বাধা দিয়ে বললুম– পুরো ব্যাপারটা গুল?
– স্রেফ গুলই বা বলি কী করে? আগের লোক যারা জনাকতক এখনও দলে রয়েছে, সকালে তাদের প্রত্যেকের কাছে ঘটনাটা জেনেছি। সবাই ইয়েতিকে দেখেছে। বিরাট সাদা মূর্তি। দুহাত সামনে ঝুলিয়ে হেঁটে গেছে। সে-রাতে ফুটফুটে জ্যোৎস্না ছিল। দেখতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। অথচ আমার ইনটুইশন বলছে—জয়ন্ত, আমার সেই বিস্ময়কর ইনটুইশনের কথা স্মরণ করো—যা থেকে আমি আবহাওয়ায় কোনও হত্যাকাণ্ডের গন্ধ টের পাই।
ভয় পেয়ে বললুম-সে কী; আপনার মনে হচ্ছে এখানেও কোনও হত্যাকাণ্ড হবে?
—হবে, জয়ন্ত। আই জাস্ট স্মেল ইট। কিন্তু কীভাবে হবে—কে খুন করবে, কেই বা খুন হবে—কিছু জানি না। কিছু বুঝতে পারছি না। আমি নিজেকে এক অসহায় দেখছি—কহতব্য নয়।
উদ্বিগ্ন মুখে বললুম—হংসধ্বজ আর আগরওয়ালের মধ্যে পার্টনারশিপের ব্যাপারে কোনও রেষারেষি নেই তো?
—কোনও প্রমাণ পাইনি। কলকাতায় আগে ওঁদের কনসার্ন সম্পর্কে খোঁজখবর স্বাভাবিক কৌতূহলবশতই নিয়ে এসেছি। দুজনে ঘনিষ্ঠ বন্ধু বললে ভুল হয়—একেবারে একাত্মা। একসঙ্গে খায় ও ঘুমোয়। দুজনেই বাবার ত্যাজ্যপুত্ৰ-ঘরপালানো দুঃসাহসী ছেলে। যা কিছু সম্পত্তি করেছে সব নিজের উদ্যমে। তাছাড়া, যা বুঝেছি—এইসব সম্পত্তি অর্জন, ওদের কাছে নেশার মতো। উদ্দেশ্যহীন। জীবনে এমন অনেক মানুষ আছে জয়ন্ত—যারা নেশার ঘোরে নানা কাজ করে বেড়ায়। টাকার মালিক হওয়াটাই তাদের সুখ নয়—সুখ বিচিত্র সব কাজে। এমন মানুষ এই দুই বন্ধু। এদের মধ্যে এমন কি ঘটতে পারে, আমি জানি না—যাতে কেউ কাউকে খুন করতে চাইবে?
আমি চুপ করে থাকলুম। বুড়োর এ স্বভাবের কথা জানি। কেউ কোনও ব্যাপারে ডাকলেই উনি তার সম্পর্কে বিশদ হালহদিশ না জেনে এগোবেন না। ইয়েতিই হোক, আর বাড়িতে ভূতের ঢিল। পড়ুক কিংবা চুরি-ডাকাতিই হোক—মক্কেলের আতিপাতি জানা চাই।
কর্নেল টুপি খুলে টাকে বাতাস লাগাচ্ছিলেন। হঠাৎ বললেন—এস জয়ন্ত, আমরা সার্ভেয়ার গ্রুপের হেড ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ করি। উনি শুনেছি ভারতের শ্রেষ্ঠ ভূতত্ত্ববিদদের অন্যতম। অনেক চড়া দামে ওকে হংসধ্বজবাবুরা কমাসের জন্য এনেছেন। কেন্দ্রীয় সরকার আজকাল এসব ব্যাপারে এক্সপার্টদের সহায়তা পাইয়ে দিচ্ছে—তাই ওঁকে পেতে অসুবিধে হয়নি। তুমিও কোথাও খনিটনির সম্ভাবনা খুঁজে বের করো না! সরকার তোমাকে সবরকম টেকনিক্যাল নো-হাউ দিয়ে সাহায্য করবে। করবে নাকি জয়ন্ত?
কথাটা বলে কর্নেল হাসতে হাসতে পা বাড়ালেন। কিন্তু হাসিটা কেমন শুকনো মনে হল।…
দুপুর সাড়ে বারোটার মধ্যেই হংসধ্বজ আর আগরওয়াল প্রায় একশো লোকের একটা অভিযাত্রী বাহিনী গড়ে তুললেন। অধিকাংশই ওই অঞ্চলের অধিবাসী। তারা যেমন দুঃসাহসী, তেমনি গোঁয়ার মানুষ। অস্ত্রশস্ত্র প্রত্যেকের হাতেই রয়েছে। বন্দুকও মোট পাঁচটি। আমি ও কর্নেল সঙ্গে এনেছিলুম শিকারের রাইফেল। হংসধ্বজ ও আগরওয়ালেরও শিকারের রাইফেল আছে। হেড সার্ভেয়ার মিঃ পরেশ পুরকায়স্থের নিজস্ব রাইফেল রয়েছে। তাছাড়া আমাদের প্রত্যেকের একটা করে রিভলবারও আছে। কাজেই আয়োজন খুব সাংঘাতিক হল। দেখলুম স্থানীয় লোকেরা ঢাকও নিয়েছে কয়েকটা। শিঙাও আছে গোটা দুই।
এছাড়া কয়েক টিন পেট্রোল আর ফার্স্ট এডের সরঞ্জামও নেওয়া হল। সার্ভেয়ার গ্রুপের সঙ্গে একজন ডাক্তারও ছিলেন এখানে। ব্রজবিলাস বর্মন আমাদের লোক। তিনি বড় ভীত মনে হল। মুখ পাংশু। ভিড়ের ভিতর ঢুকে অনিচ্ছায় পা বাড়ালেন।
রীতিমতো ইয়েতি অভিযান। সব খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে হাঁটছিলাম। জব্বর রকমের রিপোর্টাজ লিখতে হবে কাগজের জন্যে।
একঘন্টা কষ্টকর যাত্রার পর প্রায় দুর্গম এক পাহাড়ের গুহার সামনে আমরা পৌঁছলুম। কর্নেলকে দেখলুম, যেন মোটেও নেতৃত্ব নিতে রাজি নন। সব আগরওয়ালের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। অনেক জল্পনার পর ব্যুহ সাজানো হল কয়েকটা। গুহামুখ থেকে তিরিশ গজ দূরে একটা ঝোপের আড়ালে হংসধ্বজের নেতৃত্বে একদল ওত পেতে বসল। দুটো দল যথাক্রমে হেড সার্ভেয়ার পরেশবাবু ও ভীতু ডাক্তারের নেতৃত্বে ডাইনে ও বাঁয়ে পাথরের আড়ালে বসল। চতুর্থ দল গুহামুখের উপরে পাহাড়ে গেল। সেখানে গাছ ও পাথরের আড়ালে তারাও বসল। চতুর্থ দল গুহামুখের উপরে পাহাড়ে গেল। সেখানে গাছ ও পাথরের আড়ালে তারাও বসল। তাদের নেতাকে আমি চিনি না—মনে হল সার্ভেয়াদের কেউ। পঞ্চম দলে আমি ও কর্নেল–সঙ্গে কুড়িজন উপজাতীয় কুলিকামিন। আমরা চলে গেলুম পাহাড়ের পিছনের দিকে–একটা ফাটলে গিয়ে ঠাসাঠাসি বসে পড়লুম। ফাটলটা ভূমিকম্পের ফলে হয়েছে। আন্দাজ হাত ছয়েক চওড়া। অনেক ছোট বড় পাথরে ভর্তি। ইয়েতি তাড়া করলে নির্ঘাত মারা পড়তে হবে। এখানে বসার কারণ, গুহার অন্যমুখে ইয়েতি বেরোলে আমরা তাকে আক্রমণ করব। কিন্তু তাকে প্রাণে মারা চলবে না। ঠ্যাং খোঁড়া করে কাবু করতে হবে, অর্থাৎ জ্যান্ত ধরারই প্ল্যান করা হয়েছে।
কথা হয়েছে, গুহার মুখে শুকনো লকড়ি ঠেসে দিয়ে পেট্রোল ছড়িয়ে আগুন ধরানো হবে। ধোঁয়া দেখলেই আমরা প্রত্যেকটি দল সতর্ক হব।
হঠাৎ দেখি কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। তারপর দলের একজনকে ডেকে হিন্দিতে বললেন—নাতানুক! তুমি ওদের লিডার হও। আমি আর এই জয়ন্তবাবু নীচের দিকে গিয়ে বসি। না না—আমরা দুজনই যথেষ্ট। মনে রেখো, তুমিই লিডার নাতানুক?
