, মানে। মানুষ প্রচণ্ড রাগে চ্যাঁচামেচি করে শেষে ক্লান্ত হয়ে গেলে যেমন গলায় গজরাতে থাকে, ঠিক তেমনি।
–কিংবা অষ্টপ্রহর সঙ্কীর্তন করে গাইয়ের গলার অবস্থা যেমন হয়!
কর্নেলের এই মন্তব্যে আমি হো হো করে হেসে ফেললুম। যাদুগোপালও দুঃখের মধ্যে হাসবার চেষ্টা করে বললেন, তাও বলতে পারেন অবশ্য। মোট কথা, দাদার মুড ভালো নেই।
দোতলা বাড়িটাতে ঢুকেই প্রশস্ত হলঘর! দামি সোফাসেট, বুক সেলফ আর হরেক ভাস্কর্যে সাজানো। কর্নেল কিছু বলার আগেই যাদুগোপাল বললেন, সবই দাদার নিজের হাতে সাজানো। কারবারি লোক হলে কী হবে, দাদার বইপত্তর পড়ার খুব ঝোব ছিল। রুচিশীল মানুষ। এখন মাথার গন্ডগোল হলেও সবসময় বই পড়ার অভ্যাস যায়নি। গিয়েই দেখবেন আশা করি।
দেয়ালে বড়ো বড়ো সব পোর্ট্রেট ঝোলানো। কর্নেল ছবিগুলো দেখছিলেন। তখন যাদুগোপাল একে একে এইগুলোর সঙ্গে কর্নেলের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন, এইটে আমার ঠাকুরদা পোপাল চৌধুরীর। নিঃসম্বল অবস্থায় বর্ধমান থেকে কলকাতায় এসেছিলেন। পুরোনো শিশিবোতল কেনার কারবার খোলেন। শেষে–তো এইটে আমার পিতৃদেব নবগোপাল চৌধুরীর ছবি। আর এটা হল আমার মাতৃদেবী ভবসুন্দরীর।
কর্নেল আরেকটি পোর্ট্রেটের দিকে আঙুল তুলে বললেন, উনি কে? বলেই কর্নেল ছবির নিচে গিয়ে ছবির তলায় নামটা পড়তে থাকলেন-
নিস্তারিণী দেবী।
জন্ম : ১৯১২ খ্রিস্টাব্দ, ১৭ জুন।
মৃত্যু : ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দ, ২০ ডিসেম্বর।
যাদুগোপাল একটু গম্ভীর হয়ে বললেন, বাবার প্রথম পক্ষের স্ত্রী। অসুখ হয়ে মারা যান।
–ওঁর সন্তানাদি ছিল না?
যাদুগোপাল কুণ্ঠিতভাবে হাসলেন একটু, পারিবারিক সব কথা তো খুঁটিয়ে বাইরের লোককে বলা যায় না। তাছাড়া দাদা আমার চেয়ে পাঁচ বছরের বড়। আমরা কখনও নিজেদের সৎ ভাই। বলে চিন্তা করিনি। তাই কাউকে সেকথা বলতেও চাইনি।
কর্নেল ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, তাহলে প্রাণগোপালবাবু আপনার সহোদর ভাই নন?
যাদুগোপাল ব্যস্তভাবে জিভ কেটে বললেন, না-না। আমরা দুই মায়ের ছেলে বটে, কিন্তু কক্ষনো ওসব ভাবিনি। আজও ভাবি না। ভাবতেও খারাপ লাগে। আমার মা, দাদাকে নিজের পেটের ছেলের মতোই মানুষ করেছিলেন। বরং আমিই যেন মায়ের কাছে সৎ ছেলে ছিলুম। যত আদর যত্ন সব দাদার প্রতি ছিল মায়ের। মরার সময়ও
ঢোক গিলে চোখ মুছলেন যাদুগোপাল। কর্নেলের ওপর আমার রাগ হল। ওসব পারিবারিক আবেগপ্রবণ জায়গায় কী দরকার ছিল নাক গলানোর?
কর্নেল নির্বিকার মুখে বললেন, বুঝেছি। চলুন, আপনার দাদার সঙ্গে আলাপ করা যাক। কীভাবে আমাকে নেন, দেখি।
যাদুগোপাল বললেন, চলুন, চলুন। দাদার মাথায় গন্ডগোল থাকলেও এমনিতে খুব ভদ্র। কথাবার্তা একটু কম বলেন এই যা। তবে আজকের ব্যাপার যা দেখছি, বুঝতে পারছি না কীভাবে আপনাকে নেবেন। শুধু একটা অনুরোধ–তেমন কিছু দেখলে যেন ওঁকে আর ঘাঁটাবেন না। নইলে ভাঙচুর শুরু করে দেবেন। সামলাতে পারব না আমরা।
ঘরের ভেতর থেকে ঘোরানো চওড়া সিঁড়ি উঠে গেছে ওপরের তলায়। লম্বা বারান্দার মুখে একটা তাগড়াই চেহারার গুফো লোককে দেখা গেল। যাদুগোপাল চাপা স্বরে তাকে বললেন, কি রে জগন? বড়োবাবুর কী অবস্থা?
এই তাহলে জগন। সে গম্ভীর মুখে তেমনি চাপা স্বরে বলল, প্রায় একই রকম। ইজিচেয়ারে বসে বই পড়ছেন। টেবিলে খাবার ঢাকা দিয়ে রাখতে বললেন শুধু। মনে হচ্ছে, খিদে পেয়েছে তাহলে। যাই, হরু ঠাকুরকে বলি গে সকাল-সকাল খাবার পাঠিয়ে দিতে।
সবে জগন ঘুরে পা বাড়িয়েছে হঠাৎ আলো নিভে গেল বাড়ির। যাদুগোপাল ব্যস্ত হয়ে বললেন, ওই যাঃ। লোডশেডিং-এর আর সময় ছিল না! ও জগন, বড়োবাবুর ঘরে মোম জ্বেলে দিয়ে আয় এক্ষুনি। নইলে হুলস্থুলু বাধাবেন।
বলে জগনের হাতে টর্চটা দিলেন। জগন টর্চ জ্বেলে টানা লম্বা বারান্দা ধরে হন্তদন্ত এগিয়ে গেল। সেই সময় ওদিক থেকে খনখনে গলায় কার চ্যাঁচামেচি শোনা গেল, অ্যাই জগনা! তারপর দুমদাম শব্দ ভেসে এল। যাদুগোপাল বললেন, দেখলেন? শুনলেন তো কর্নেল? জগনটা এত বোকা। ওকে সবসময় কাছাকাছি থাকতে বলি এজন্যই।
টানা বারান্দার শেষ প্রান্তে উত্তর-পূর্ব কোনার ঘরের দরজার সামনে পৌঁছে দেখলুম, জগন একটা নিচু টেবিলে মোমটা ইতিমধ্যে জ্বেলে দিয়েছে। উত্তরের জানালার কাছে আমাদের দিকে পেছন ফিরে ইজিচেয়ারে এক ভদ্রলোক হেলান দিয়ে বসে আছেন। তাঁর মাথায় একরাশ সাদাকালো বড়ো বড়ো চুল। পাশ দিয়ে দেখা যাচ্ছে, ওঁর দুহাতে ধরা একটা খোলা বই। জগন মোমটা আরও একটু সরিয়ে এনে বলল, এবার পড়তে পারছেন তো বড়োবাবু?
খনখনে ভাঙা গলায় উনি বললেন, ঠিক আছে, তুই যা।
জগন দরজার সামনে এসে আমাদের দিকে আঙুল তুলে বলল, দুজন বাবুমশাই আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন, বড়োবাবু।
