জয়বর্ধন আমাদের চা-সন্দেশ খেতে পীড়াপীড়ি করছিলেন। কর্নেল খেলেন না। উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, চলি মি. রায়। পরে আবার দেখা হবে।
.
একটা সাইকেল রিকশ নিয়ে আমরা এবার থানায় গেলাম। ও সি দিলীপ ব্ৰহ্ম কর্নেলকে দেখে অবাক হয়ে হাসতে-হাসতে বললেন, কী কাণ্ড! আপনি ভীমগড়ে। আশা করি পাখি-প্রজাপতির খোঁজে আসেননি?
নাহ মি. ব্রহ্ম?
দিলীপবাবু চোখ বড়ো করে বললেন, মাই গুডনেস! রাজবাড়ির মার্ডার কেস
হাত তুলে তাকে থামিয়ে কর্নেল বললেন, আমি রাজমুকুটটা একবার দেখতে চাই মি. ব্রহ্ম।
একটু পরে দিলীপবাবু রাজমুকুটটা নিয়ে এলেন থানার মহাফেজখানা থেকে। কর্নেল সেটা দেখার পর একটু হাসলেন, মি. ব্রহ্ম, এটা নকল রাজমুকুট। সোনাটা রোলগোল্ড এবং পাথরগুলোও নকল।
বলেন কী!
হ্যাঁ। স্বর্ণকার দিয়ে পরীক্ষা করলেই বুঝতে পারবেন।
তা হলে আসলটা কাত্যায়ন হাতিয়ে নিয়েছে।
কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বললেন, নাহ। আমার থিওরি অনুসারে আসল রাজমুকুট বড়ো কুমারবাহাদুরের ঘরে আছে। এখনই গিয়ে সার্চ করুন। পেয়ে যাবেন। দেরি করবেন না। আমি এখানে অপেক্ষা করছি।
ও সি দিলীপবাবু সদলবলে বেরিয়ে গেলেন।
কর্নেলকে বললাম, আপনি সিয়োর হলেন কী করে? যদি সত্যিই আসল রাজমুকুট জয়বর্ধন রায়ের ঘরে না পাওয়া যায়?
কর্নেল হাসলেন। পাওয়া যাবে। আমার থিয়োরি, ডার্লিং!
থিয়োরিটা কী?
খুব সহজ ব্যাপার। আনন্দবর্ধন জানতেন, তার চাবি তালায় ঢুকবে না। কাজেই একা তিনি মুকুট হাতাতে যাবেন কেন? জয়বর্ধন কাল্পর কথা বললেন। সেটা কি বিশ্বাসযোগ্য? আলমারির চাবি–বিশেষ করে যার ভেতরে কিনা সিন্দুক-বেদির চাবি লুকোনো আছে, সেই চাবি জয়বর্ধন হেলাফেলায় রাখবার লোক? আসলে সে-রাতে দুই ভাই-ই গিয়েছিলেন মুকুট বের করতে। কানুঠাকুরের চেহারায় আফিমখোরের ছাপ আছে। নেশার ঘোরে ঘুমোচ্ছিলেন। ভোরবেলা নেশা কাটার পর মন্দিরে পুজো দিতে গিয়ে আনন্দবর্ধনকে পড়ে থাকতে দেখেন। উনি কিন্তু দমাস শব্দের কথা বলেননি, তুমি নিশ্চয় শুনেছ!
হ্যাঁ। উনি বললেন, পুজো দিতে গিয়ে লাশ দেখতে পান।
কিন্তু জয়বর্ধন দমাস শব্দের কথা বললেন। তখনই বুঝলাম, কী ঘটেছে। বৈমাত্রেয় ভাইকে সম্ভবত ভুলিয়ে-ভালিয়ে মুকুট দেখাতে নিয়ে এসেছিলেন। তারপর…
কর্নেলের কথার ওপর বললাম, তা হলে জয়বর্ধন খুনি শাব্যস্ত হচ্ছেন। কিন্তু ওঁকে লোহার মুগুর আনতে দেখে আনন্দবর্ধনের ভয় পাওয়ার কথা।
কর্নেল চুরুটের ধোঁয়ার মধ্যে বললেন, ভাইকে খুন করে পরে মুগুর এনে রক্ত মাখিয়ে ফেলে রেখেছিলেন।
কী করে বুঝলেন?
কা-কা-কা শব্দে।
তার মানে?
মানে খুব সোজা, জয়ন্ত। জয়বর্ধনের কাঠের পা দেখে মাথায় এল, ওটা মার্ডার ওয়েপন করা যায়। কানুঠাকুর কা-কা-কা শুনেছেন। আসলে আনন্দবর্ধন বলতে চেয়েছিলেন কাঠের পা। উনি শুনেছেন কা-কা-কা! এদিকে তিনি কা হল কাল্লু, কাত্যায়ন এবং কানু ভটচার্য। বড়ো জটিল কেস সাজিয়েছিলেন জয়বর্ধনবাবু।
তা হলে কাঠের পা খুলতে হয়েছিল জয়বর্ধনকে।
কর্নেল হাসলেন, কাঠের পা হঠাৎ খুলতে দেখেই সম্ভবত আনন্দবর্ধন ভয় পেয়েছিলেন। তাই মৃত্যুর সময় কাঠের পা কথাটাই বলতে চেয়েছিলেন।
তখনই পুলিশের দলটি এসে গেল। দিলীপ ব্ৰহ্ম ভেলভেটের একটি চৌকো বাকশো টেবিলে রাখলেন। ঢাকনা খুলতেই একটা কারুকার্যখচিত মুকুট দেখা গেল। জয়বর্ধনকে গ্রেফতার করে আনা হয়েছে। তিনি ক্রুর দৃষ্টিতে কর্নেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
কর্নেল বললেন, এই কালো ভেলভেট বাকশের মধ্যেই সোনাদানা রাখার নিয়ম। মি. ব্ৰহ্ম খালি মুকুট পেয়েছেন, বাকশো পাননি–এই দেখেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম, এটা নকল রাজমুকুট। জয়বর্ধনবাবু! একটু বোকামির জন্য ধরা পড়লেন। বুদ্ধি করে ভেলভেটের বাকশোর মধ্যে নকল মুকুট রাখলে আপনার কীর্তি ধরতে পারতাম না সম্ভবত।
জয়বর্ধন মুখ নামিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। একটু পরে তাকে হাজতে নিয়ে যাওয়া হল।
বলল, চাবিতে ভি এবং পি কেন খোদাই করা, বলুন কর্নেল?
ভি ফর ভিকটরি অর্থাৎ জয়। পি ফর প্লেজার অর্থাৎ আনন্দ। জয়বর্ধন এবং আনন্দবর্ধন।
দিলীপবাবু হাসলেন। ঘরে খাল কেটে কুমির আনার মতো জয়বর্ধনবাবু আপনাকে আনিয়েছেন!
কর্নেল বললেন, আসলে উনি আমাকে দিয়ে যাচাই করতে চেয়েছিলেন, ওঁর মোডাস অপারেন্ডিতে কোনও খুঁত আছে কি না, যাতে উনি ধরা না পড়েন।
সবাই হেসে উঠল। আমি ভাবছিলাম, ক্রাউন অর্কিডের কথা বলতে-বলতে ক্রাউন নিয়ে খুনের খবর আনা কি নেহাত আকস্মিক যোগাযোগ? স্টেশনে ফেরার পথে কথাটি তুললে আমার রহস্যভেদী বন্ধু বললেন, তোমাদের দৈনিক সত্যসেবকেই খবরটা বেরিয়েছিল। হেডিং ছিল, রাজমুকুট নিয়ে খুন। ডার্লিং! কাগজের লোক হয়েও তুমি কাগজ পড়ো না, এটা একটা বদ অভ্যাস।
২.০৮ অশ্বডিম্ব রহস্য
ঘোড়া ডিম পেড়েছে–মানে ঘোড়ার ডিম? খি খি করে হাসতে লাগলেন কৃতান্তবাবু। প্রাইভেট গোয়েন্দা কে, কে, হালদার। গণেশ অ্যাভিনিউতে যাঁর রীতিমতো হালদার ডিটেকটিভ এজেন্সি আছে।
ভদ্রলোক বিরক্ত হয়ে বললেন, এতে হাসির কী আছে? যা সত্যি তা সত্যি। গিয়ে দেখে আসুন আমার গ্যারাজে!
কৃতান্তবাবু আরও খি খি করে বললেন, আপনার গ্যারাজে মোটর গাড়ির বদলে ঘোড়া থাকে বুঝি?
