বটুকবাবু জিজ্ঞেস করলেন, কী খুঁজছিল বলুন তো?
ওই তো জয়ন্ত বলল, গুপ্তধন!
বটুকবাবু বাঁ হাতের কনুইয়ের ওপরটায় হাত বুলোতে বুলোতে হেসে ফেললেন, যাঃ! প্রমথ মাস্টারের ঘরে গুপ্তধন? অসম্ভব ব্যাপার।
কর্নেল টর্চের আলো ফেলে খসে পড়া চুনবালিগুলো দেখতে দেখতে বললেন, চোর ঠিকই ধরেছিল। এখানে সদ্য নতুন পলেস্তারা করা হয়েছিল দেখছি। বটুকবাবু দেখুন তো একটা শক্ত খুন্তি বা শাবল পান নাকি। রান্নাঘরে খুঁজে দেখুন। টর্চ নিয়ে যান।
বটুকবাবু কর্নেলের টর্চ নিয়ে চলে গেলেন। তক্ষুনি ফিরে এলেন একটা কালিমাখা ছোট্ট লোহার গোঁজ নিয়ে। বুঝলুম। ওটা দিয়ে খোলা কয়লা ভাঙত। কর্নেল বললেন। বটুকবাবু জায়গাটা খুঁড়ুন।
বটুকবাবু অবাক হয়ে খুঁড়তে শুরু করলেন। নরদানবের হাতের ঘা। বাড়ি ভেঙে পড়বে মনে হচ্ছিল। গোঁজ মেরে চাপ দিচ্ছেন, আর পুরোনো ইটের টুকরো সুদ্ধ চাবড়া উঠে আসছে। একটু পরেই চাবড়ার সঙ্গে বেরিয়ে এল একটা সাদা প্যাকেটের মতো জিনিস। দেখামাত্র আমি চেঁচিয়ে উঠলুম, এ কী! এ যে দেখছি একটা পার্সেল।
কর্নেল প্যাকেটটা কুড়িয়ে বালি ঝাড়তে ঝাড়তে বললেন, হ্যাঁ, পার্সেল। রেজিস্টার্ড পার্সেল। গালার সিল ঠিকঠাক আছে। পুলিশ অফিসার হেমাঙ্গবাবুকে আমি এই পার্সেলটারই খোঁজ নিতে বলেছিলুম। আমার অনুমান ঠিক দেখছি। স্কুলমাস্টার প্রমথ মিত্তিরের নামেই এসেছে। অথচ ওঁকে ডেলিভারি না দিয়ে পোস্টমাস্টারবাবু এটা এখানে গুপ্তধনের মতো পুঁতে রেখেছিলেন।
বটুকবাবু বললেন, কী আছে ওতে? অম্বলের ওষুধ নাকি?
কর্নেল হাসলেন। ওষুধ কোম্পানির নামেই পাঠানো হয়েছিল প্রমথ মিত্তিরের কাছে। যাই হোক, আপাতত আর এখানে নয়। চলুন ফেরা যাক।
রহস্যময় পার্সেলটার ভেতর কী এমন দামি ওষুধ আছে যে প্রমথ বোস ওটা প্রথম মিত্তিরকে ডেলিভারি না দিয়ে এমন করে লুকিয়ে রেখেছিলেন তা আমার মাথায় ঢুকছিল না। পার্সেলটা খুলে দেখার কথাও বরকতক কর্নেলকে বললুম। গোয়েন্দাপ্রবরের কানেই যেন ঢুকল না। উপরন্তু সেই রাত্রেই থানায় গিয়ে হেমাঙ্গ নন্দীর কাছে জমা দিয়ে এলেন।
সকালে ব্রেকফাস্ট খাওয়ার পর কর্নেল বললেন, বটুকবাবু, মিত্তিরমশাইয়ের স্ত্রী নাকি দজ্জাল মহিলা, সবসময় হাতে খ্যাংরা ঝাঁটা নিয়ে থাকেন?
বটুকবাবু গাল চুলকে বললেন, আজ্ঞে হ্যাঁ। মেদিগঞ্জের ওই একজনকেই একটু ভয় করে চলি।
চলুন না একবার আমাকে নিয়ে!
সর্বনাশ! বটুকবাবু আঁতকে উঠলেন। সামনে আমি যাব না কর্নেলস্যার! বরং আপনাকে বাড়িটা দেখিয়ে দেব দুর থেকে। সেদিন সত্যি সত্যি প্রমথমাস্টারের লাশ পুড়ে গেল শেষ পর্যন্ত নইলে আমাকে নাকি উনি দুবেলা অভিশাপ দিচ্ছেন আর ঝাটা নিয়ে শাসাচ্ছেন।
কাজেই দূর থেকে বাড়িটা দেখিয়ে দিয়ে কেটে পড়লেন বটুকবাবু। কর্নেল দরজার কড়া নাড়তেই কে র্যা বলে ভেতর থেকে এমন চিলচাঁচানি ভেসে এল যে আমার পিলে চমকে উঠল। তারপর দরজা খুলে গেল। রণচণ্ডী বটে চেহারাখানা। কিন্তু কর্নেলের তো বটেই, আমারও সৌভাগ্য যে হাতে ঝটা নেই। দরজায় শান্ত সৌম্য ঋষিতুল্য, সাদা দাড়ি এবং মাথায় সায়েবি টুপি তাছাড়া চোহারাও সায়েবি, গলায় ঝুলন্ত ক্যামেরা আর বাইনোকুলার এমন এক মূর্তি দেখেই বোধ করি ভদ্রমহিলা থ বনে গেছেন।
কর্নেল গলায় মধু মাখিয়ে বললেন, প্রণাম দিদিভাই। অমনি মিত্তিরগিন্নি গলে জল হয়ে গেলেন।
বাইরের ঘরে খাতির করে বসালেন। কর্নেল নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, আপনার স্বামীর হত্যারহস্যের কিনারা করতেই এসেছি দিদিভাই।
মিত্তিরগিন্নি চোখ মুছতে মুছতে হুংকার দিয়ে বললেন, ওই ড্যাকরা হতচ্ছাড়া ডাকবাবুই ওকে খুন করেছে। ওকেই আপনারা ধরুন! ও পালিয়ে বেড়াচ্ছে। আপনারা না ধরতে পারেন, দেখবেন আমিই ওকে ধরব। গর্তে লুকিয়ে থাকলে চুলের ঝুঁটি ধরে বের করব। তারপর মুড়ো খ্যাংরা ঝাড়ব ওর পিঠে।
কর্নেল হাত তুলে আশ্বস্ত করে বললেন, দয়া করে আমার একটা প্রশ্নের জবাব দিন দিদিভাই।
মিত্তিরগিন্নি শান্ত হয়ে বললেন, বলুন।
আপনার স্বামীর নামে কি মাঝে মাঝে পার্সেল আসত ডাকে?
আসত। পরশুই তো একটা এসেছে। থানার বটুবাবু জানতে এসেছিলেন। ওঁকে দেখিয়েছি।
এর আগেও এসেছে তো?
হুঁউ। এসেছে।
আপনার সামনে কখনও সে-সব পার্সেল খুলেছেন মিত্তিরমশাই? কী থাকত ওতে?
ওর অম্বলের অসুখ ছিল। তারই ওষুধ।
আমার প্রশ্নের জবাব হল না দিদিভাই! আপনি কখনও দেখেছেন পার্সেল খুলতে?
মিত্তিরগিন্নি একটু অবাক হয়ে বললেন, না তো! পার্সেল আসত, শুধু তাই দেখেছি। পিয়োন দিয়ে যেত।
দরজার ফাঁকে উঁকি দিচ্ছিল একটা কিশোরী। সে বলে উঠল, কেন মা, পার্সেল এলে বাবা সেটা কুণ্ডুকাকাকে দিয়ে আসতেন না? আমি দেখেছি। জিজ্ঞেস করলে বলতেন, কুণ্ডুর ওষুধ। আমার নামে আসে।
মিত্তিরগিন্নি মাথা নাড়লেন। তা আমি বলতে পারব না বাপু! নিজের কাজ নিয়েই ব্যস্ত সবসময়। তার ওপর হাঁটুর বাত বছরভর কটকট করে কামড়াচ্ছে। যন্ত্রণায় কেঁদেকেটে অস্থির! বলেই আবার রণচণ্ডী হলেন। ওই কান্না শুনেই হতচ্ছাড়া বটুক এসে বলেছিল, লাশ কোথায়? ওর পোড়ামুখের কথাই ফলে গেল রাত না পোহাতেই! একবার ওকে পেলে হয়। ঝেটিয়ে পালোয়ানগিরি ঘুচিয়ে দেব।
