কর্নেল কিশোরীর দিকে তাকিয়েছিলেন। বললেন, কাকে দিয়ে আসতেন পার্সেল?
মেয়েটি বলল, কুণ্ডকাকাকে।
তার মা বললেন, ওই যে গো বেণীকুণ্ডু! সেও এক পালোয়ান। মেদিগঞ্জে তো পালোয়ানের অভাব নেই। এক পালোয়ান বেড়াচ্ছে বাড়ি বাড়ি মড়া খুঁজে–আরেক পালোয়ান বেড়াচ্ছে দেশে দেশে জুয়া খেলে। মার মার! মুড়ো ঝাঁটা মার হতচ্ছাড়াদের মুখে।
ভদ্রমহিলা সমানে তর্জনগর্জন করতে থাকলেন। কর্নেলের উঠে আসা গ্রাহ্যই করলেন না! রাস্তায় কর্নেল হন্তদন্ত হয়ে হাঁটছিলেন। কিছু জিজ্ঞেস করব ভাবলুম। কিন্তু মুখের অবস্থা দেখে সাহস হল না।
একটা খালি সাইকেল রিকশ আসছিল, সেটা দাঁড় করিয়ে কর্নেল বললেন, থানায় যাব।
হেমাঙ্গ নন্দী আমাদের দেখে উত্তেজিতভাবে বললেন, আসুন আসুন। পার্সেল থেকে কী বেরিয়েছে দেখুন।
কর্নেল জিনিসগুলো দেখতে দেখতে বললেন, হুঁ– কোকেন, মারিজুয়ানা, এল. এস. ডি। নিষিদ্ধ মাদকের কারবার দেখছি। নিরীহ সজ্জন ভদ্রলোক এবং স্কুলমাস্টার প্রমথ মিত্তিরের নামে পাঠানো হত, যাতে কেউ সন্দেহ করতে না পারে। উনিও কিছু তলিয়ে না বুঝে এবং সম্ভবত পয়সাকড়ির লোভে পার্সেল পৌঁছে দিতেন আসল প্রাপকের কাছে। এখন দেখা যাচ্ছে, এই পার্সেলটা স্কুলমাস্টারের কাছে ডেলিভারি দেওয়া হয়নি। কেন হয়নি? ধুর্ত পোস্টমাস্টারের সন্দেহ হয়ে থাকবে এবং কোনভাবে টের পেয়েও থাকবেন তাই ডেলিভারি দেননি। পিয়োনদেরও জানাননি। নিয়ে গিয়ে লুকিয়ে রেখেছিলেন।
আমি হেসে ফেললুম। নিশ্চয় আফিং আছে ভেবেছিলেন?
কর্নেল সায় দিলেন। আফিং ভাবাই স্বাভাবিক। আফিংখোর মানুষ তো। যাই হোক, পার্সেলটা না পেয়ে মূল প্রাপক খেপে উঠেছিল। সন্দেহ করেছিল মিত্তিরমশাই ওটা আত্মসাৎ করেছেন। তাই তাকে খুন করে বসল প্রতিহিংসাবশে। সুযোগও ছিল চমৎকার। পোস্টমাস্টার মারা গেছেন এবং তার লাশ শ্মশানে আছে। নেহাত আকস্মিক ঘটনা-পরম্পরায় সে একটা চমৎকার সুযোগ পেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পালটা ঘটনা পরম্পরায় সব উলটে গিয়েছিল!
হেমাঙ্গবাবু বললেন, খুনিটা তাহলে কে? তাকে ধরতে হবে এখনই।
কর্নেল দাড়ি চুলকে বললেন, এখনি ধরা কঠিন হবে। কাল রাতের ঘটনার পর সে সতর্ক হয়ে গেছে। তাকে ফাঁদ পেতে ধরতে হবে। তবে সেজন্যই আমাদের দরকার পোস্টমাস্টারমশাইকে।
উনি তো নিখোঁজ! ওঁকেও খুন করে গঙ্গায় ফেলে দিয়েছে কিনা কে জানে!
কর্নেল হাসলেন। প্রথম বোস আফিং খান বটে, ভীষণ ধূর্ত বলেই মনে হচ্ছে। দেখা যাক। বলে উনি উঠলেন।
হেমাঙ্গবাবু অস্থির হয়ে বললেন, কিন্তু খুনির নাম কী?
কর্নেল বলার আগেই আমি মুখ ফসকে বলে ফেললুম, পালোয়ান এবং জুয়াড়ি বেণীমাধব কুণ্ডু।
হেমাঙ্গবাবু লাফিয়ে উঠলেন। কর্নেল বললেন, একটু ধৈর্য ধরতে হবে। তাকে সহজে খুঁজে পাবেন না আর। আমার ফাঁদ পাতা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন হেমাঙ্গবাবু!
.
০৩.
কর্নেল গঙ্গার ধারে-ধারে হাঁটছেন আমার সঙ্গে কথা বলছেন না। বুঝলুম, হেমাঙ্গ নন্দীকে খুনির নাম বলে দিয়ে ওঁর রাগের কারণ হয়েছি। একেবারে ওস্তাদের মার শেষ মুহূর্তে দেখানো স্বভাব ওঁর। হেমাঙ্গবাবুদের তাক লাগাবেন ভেবেছিলেন। হল না।
.
বাইনোকুলারে মাঝে মাঝে পাখি দেখছিলেন কর্নেল। গঙ্গার ধারে ঘন ঝোপঝাড় গাছপালার জঙ্গল। কিছুটা এগিয়ে হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন। খানিকটা দূরে বিশাল এক বটগাছ। ডালপালা আর অসংখ্য ঝুরিতে যেন নিজেই এক দণ্ডকারণ্য হয়ে রয়েছে। তার ভেতর একটা পুরোনো মন্দির দেখতে পাচ্ছিলুম। কর্নেল বাইনোকুলারে মন্দির অথবা বটগাছে কোনও দুর্লভ পাখি দেখতে থাকলেন। তারপর কিছু বলাকওয়া নেই, আচমকা দৌড়ুতে শুরু করলেন মন্দিরটার দিকে। হকচকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলুম। ওঁর সঙ্গে দৌড়োনোর মানে হয় না। কারণ এরপর ওই দুর্লভ পাখির পেছনে সারাটা দিন ঘুরবেন। আমার অত ধকল সইবে না।
অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করার পর আমারও রাগ হল। শরৎকালের তীব্র রোদ। যদিও মাথা বাঁচানোর মতো ছায়া আছে। গরমে ঘামছি দরদর করে। আধঘণ্টা অপেক্ষা করে ফিরে চললুম বটুকবাবুর বাড়ির দিকে।
কর্নেল ফিরলেন একেবারে বেলা গড়িয়ে। হাতভর্তি লাল-হলুদ একগাদা অর্কিড। ওঁর বাড়ির ছাদের প্ল্যান্টওয়ার্ল্ডে আশ্রয় পাবে ওগুলো, তাতে সন্দেহ নেই। আমার রাগ এবং নিজের রাগ সব জল করে একগাল হেসে বললেন, ডার্লিং! আজ আমার রথ দেখা আর কলাবেচা দুই-ই হল।
তার মানে?
বৃদ্ধ ঘুঘুবর রহস্যময় হেসে বললেন, আজ রাত দশটায় দেখবে। ধৈর্য ধরো! তুমি সম্ভবত বটুকবাবুর সংসর্গে এসে তার মতোই অতি উৎসাহী এবং অধীর হয়ে পড়েছ। সাবধান।
লম্বা ঘুমে কাটিয়ে দিলুম বিকেল অব্দি। উঠে দেখলুম, কর্নেল আবার বেরিয়েছেন। বটুকবাবুর সঙ্গে শ্মশানবন্ধু ক্লাবে গেলুম আড্ডা দিতে। আজ লাশ পড়েনি। ওরা বিমর্ষ। লাশ বওয়ার জন্য নাকি ওদের কাধ সুড়সুড় করে। ক্লাব থেকে ফিরে দেখা পেলুম কর্নেলের। হেমাঙ্গ নন্দী ইউনিফর্ম পরে কোমরে রিভলবার বেঁধে হাতে বেটন নিয়ে হাজির। বুঝলুম ফাঁদ পাতা হয়েছে।
কিন্তু রোগা শুঁটকো চেহারার এক ভদ্রলোক একপাশে চুপ করে বেজার মুখে বসে আছেন। উনি কে? বটুকবাবু ঘরে ঠুকেই থমকে দাঁড়িয়ে চোখ পিটপিট করছিলেন। ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বললেন, মাস্টারমশাই! আপনি!
