আজ্ঞে হ্যাঁ। আমাকে অকারণ পুলিশ অ্যারেস্ট করে দুর্ভোগে ফেলেছে। গতকাল জেলা জজের কোর্টে জামিনে ছাড়া পেয়েছি। আমার বিরুদ্ধে কোনও প্রমাণ নেই স্যার! ছোটো কুমারবাহাদুর মরার সময় নাকি আমার নাম করে গেছেন। অথচ আমি তখন ধারেকাছে ছিলাম না।
কাত্যায়নবাবু বললেন, আমাকে বাঁচান স্যার! কাগজে আপনার কত কীর্তিকলাপ পড়েছি। একমাত্র আপনিই আমাকে বাঁচাতে পারবেন।
আপনি আগে কফি খেয়ে চাঙ্গা হোন। তারপর বলুন কী হয়েছে।
কর্নেলের হাঁকে ষষ্ঠীচরণ ঝটপট কফি তৈরি করে আনল। কাত্যায়নবাবু কফিটা ফুঁ দিয়ে তাড়াতাড়ি শেষ করে ফেললেন। তারপর রুমালে মুখের ঘাম মুছে ঘটনাটি শোনালেন। সংক্ষেপে তা হল এই :
ভীমগড় এস্টেটের রাজা খেতাবধারী হর্ষবর্ধন রায়ের দুই পুত্র জয়বর্ধন এবং আনন্দবর্ধন। তারা পরস্পর বৈমাত্রেয় ভাই। প্রায় সমবয়সি দুই সৎ ভাইয়ের মধ্যে ছোটোবেলা থেকেই খুব একটা বনিবনা ছিল না। ভারতসরকারের কাছে রাজাবাহাদুর হর্ষবর্ধন বার্ষিক ৯ লক্ষ টাকা ভাতা পেতেন। পরে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর আমলে সেই ভাতা বা প্রিভি পার্স আইন করে বন্ধ হয়। রাজাবাহাদুর মারা যান। দুই ভাইয়ের মধ্যে পারিবারিক সম্পত্তি ভাগবণ্টন করা হয়। কিন্তু বিবাদ বাধে একটা মণিমুক্তাখচিত সোনার মুকুট নিয়ে। মুকুটটি মুঘল আমলের। রাজাবাহাদুর মুকুটটি বাড়ির একাংশে শিবমন্দিরের কোনও গুপ্তস্থানে লুকিয়ে রাখেন। কারণ প্রিভি পার্স আইনের ফলে রাজভাণ্ডারের সব সোনাদানাও সরকার আটক করেছিলেন।
মৃত্যুর আগে রাজাবাহাদুর সেই গোপন সিন্দুকের একটি অদ্ভুত তালাচাবি তৈরি করিয়ে এনেছিলেন। তালাটি দুটি চাবি ছাড়া খোলা যাবে না। একটি চাবি জয়ের কাছে এবং দ্বিতীয় চাবিটি আনন্দের কাছে আছে। তার ফলে, সিন্দুক খুলে রাজমুকুট বের করতে হলে দুই ভাইকেই একসঙ্গে খুলতে যেতে হবে।
এক সপ্তাহ আগে ভোরবেলা মন্দিরের পুরোহিত কানু ভট্টাচার্য মন্দিরের ভেতর ছোটো কুমারবাহাদুর আনন্দকে পড়ে থাকতে দেখেন। তার মাথার পেছনে ভোঁতা কোনও জিনিস দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। কিন্তু তখনও তার মৃত্যু হয়নি। কানু ভটচাজ তাকে ওই অবস্থায় দেখে মুখে জল দিয়ে ওঠানোর চেষ্টা করেন। তখন নাকি আনন্দবর্ধন অতিকষ্টে উচ্চারণ করেন, কা-কা-কা-তারপর তার মৃত্যু হয়। পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পুলিশ এসে পুরোহিতের মুখে কা-কা-কা শুনে রাজপরিবারের ম্যানেজার এই কাত্যায়ন সিংহকে গ্রেফতার করেন। …
এ পর্যন্ত শোনার পর কর্নেল বললেন, কা-কা-কা বলে মারা যান আনন্দবর্ধন?
কাত্যায়নবাবু বললেন, হ্যাঁ স্যার।
কিন্তু পুরোহিতের নামের আদ্যক্ষরও তো কা?
আমি বললাম পুলিশকে। কিন্তু পুলিশের মতে, কানু ভটচাজ রোগা বেঁটে হাড়জিরজিরে লোক। বাঁ হাত জন্ম থেকে সরু এবং পাকাটি। ডান হাতেও জোর নেই। তার পক্ষে শক্তিমান যুবক আনন্দকে এক আঘাতে মেরে ফেলা সম্ভব নয়। তা ছাড়া ঘটনাস্থলে একটা লোহার মুগুর পড়ে আছে। তাতে রক্ত লেগে ছিল। কাজেই ওটা মার্ডার ওয়েপন। ওই পনেরো কিলো ওজনের মুগুর খোলা কানু ভটচাজের পক্ষে সম্ভব নয়।
বড়ো কুমারবাহাদুর জয়বর্ধনের বক্তব্য কী?
উনি স্যার খোঁড়া মানুষ। বছর দুই আগে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ওর এক পায়ের হাড় ভেঙে যায়। পা কেটে বাদ দিতে হয় কলকাতার একটা নার্সিং হোমে। তাই উনি কাঠের পায়ে কষ্টে চলাফেলা করেন। তা-ও দু-বগলে ক্রাচে ভর করে কোনওরকমে হাঁটাচলা করেন। উনি আমাকে সমর্থন করছেন। তা ছাড়া ওঁদের বাড়ি তিরিশ বিঘে জমি নিয়ে। চারদিকে পাঁচিল। বাড়ি থেকে মন্দির অন্তত সাতশো মিটার দুরে!
লোহার মুগুরটা কার?
মন্দিরের পাশে ছোট কুমারবাহাদুর আনন্দবর্ধনের ব্যায়ামের আখড়া। উনি মুগুর ভাঁজতেন। তাগড়াই মানুষ, স্যার। ওঁকে আমি ওই মুগুর তুলে মারতে পারি? কাত্যায়নবাবু নিজের হাতে দেখালেন। ফের বললেন, খুব শক্তিমান খুনির কাজ স্যার।
.
ছোটো কুমারবাহাদুরের কাছে সেই গোপন সিন্দুকের চাবি ছিল?
আজ্ঞে হ্যাঁ। ওঁর হাতের মুঠোয় ছিল। মুকুট চুরি গেছে কি না দেখার জন্য বড়ো কুমারবাহাদুরকে ডাকা হয়েছিল! ওঁর চাবি প্রথমে তালায় ঢোকাতে হবে। তারপর ঘোটর চাবি ঢোকালে তবে সিন্দুক খুলবে। সিন্দুক বলছি, বটে, তবে ওটা শিবলিঙ্গের বেদি স্যার! বেদিটাই সিন্দুকের গড়ন। কালো পাথরে তৈরি। চাবির ছিদ্র, মানে তালার ওপর সিঁদুরের গাঢ় ছাপ। তাই তালার ছিদ্র দেখা যায় না।
সিন্দুক-বেদি খোলা হল?
পুলিশের সামনে খুললেন জয়বর্ধন।
ভেতরে মুকুট ছিল?
ছিল স্যার। ওটা পুলিশ আটক করেছে। আইনের বলে নাকি পুরোনো জিনিস সরকার বাজেয়াপ্ত করতে পারেন।
হ্যাঁ। প্রিভি পার্স বাতিলের আইনেও পারেন। আবার ঐতিহাসিক বা পুরাদ্রব্য-সংক্রান্ত আইনেও সরকার এটা পারেন।
বলে কর্নেল সাদা দাড়িতে হাত বুলোতে থাকলেন। চোখ বন্ধ করে চেয়ারে হেলানও দিলেন।
বুঝলাম, প্রাজ্ঞ, রহস্যভেদী ঘটনার তথ্য থেকে থিয়োর গড়ে তুলেছেন এবার।
কাত্যায়নবাবু আবার করজোড়ে বললেন, আমি রাজপরিবারের দুশো টাকা মাইনের কর্মচারী স্যার। আমি বড় বিপদে পড়ে আপনার শরণাপন্ন হয়েছি। বড় কুমারবাহাদুরই আপনার কাছে যেতে বলেছিলেন।
কর্নেল মাথার টাকে এবার হাত বুলোচ্ছিলেন। চোখ বুজে বললেন, আনন্দবর্ধন মৃত্যুর সময় কা-কা-কা বলেছিলেন?
