যাদুগোপালবাবু বললেন, আমরা দুভাই। আমি ছোটো। দাদার নাম প্রাণগোপাল। গত বছর থেকে মাথার একটু গন্ডগোল হয়েছে। তবে পুরোপুরি পাগল বলা চলে না। শুধু কথাটথা কম বলেন। যদি-বা বলেন, তার মানে সবসময় বোঝা যায় না।
–আর কে আছেন বাড়িতে?
আমরা দুভাই বিয়ে করিনি–চিরকুমার!–ম্লান হাসলেন যাদুগোপাল, দাদা বরাবর সাধু-সন্ন্যাসী টাইপ মানুষ। শিশি-বোতলের পৈতৃক ফ্যাক্টরি ছিল। ইদানীং কাচের চেয়ে প্ল্যাস্টিকের পাত্রের চাহিদা বেশি। তাই প্ল্যাস্টিক গুডস তৈরির কারখানাও করেছি। গতবছর প্রচণ্ড লোকসান হবার পর দাদা প্রচণ্ড শক খেয়েই হয়তো ওইরকম হয়ে যায়। তারপর থেকে আমি একা বিজনেস দেখাশোনা করি। আর দাদা যখন বিয়ে করেনি, তখন আমিও আর ওদিকে মন দিলাম না। হাঁ, বাড়িতে আমরা দুভাই বাদে আর আছে জগন নামে একজন কাজের লোক। রান্নাবান্নার জন্য আছে হবু ঠাকুর। একজন ঠিকে-ঝি আছে।
কর্নেল চোখ খুলে বললেন, ঠিক আছে। আমি সন্ধ্যার দিকেই যাবখন। বাই দা বাই যে বিজ্ঞানীরা ডিমটি পরীক্ষা করেছিলেন, তাঁদের সঙ্গে একবার কথা বলা দরকার। আপনি তাদের নাম ঠিকানা লিখে দিন।
যাদুগোপালবাবুকে আমি একটা প্যাড এগিয়ে দিলুম। উনি তিনজন বিজ্ঞানীর নাম-ঠিকানা লিখে দিলেন। কর্নেল কাগজটা নিয়ে চোখ বুলোচ্ছেন, এমন সময় ফোন বাজল। কর্নেলের ইশারায়, আমি ফোন তুলে সাড়া দিলুম। খুব ব্যস্তভাবে কাকে জিজ্ঞেস করতে শুনলুম, হ্যালো! এটা কি ২৯-৬৩৯৫?
বললুম, হ্যাঁ কাকে চান?
-আচ্ছা, ওখানে কি যাদুগোপাল চৌধুরীমশাই আছেন?
–আছেন। আপনি কে বলছেন?
আজ্ঞে, দয়া করে ওঁকে একটু ফোনটা দিন।
যাদুগোপালবাবুকে ফোন দিয়ে বললুম, আপনার।
উনি খুব অবাক হয়ে ফোন নিয়ে বললেন, কে? জগন? কী হয়েছে?….অ্যাঁ! সে কী…কী আশ্চর্য! হতভাগা, তোকে না নজর রাখতে বলেছিলুম? খালি খাবিদাবি আর গাঁজা টেনে…! ফোন রেখে যাদুগোপলবাবু ফ্যাঁসফেঁসে গলায় বললেন, কী অদ্ভুত কাণ্ড!
কর্নেল বললেন, ডিমটা উধাও হয়েছে কি?
যাদুগোপালবাবু চমকে উঠে বললেন, টের পেয়েছেন আপনি? এজন্যই আপনার কাছে আসা। শুনেছিলুম আপনার আশ্চর্য দিব্যশক্তি আছে।
কর্নেল মাথা নেড়ে বললেন, মোটেও না চৌধুরীমশাই। নিছক অনুমান।
আমি বললুম, আপনার জগনবাবুর কথা আমিও স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলুম। খুব জোরে চেঁচিয়ে কথা বলছিলেন। কাজেই কর্নেলেরও শুনতে পাওয়া স্বাভাবিক।
যাদুগোপালবাবু ব্যস্তভাবে উঠে দাঁড়ালেন, কর্নেল দেখছেন তো কী রহস্যময় ব্যাপার। এজন্যই তো আপনাকে এখনই যেতে অনুরোধ করছিলুম। যাই হোক, তা যখন যাবেন না, সন্ধ্যা ছটা নাগাদ আসবেন, প্লিজ।
কর্নেল বললেন, যাব।
যাদুগোপালবাবু বেরিয়ে গেলে বললুম, ব্যাপারটা কী মনে হচ্ছে কর্নেল।
কর্নেল একটু হাসলেন। -ডার্লিং! ঘোড়ার ডিম সত্যিই একটা রহস্যময় ব্যাপার। একটু আগে বললুম না, পৃথিবীতে অসম্ভব বলে কিছু না থাকাটাই অসম্ভব!
–আমার মাথায় কিছু ঢুকছে না। কিছুই বুঝতে পারছি না।
কর্নেল অট্টহাসি হেসে বললেন, অর্থাৎ তুমি ঘোড়ার ডিম বুঝেছ!..
যাদুগোপালবাবুদের বাড়িটা একেবারে গঙ্গার ধারে। মাঝখানে সেকেলে গড়নের দোতলা দালান। চারদিকে অনেকটা জায়গা ঘিরে পাঁচিল। গ্যারাজটা উত্তর-পূর্ব কোনার পাঁচিল ঘেঁসে। গেটে ঢুকেই চোখে পড়েছিল, ওই গ্যারাজে একটা কালচে রঙের ঘোড়া চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। মিটমিটে বাতি জ্বলছে সেখানে। দালান-বাড়ির বাকি তিন দিকটায় ঝোপজঙ্গল, কিছু গাছ। বুঝলুম, একসময় এগুলো ফুলফলের বাগানই ছিল। অযত্নে এখন জঙ্গুলে হয়ে গেছে।
কর্নেল প্রথমেই গ্যারাজে যেতে চাইলেন ঘোড়াটাকে দেখতে। যাদুগোপালবাবু ব্যস্তভাবে সেদিকে নিয়ে চললেন আমাদের। তার হাতে টর্চ। গ্যারাজের সামনে গিয়ে বললেন, ওই দেখুন! ঘোড়াটার পেটের তলায় ওইখানে ডিমটা ছিল। জগন, হরু ঠাকুর, কাজের মেয়ে লক্ষ্মী–প্রত্যেকে দেখেছে ডিমটাকে। তিনজন সায়েন্টিস্ট দেখেছেন। পুলিশও দেখে গেছে। আজ সকালে যখন আপনার কাছে যাব বলে বেরুচ্ছি, তখনও আমি দেখে গেছি। অথচ তারপর ডিমটা হঠাৎ উধাও। জগন বলছে, বাজারে গিয়েছিল একটা কাজে। ফিরে এসে দেখে, ডিমটা নেই।
কর্নেল আমাকে অবাক হয়ে ঘোড়াটার কাছে গেলেন এবং তার চোয়ালে হাত বুলিয়ে আদর। করলেন। ঘোড়াটা যেন ঝিমুচ্ছে। তেমনি স্থির দাঁড়িয়ে রইল। শুধু ওর কালো চামড়াটা একবার তিরতির করে কেঁপে উঠল।
যাদুগোপাল বললেন, ডিমটা চুরি যাওয়ার পর ও আগের মতো শান্ত হয়ে গেছে। এও এক রহস্য!
হুঁ-রহস্য। -কর্নেল চারদিকে চোখ বুলিয়ে বললেন, তো চলুন যাদুগোপালবাবু, আপনার দাদার সঙ্গে আলাপ করা যাক।
যাদুগোপালবাবু একটু বিব্রত হলেন যেন। বললেন, তা যাবেন তো চলুন। তবে দাদার মুডটা আজ বড্ড খারাপ দেখছি সকাল থেকে। হরু ঠাকুর ব্রেকফাস্ট দিতে গিয়েছিল। ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। দুপুরেও কিছু খেতে চাননি। জগন অনুরোধ করতে গিয়েছিল। তাকে থাপ্পড় মেরেছেন। আর আমাকে তোইদানীং কেন যেন দেখলেই খেপে ওঠেন। চ্যাঁচামেচি করে বলেন, তোর মুখদর্শন করব না।
আমি জিজ্ঞেস করলুম, কেন একথা বলেন জানতে চাননি?
খোয়াঢাকা সঙ্কীর্ণ রাস্তার দুধারে বর্মী বাঁশ, ফণিমনসা, ঝাউ, আগাছা। বাড়ির দোতলায় একটা ঘরের জানলা থেকে একটু আলো এসে পড়েছে। পা বাড়িয়ে যাদুগোপল ম্লান হেসে বললেন, বিয়ে করিনি, হয়তো তাই। দাদা আমার জন্য পাত্রী ঠিক করেছিলেন–সে বছর কয়েক আগের কথা। তখন উনি সুস্থ মানুষ। ওঁর কথা রাখিনি–এটা কিছুতেই ভুলতে পারছেন না।
