চমকে উঠলাম। ইনিই তাহলে সেই মাস্টার প্রমথ বোস? কর্নেল মৃদু হেসে বললেন, প্রাণের ভয়ে ভদ্রলোক জঙ্গলের ভেতর মন্দিরে লুকিয়ে ছিলেন সেদিন থেকে। তোমার বউ খাবার দিয়ে গেছে দুবেলা। কাজেই অসুবিধা হয়নি।
হুঁ, তাহলে বাইনোকুলারে দূর থেকে মন্দিরের ওখানে ওঁকে দেখতে পেয়েই সন্দেহবশে ছুটে গিয়েছিলেন কর্নেল?
ঢং ঢং করে দেয়াল ঘড়িতে দশটা বাজল। ততক্ষণে আমাদের খাওয়াদাওয়া সারা। পোস্টমাস্টার খেলেন সামান্যই। রাতে এক গুলি আফিং পেলেই বরং সন্তুষ্ট হতেন।
কর্নেল, হেমাঙ্গবাবু, বটুকবাবু, প্রমথবাবু আর আমি বাগানের দিকের দরজা দিয়ে বেরিয়ে আগাছার জঙ্গলে গেলুম। কৃষ্ণপক্ষের চাঁদটা সবে উঁকি দিচ্ছে গাছপালার ফাঁকে। আকাশ আজ পরিষ্কার। খানিকটা যাওয়ার পর কাল রাতে দেখা পোস্টমাস্টারের বাড়ির ভিতর ঢুকে আমরা ওত পেতে বসলুম বারান্দার থামের আড়ালে। পোস্টমাস্টার উঠোনে পায়চারি শুরু করলেন। তারপর অবাক হয়ে শুনি, উনি কেত্তন গাইছেন। মরিব মরিব সখি নিশ্চয় মরিব। কানু হেন গুণনিধি কারে দিয়ে যাব…
বারকতক গেয়েছেন, হঠাৎ সদর দরজায় ঠিক বটুকবাবুর মতো এক নরদানবের আবির্ভাব ঘটল। একেবারে বটুকবাবুর প্রতিরূপ তেমনি কদমফুলি চুল, স্পোর্টিং গেঞ্জি, আঁটো প্যান্ট, হাতে বালা। শরতকালের চাঁদের আলো খুব পরিষ্কার। তাই স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলুম বেণী কুণ্ডুকে।
ঢুকেই বললেন, খুব দেখালে মাইরি ডাকবাবু। কই–আমার পার্সেল দাও?
পোস্টমাস্টার খি খি করে হাসলেন। যা ভয় পেয়েছিলাম। তোমায় তো বিশ্বাস নেই হে! শেষে ভেবে দেখলুম, আপস করে মিটিয়ে নেওয়া যাক। তাই চিঠি লিখে তোমায় ডাকলুম।
পালোয়ান বিশাল হাত বাড়িয়ে বললেন, দেরি কোরো না। মাল দাও।
পোস্টমাস্টার তেমনি ভূতুড়ে হেসে বললেন, মাইরি বেণী! তুমি আমার চোখের সামনে মিত্তিরকে ঠকাস করে মারলে আর নেতিয়ে পড়ল! উঃ! দেখে যা ভয় পেয়েছিলুম।
তুমি দেখেছিলে তাহলে? ঠিক আছে। মাল দাও!
দিচ্ছি রে বাবা, দিচ্ছি! পোস্টমাস্টার বললেন। উঃ! চোখের সামনে দৃশ্যটা দেখতে পাচ্ছি। বৃষ্টির মধ্যে মিত্তির আমার মড়া দেখতে আসছে। হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকাল। দেখি, তুমি ওর মাথায় ঠকাস করে-বাপস! দেখেই আমার বাকি নেশার ঘোর কেটে গেল। তখন দিশেহারা হয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেলুম। বাড়ি ঢোকার সাহসই হল না।
পালোয়ান দু হাতে ওকে আচমকা শূন্যে তুললেন পুতুলের মতো। পোস্টমাস্টার হাত-পা ছুঁড়তে থাকলেন। বুঝলুম স্কুলমাস্টারের লাশ তুলে নিয়ে যেতে ওই পালোয়ানের একটুও অসুবিধে হয়নি।
কিন্তু তখনই এক কাণ্ড ঘটে গেল। আচমকা বটুকবাবু লাফ মেরে উঠোনে পড়লেন। তারপর তবে রে ব্যাটা। কাল রাতে আমাকে বিছুটি না আলকুশি মেরে পালিয়েছিলে তাহলে তুমিই? বলেই জাপটে ধরলেন বেণী কুণ্ডুকে। পোস্টমাস্টার ছাড়া পেয়ে হাততালি দিয়ে কুস্তি দেখতে থাকলেন। দুই পালোয়ানে জাপটাজাপটি, মাটিতে গড়াগড়ি শুরু হল। ধুন্ধুমার সেই তুলকালামে ভূমিকম্প হচ্ছিল যেন। মাটি কাঁপছিল। কিন্তু বেশিক্ষণ এই কুস্তি দেখতে দিলেন না কর্নেল। টর্চের আলো ফেলে বললেন, খুব হয়েছে বটুকবাবু। বেণীবাবু এবার উঠে পড়ুন। বেণী কুণ্ডু হকচকিয়ে উঠে দাঁড়ালেন প্রতিপক্ষকে ছেড়ে। সঙ্গে সঙ্গে হেমাঙ্গবাবু দৌড়ে গিয়ে ওর হাতে হাতকড়া পরিয়ে দিলেন। দরজা দিয়ে একদঙ্গল কনস্টেবলও হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল। পোস্টমাস্টার তখনও খি খি করে হেসে হাততালি দিচ্ছেন। ….
২.০৭ কা-কা-কা রহস্য
সাতচল্লিশ লক্ষ বীজকণিকা! কর্নেল নীলাদ্রি সরকার নেচার পত্রিকার পাতা থেকে মুখ তুলে বললেন, কল্পনা করো, জয়ন্ত! একটা অর্কিডের ফুল শুকিয়ে যাওয়ার পর বাতাসে চারদিকে ছড়িয়ে যায় সাতচল্লিশ লক্ষ বীজ, যা সাধারণ মাইক্রোস্কোপে দেখতে পাওয়া যায় না। এমনই সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম জিনিস। তাই আমি বলে, যদি সত্যিকার কোনও রহস্য থাকে, তা আছে। প্রকৃতিজগতেই।
কর্নেলের মুখে বিস্ময় মেশানো একটা দিব্য ভাব লক্ষ করলাম। বললাম, অর্কিড নিয়ে এই সকালবেলায় মাথাখারাপ করার কারণ কী?
ও! তোমাকে আসল কথাটা বলাই হয়নি। কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুটটি ধরিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, এগুলোকে বলা হয় ক্রাউন অর্কিড। দুটো কারণ আছে এর। একটা হল, এই অর্কিডের ফুল সোনালি রঙের ক্রাউন বা রাজমুকুটের মতো দেখতে। দ্বিতীয়টা হল, এগুলো খুব উঁচু গাছের। ডগার দিকের ডালে থাকে। কাজেই ফুল ফুটলে সেই গাছটাকে মনে হয় মুকুটপরা রাজা। মাটি থেকে অন্তত চল্লিশ ফুট উঁচু হওয়া চাই গাছটা। গতবার ক্যালিফোর্নিয়ার ইয়োসোমিটি ন্যাশনাল পার্ক এলাকার রেডউড গাছের ডগায় ক্রাউন অর্কিড দেখে এসেছি। জায়গাটার নাম মারিপোসা গ্রোভ। তো আজকের কাগজে
ডোরবেল বাজল। কর্নেল বিরক্ত হয়ে হাঁকলেন, ষষ্ঠী!
একটু পরে ষষ্ঠী এক ভদ্রলোককে নিয়ে এল কর্নেলের ড্রয়িংরুমে। ভদ্রলোকের পরনে যেমন-তেমন প্যান্টশার্ট, পায়ে সাধারণ চপ্পল। বয়স চল্লিশ-বিয়াল্লিশের মধ্যে। মুখে পোড়খাওয়া ভাব। বিষণ্ণ এবং উত্তেজিত দেখাচ্ছিল তাকে। নমস্কার করে বললেন, আমিই গতরাতে আপনাকে ট্রাংকল করেছিলাম ভীমগড় থেকে।
কর্নেল বললেন, আপনিই কাত্যায়ন সিংহ?
