দেখা যাক। গোয়েন্দাবর দাড়িতে হাত বুলিয়ে বললেন। হু-একটা কথা। পোস্টমাস্টার বাবুর ঘরের চাবিটা কি আপনার কাছে? চাবিটা আমি চাই।
হেমাঙ্গবাবু ব্রিফকেস খুলে চাবিটা বের করে দিলেন। আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে এবং চা-টা খেয়ে উনি বিদায় নিলেন। বটুকবাবু বললেন, তাহলে বিশ্রাম করুন কর্নেল! আমি একবার ক্লাব থেকে ঘুরে আসি।
কর্নেল মুচকি হেসে বললেন, রাতে কি একটা মড়া পাবার আশা করছেন বটুকবাবু?
বটুকবাবু হো হো করে হাসলেন। পেলে খুশিই হব। তবে সে-মড়া আবার জ্যান্ত হয়ে না পালিয়ে যায়।
বটুকবাবু চলে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ কর্নেল ডাকলেন, বটুকবাবু শুনুন!
বটুকবাবু ঘুরে দাঁড়ালেন। তখন কর্নেল বললেন, আপনি তো শরীরচর্চা করেছেন একসময়। ব্যয়ামবিদ ছিলেন। কখনও কুস্তি লড়েছেন?
বটুকবাবু একটু অবাক হয়ে বললেন, হুঁউ, লড়েছি বইকি। মেদিগঞ্জেই একসময় প্রতি বছর কুস্তি প্রতিযোগিতা হত। তখন।
আপনার সঙ্গে কুস্তি লড়ার মতো পালোয়ান আছে এ তল্লাটে?
আছে বইকি। মেদিগঞ্জেই আছে।
নাম কী তার?
বেণীমাধব কুণ্ডু। বাজারের ওদিকে বাড়ি।
কী করেন ভদ্রলোক?
বটুকবাবু বাঁকা মুখ করে বললেন, বেণী একটা জুয়াড়ি। একসময় ওদের মস্ত ব্যবসা ছিল। জুয়ো খেলে সব লড়িয়ে দিয়েছে। এখন ওর কাজ হল এলাকার মেলায় গিয়ে জুয়োর আসর পাতা। সারা বছর এখানে-ওখানে মেলা বসে নানা উপলক্ষে। মেলায়-মেলায় জুয়োর ছক নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। কার্বাইড ল্যাম্প জ্বেলে বসে থাকে। চামড়ার কৌটোর হরতন ইস্কাপন চিড়িতন রুইতন ড্রাগন আর মুকুট আঁকা ছ-টা চৌকো গুটি ভরে নাড়ে। তারপর ছকের ওপর ছড়িয়ে দেয়। ছকেও ওইসব চিহ্ন আঁকা। লোকে একেকটা চিহ্নে পয়সা ফেলে দান ধরে। প্রতি গুটির ছ-পিঠে ওই ছ-টা চিহ্ন আছে। গুটির ওপর পিঠে যে চিহ্ন, ছকের সেই চিহ্নের ঘরে পয়সা থাকলে খেলুড়ে ডবল পয়সা পাবে। যার না মিলবে, সে হারবে। কর্নেল বললেন, জানি। দেখেছি। বটুকবাবু বললেন, হঠাৎ একথা কেন কর্নেল? এমনি। বলে কর্নেল চোখ বুঝলেন। বটুবাবু মুখে বিস্ময়ের চিহ্ন নিয়েই বেরিয়ে গেলেন।
রাত দশটা বাজল দেয়ালঘড়িতে। খাওয়াদাওয়ার পর কর্নেল, বটুকবাবু আর আমি বারান্দায় বসে কথা বলছিলুম। ততক্ষণে কৃষ্ণপক্ষের চাঁদটা উঠেছে গাছপালার ফাঁকে। আকাশে টুকরো মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। বারবার চাঁদটাকে ঢেকে দিচ্ছে। হঠাৎ কর্নেল বললেন, চলুন বটুকবাবু, পোস্টমাস্টারবাবুর বাড়িতে হানা দেওয়া যাক।
বটুকবাবু উত্তেজিতভাবে বললেন, যাবেন? বেশ তো, চলুন! এখান থেকে শর্টকাটে চুপিচুপি নিয়ে যাব।
ওঁদের বাড়ির পেছনে বাগান। বাগানের গেটে দিয়ে আমরা আগাছার জঙ্গলে পড়লুম। টর্চ জ্বালা মানা। তবে চাঁদের আলোয় হেঁটে যেতে অসুবিধা হচ্ছিল না। পোস্টমাস্টারের নিরিবিলি বাড়িটা দেখে গা ছমছম করল অজানা ভয়ে। গাছপালার ভেতর বাড়িটা যেন হানাবাড়ির মতো দাঁড়িয়ে আছে। পেছন দিকে একটা বন্ধ জানালার কাছে কর্নেল দাঁড়িয়ে গেলেন।
ঠিক তখনই কানে এল শব্দটা। ঠক ঠক ঠক….ঠক ঠক ঠক।
বটুকবাবু ফিশফিশ করে বললেন, কাঠঠোকরা পাখি না?
কর্নেল ইশারায় চুপ করতে বললেন। রাতের বেলা কাঠঠোকরা পাখি শব্দ করবে কেন বুঝলুম না। তাছাড়া শব্দটা শোনা যাচ্ছে যেন পোস্টমাস্টারবাবুর ঘরের ভিতর থেকে।
তারপর ঝর ঝর করে কি ঝরে পড়ল। বটুকাবু এবার ফিশফিশ করে বললেন, সিঁদেল চোর! কর্নেল ওঁকে চুপ করতে ইশারা করলেন। কিন্তু ঠক ঠক শব্দটা যেই একটু জোরে হয়েছে এবং ঝর ঝর করে সম্ভবত চুনবালি খসে পড়েছে, অমনি ব্যায়ামবীরকে বাগ মানানো গেল না।
তবে রে ব্যাটা চোর বলে আচমকা পেল্লায় হাঁক ছেড়ে উনি সামনে ছিটকে গেলেন। চাঁদের আলোয় দেখলুম, ওর বিশাল শরীর বাড়ির অন্যদিকে মিলিয়ে গেল। ধুপ ধুপ শব্দে মাটি কাপল। তারপর ধপাস শব্দ হলে কোথায়।
তারপর নরদানবের হুংকার এবং বাপরে বলে আর্তনাদও শুনতে পেলুম। দৌড়ে বাড়ির সামনে সদর দরজায় পৌঁছোলুম দুজনে। দরজা খোলা। উঠোনে দাঁড়িয়ে বটুকবাবু নিজের প্রকাণ্ড বাহুতে হাত বুলোচ্ছেন। আমাদের দেখে হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, বিছুটি বিছুটি।
টর্চর আলো জ্বেলে কর্নেল বললেন, সিঁদেল চোর বিছুটি ঘা মেরে পালিয়েছে দেখছি বটুকবাবু।
বটুকবাবু বললেন, আলকুশিও হতে পারে। ইশ! জ্বালা করছে প্রচণ্ড।
চোরকে দেখতে পেয়েছেন কি?
বটুকবাবু করুণমুখে বললেন, না। পেলে তো এক ছাড়ে ফুটিফাটা করে দিতুম। বারান্দার থামের আড়ালে লুকিয়ে পড়েছিল। যেই গেছি আর বিছুটি না আলকুশি ঘষে দিয়েছে।
পাশাপাশি দুটো ঘর। একটা ঘরে তালা ঝুলছে। অন্যটার তালা ভাঙা। সে ঘরটাই পোস্টমাস্টারের শোবার ঘর। বটুকবাবু সুইচ টিপে বাতি জ্বালিয়ে দিলেন। দেখলুম, একখানে দেয়ালের অনেকটা ধস ছাড়িয়ে দিয়ে গেছে চোর। পরীক্ষা করে কর্নেল বললেন, দেয়ালে কিছু পোঁতা আছে কিনা খুঁজছিল।
বললুম গুপ্তধন নয় তো?
কর্নেল মুচকি হেসে বললেন তাও হতে পারে। দেখছ না সারা ঘর ওলট-পালট করে খুঁজেছে! পেয়ে শেষে দেয়ালে-বলে দেয়ালের দিকে ঝুঁকে পড়লেন। মেঝে থেকে হাতখানেক উঁচুতে খোঁড়া হচ্ছিল। সেখানে কী পরীক্ষা করে কর্নেল সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। হুঁ, এখানে সিঁদুর দিয়ে স্বস্তিকা চিহ্ন আঁকা ছিল বলে সন্দেহ হয়েছিল চোরের।
