থাকে। –ভদ্রলোক রূষ্টভাবে বললেন, কারণ তেলের খরচ প্রচণ্ড বেড়েছে। একটা গাড়ি রাখার খরচ আপনি নিশ্চয় জানেন। কলকাতার রাস্তাঘাটের যা অবস্থা, হরদম পার্টস বদলাতে হয়। সেই সব খরচ হিসেব করে দেখেছিলাম, এর চেয়ে ঘোড়া পোর খরচ অনেক কম। ছোটাতে পারলে ছোটেও গাড়ির মত জোরে।
কথা হচ্ছিল কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের ড্রইংরুমে বসে। কর্নেল বুরুশ দিয়ে একটা তামার ফলক ঘষে সাফ করছিলেন। সম্প্রতি লোহাগড়ার জঙ্গলে কুড়িয়ে পেয়েছেন ফলকটি। অজানা হরফে কি সব লেখা আছে ওতে। মন্তব্য করলেন, গাড়ির ইঞ্জিনের সঙ্গে হর্সপাওয়ার অর্থাৎ অশ্বশক্তি কথাটার যোগ আছে, হালদারমশাই। আধুনিক যুগেও গতিশীল কোনও যন্ত্রের গতিশক্তি বেঝাতে হর্সপাওয়ার কথা চালু।
কৃতান্তবাবু হাসি চেপে বললেন, জানি। কিন্তু ইনি যা বলছেন তাতে মনে হচ্ছে, কবে শুনব মোটরগাড়িও ডিম পেড়েছে।
পাড়লেও অবাক হবার কিছু নেই। পৃথিবীতে অসম্ভব বলে কিছু থাকাটাই অসম্ভব।
কর্নেলের কথায় কৃতান্তবাবু খুব অবাক হয়ে গেলেন। বললেন, তাহলে আপনি বলছেন ঘোড়ার ডিম কথাটা সত্যি?
কর্নেল কোনো জবাব দিলেন না আর। আমি বললুম, ইনি এমন করে বলছেন যখন, তখন হয়তো সত্যি।
ভদ্রলোক জোর গলায় বলে উঠলেন, জলজ্যান্ত সত্যি। সত্যি বলেই তো ছুটে এসেছি কর্নেল সায়েবের কাছে। …
ভদ্রলোকের বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। পরনে ধোপদুরস্ত সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি। মোটাসোটা নাদুসনুদুস গড়ন। চাঁছাছোলা মুখ। আঙুলে অনেকগুলো দামি পাথরবসানো আংটি। কারবারি বড়োলোক বলেই মনে হয়। নাম যদুগোপাল চৌধুরী। থাকেন ব্যারাকপুর এলাকায়।
তিনি হন্তদন্ত ঘরে ঢুকেই নিজের নামধাম বলে এক নিশ্বাসে তার গ্যারাজের অশ্বডিম্বটির। বিবরণ দিয়েছেন। আমার বা কৃতান্তবাবুর উপস্থিতি গ্রাহ্য করেননি। কাজেই আমার মনে হয়েছে, ভদ্রলোক কর্নেলের কীর্তিকলাপ ভালোই জানেন। তাই তার সাহায্য নিতে ছুটে এসেছেন।
কৃতান্তবাবু অর্থাৎ প্রাইভেট গোয়েন্দা কে. কে. হালদারকে এতক্ষণে বেশ উত্তেজিত দেখাচ্ছিল। বুঝতে পারছিলাম কেসটি হাতে পেলে উনি কোমর বেঁধে রহস্যভেদে নামতে রাজি। কর্নেলের। কথাটা শোনার পর বেশ গম্ভীর হয়ে গোঁফের ডগা পাকাচ্ছেন আর আড়চোখে যাদুগোপালবাবুকে দেখছেন।
কর্নেল তামার ফলকটি টেবিলের ড্রয়ারে রেখে সোফায় এসে বসলেন। ষষ্ঠীচরণ ট্রেতে করে কফি দিয়ে গেল। কফিতে চুমুক দিয়ে কর্নেল মুচকি হেসে বললেন, কি হালদারমশাই, অশ্বডিম্ব-রহস্যের কেসটা নেবেন নাকি?
কৃতান্তবাবু কিছু বলার আগে যাদুগোপালবাবু বললেন, সায়েব আমি কিন্তু আপনার কাছেই এসেছি।
কৃতান্তবাবু আরও গম্ভীর হয়ে গেলেন। কর্নেল বললেন, ইনি প্রখ্যাত প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে, কে, হালদার। আগে জাঁদরেল পুলিশ অফিসার ছিলেন। রিটায়ার করে প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সি খুলেছেন। আমার মনে হয়, এসব রহস্যের মীমাংসা উনিই ভালো করতে পারবেন।
কী মুশকিল!–যাদুগোপালবাবু ক্ষুব্ধভাবে বললেন রহস্যটা তো কোনও চুরি-ডাকাতি বা খুনখারাপি সংক্রান্ত নয়। নেহাত সায়েন্টিফিক রহস্য। আপনি শুনেছি, সায়েন্স-টায়েন্সেরও চর্চা করেন। তাই
কথা কেড়ে ক্রুদ্ধ কৃতান্তবাবু বললেন, তা আপনি সায়েন্টিস্টদের কাছেই যান না কেন?
গিয়েছিলুম তো-যাদুগোপালবাবু বললেন, কেউ কোনও কিনারা করতে পারেননি।
কর্নেল বললেন, ডিমটি কত বড়ো?
পেল্লায়। –যাদুগোপালবাবু বললেন, তারপর সেটির সাইজ দেখালেন হাতের মাপে। মনে হল, ডিমটি অন্তত হাত দেড়েক উঁচু। কর্নেল বললেন, সেটি এখন আছে কোথায়?
আমার ঘোড়ার পেটের তলায়। যেন তা দিচ্ছে। -যাদুগোপালবাবু মুখে রহস্যের ভঙ্গি ফুটিয়ে বললেন, ঘোড়াটার স্বভাবও রাতারাতি বদলে গেছে। খুব হিংস্র হয়ে উঠেছে. ডিমটাকে সরাতে গেলেই ঠ্যাং ছুঁড়ছে। চিহি চিহি করে চাঁচ্যাচ্ছে।
–তাহলে সায়েন্টিস্টরা পরীক্ষা করলেন কীভাবে?
একটু দূর থেকে কি সব হাবিজাবি মেশিনের নল ডিমটার গায়ে ঠেকিয়ে পরীক্ষা করলেন। তারপর বললেন, কিছু বোঝা যাচ্ছে না। –যাদুগোপালবাবু হতাশভাবে বললেন, এদিকে খবরটা গেছে রটে। বাড়ির গেটে রোজ হাজার হাজার লোক জড়ো হচ্ছে। পুলিশে খবর দিতে হয়েছে পর্যন্ত। আপনি দয়া করে এখনই একবার চলুন, কর্নেল।
কৃতান্তবাবু হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন। হাই তুলে বললেন, চলি কর্নেল। জয়ন্তবাবু আসি। তারপর মুচকি হেসে বেরিয়ে গেলেন।
আমি বললুম, আচ্ছা যাদুগোপালবাবু, ডিমটি কবে দেখতে পেলেন বলেননি কিন্তু।
যাদুগোপাল গুম হয়ে বললেন, গতকাল ভোরবেলা। গ্যারাজে রোজকারমতো ঘোড়াটাকে দেখতে গিয়ে অবাক হয়ে দেখি, পেটের তলায় একটা ডিম। যেই সরাতে গেছি সেটা;মুখ ঘুরিয়ে চিহিহি করে কামড়াতে এল। রাতারাতি একেবারে বদলে গেছে ঘোড়াটা। বিশেষ করে আমাকে দেখলেই চিহিহি করে দাঁত বের করছে। বুঝুন অবস্থা।
-ঘোড়াটা দেখাশোনার জন্য নিশ্চয় সহিস রেখেছেন?
–না। আমি নিজেই ওর দেখাশোনা করি। খাওয়াদাওয়া, স্নান করানো সবকিছুই। কর্নেল সাদা। দাড়িতে অভ্যাসমত আঁচড় কাটছিলেন। মাঝে মাঝে বিশাল টাকেও হাত বুলোচ্ছিলেন। চোখ দুটো বন্ধ। সেই অবস্থায় বলে উঠলেন, আচ্ছা চৌধুরীমশাই, আপনার বাড়িতে কে কে আছেন?
