হ্যাঁ স্যার।
রাজমুকুট পুলিশের কাছে আছে?
আজ্ঞে হ্যাঁ। পুলিশের সামনে জয়বর্ধন সিন্দুক-বেদির তালা খুললেন?
আজ্ঞে। প্রথমে নিজের চাবি ঢুকিয়ে ঘোরালেন। তারপর ভাইয়ের চাবি দিয়ে।
.
কর্নেল চোখ খুলে সোজা হয়ে বসলেন। ঘটনাস্থলে না গিয়ে কিছু করার নেই। যথাসময়ে আমি ভীমগড় যাব।
কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ভীমগড় রাজপরিবারের ম্যানেজারবাবু চলে গেলেন।
পরদিন আমরা দুজনে ভীমগড়ে গেলাম। রাজবাড়ির চারদিকে গভীর গড়খাই। তার ওপর। একটা ব্রিজ আছে। গড়খাই এখন গ্রীষ্মে শুকনো৷ তিরিশ বিঘে মাটির চারদিকের পাঁচিল জেলখানার পাঁচিলের মতো উঁচু। তাই ব্রিজের ওপর দিয়ে ঢুকতে হয়। বিশাল ফটকে দরোয়ান আছে। কর্নেলের গলা থেকে বাইনোকুলার এবং ক্যামেরা ঝুলছে। হাতে প্রজাপতিধরা নেট-স্টিক, যা দেখতে গুটোনো ছাতার মতো। দরোয়ানকে দশটা টাকা দিয়ে রাজমন্দির দর্শনের ইচ্ছা প্রকাশ করলেন কর্নেল। দারোয়ানের কাছেই জানা গেল, মন্দিরে জাগ্রত দেবতার দর্শনে মাঝে-মাঝে ট্যুরিস্ট আসে। তাতে দরোয়ানের কিছু রোজগার হওয়া স্বাভাবিক।
ভেতরে ঢুকে দেখি, একটেরে বিশাল প্রাচীন মন্দির ঘন গাছপালার ভেতর মাথা তুলেছে। রাজপ্রাসাদ একটু তফাতে। তার ওদিকে একটা চৌকো পুকুর।
মন্দিরদর্শনে পুরুতঠাকুর কানুহরি ভটচাজকেও কিছু দক্ষিণা বা প্রণামি দিতে হল। কানুঠাকুর আমাদের গাইড হলেন। মন্দিরের গর্ভগৃহে ঢুকে দেখলাম, কালো বেদিতে বসানো আছে প্রকাণ্ড শিবলিঙ্গ। কেমন একটা অস্বস্তিকর পরিবেশ। কথায় কথায় কর্নেল আনন্দবর্ধন কুমারবাহাদুরের মৃত্যুর ঘটনা জেনে নিলেন। কাত্যায়নবাবুর বর্ণনায় সঙ্গে মিলে গেল। পেছন দিকে ব্যায়ামাগারটিও দেখলাম আমরা। ঘাসের ওপর মরচেধরা একটা পেল্লায় লোহার মুগুর পড়ে আছে। যে মুগুরটা পড়ে আছে সে মুগুরটা মার্ডার ওয়েপন, সেটা পুলিশ নিয়ে গেছে। কানু ভটচাজের একটা হাত জন্মাবধি পঙ্গু। অন্য হাতে কোথায় আনন্দবর্ধনের লাশ পড়েছিল দেখিয়ে দিলেন।
কর্নেল সব দেখেশুনে বেরিয়ে এলেন। কানু ভটচাজ এসে বললেন, দুধ দিয়ে সাপ পুষেছিলেন রাজপরিবার। সেই সাপ দংশেছে। ওই ম্যানেজারবাবুই মুকুট চুরির লোভে মেরেছে ছোটো কুমারবাহাদুরকে।
কর্নেল বললেন, মৃত্যুর সময় কোনও কথা বলেননি উনি?
ওই তো বললাম, কা-কা-কা বলেই হেঁচকি উঠল। তারপর সব শেষ।
আমি একটু বড়ো কুমারবাহাদুরের সঙ্গে দেখা করতে চাই।
ভাইয়ের শোক সামলাতে পারেননি। বনিবনা না থাকলেও ভাই তো বটে। কানু ভটচাজ বললেন, চলুন তো দেখি।
হলঘরে আমাদের বসিয়ে পুরুতঠাকুর ভেতরে গেলেন। একটু পরে ক্রাচে ভর দিয়ে জয়বর্ধন এলেন। কর্নেল নিজের পরিচয় দিতেই তিনি খুব ব্যস্ত হয়ে আপ্যায়নের ব্যবস্থা করতে বললেন ভটচাজমশাইকে। তারপর বললেন, আমিই কাত্যায়নকে আপনার কথা বলেছিলাম। ও সম্পূর্ণ নির্দোষ। আমার ধারণা আনন্দ মৃত্যুর সময় যন্ত্রণা প্রকাশ করেছিল। বোকা ভটচাজ শুনেছে কাকা-কা। আর পুলিশ তো সবসময় উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপাতে ওস্তাদ! কর্নেলসায়েব! আমিও চাই আনন্দের মৃত্যুরহস্যের কিনারা হোক।
কর্নেল বললেন, সিন্দুক-বেদির দুটো চাবিই তো এখন আপনার কাছে আছে?
আছে। দেখাচ্ছি। বলে জয়বর্ধন পকেট থেকে দুটো রিঙে ভরা দুটো চাবি বের করে দিলেন।
কর্নেল চাবি দুটো খুঁটিয়ে দেখে বললেন, কোনটা আপনার চাবি?
জয়বর্ধন দেখালেন। বললেন, আমার চাবি আগে তালায় ঢুকিয়ে তিনবার ঘোরাতে হবে। তবেই আনন্দের চাবি তালায় ঢুকবে। অথচ বুঝতে পারছি না কেন আনন্দ ব্যর্থ-চেষ্টা করতে গেল?
আমি বললাম, উনি আপনার চাবির নকল তৈরি করে নিতেও পারেন।
জয়বর্ধন একটু হাসলেন। সেটাই আমার সন্দেহ ছিল। কিন্তু..
কর্নেল বললেন, কিন্তু ওঁর কাছে সেই নকল চাবি পাওয়া যায়নি।
জয়বর্ধন বললেন, যে ওকে মেরেছে, সে-ই ওটা নিয়ে পালিয়ে গেছে। কানুঠাকুর দমাস করে একটা শব্দ শুনেই মন্দিরে গিয়ে ঢুকেছিল। বেগতিক দেখে মন্দিরের পেছনের দরজা দিয়ে খুনি পালিয়ে যায়। আমি গিয়ে দেখেছিলাম পেছনের দরজা খোলা ছিল।
কাত্যায়নবাবু কোথায় আছেন এখন?
ওর বাড়িতে থাকতে পারে। বেচারা লজ্জায় কাউকেও মুখ দেখাতে পারছে না। বাজার এরিয়ায় ওর বাড়ি।
কর্নেল জয়বর্ধনের চাবিটা দেখিয়ে বললেন, এতে ইংরিজি ভি লেখা আছে কেন?
বাবার খেয়াল। আমার চাবিতে ভি এবং আনন্দের চাবিতে পি লেখা আছে দেখুন।
রায়সায়েব! আমি একটা প্রশ্ন করতে চাই। সঠিক জবাব পেলে কাত্যায়নবাবুকে বাঁচানো যাবে।
জয়বর্ধন গম্ভীর হয়ে বললেন, বলুন!
আপনি কি নিশ্চিত যে, আপনার চাবিটা সে রাতে কেউ চুরি করে নিয়ে গিয়ে বেদির তালায় ঢুকিয়ে রেখে আসেনি, যাতে আনন্দবর্ধনের মুকুট চুরিতে সুবিধে হয়?
কর্নেলসায়েব? ঠিক এটা আমারও সন্দেহ। আমার চাবি শোবার ঘরের আলমারিতে লকারে ভরা ছিল। আমার স্ত্রী ঘটনার দিন কলকাতায় ছিলেন। সেই সুযোগে আমার কাজের লোক কাল্প আনন্দের প্ররোচনায় টাকার লোভে এই কাজটা করতেও পারে। আমি তো সবসময় শোবার ঘরে থাকি না।
কাল্লুর সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।
জয়বর্ধন তেতোমুখে বললেন, শয়তানটাকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছি। তবে পরে সন্দেহ হয়েছে, কা-কা-কা বলে আনন্দ কাল্লুর কথা বলতে চায়নি তো?
