হাস্য পরিহাসের বিষয় হল মড়া। খাটুলিতে করে শ্মশানে নিয়ে যাবার সময় হঠাৎ যদি মড়া জ্যান্ত হয়ে লাফ দিয়ে পালাতে থাকে, তাহলে কেমন হবে? ছেলেগুলো হাসতে থাকল। মজার ব্যাপার তো হবে! তবে এ যাবৎ তেমনি হয়নি শুধু শ্মশানের তোলা থেকে পোস্টমাস্টারের মড়াটা নিয়ে যাওয়া ছাড়া।
একসময় বটুকবাবু এসে ঘোষণা করলেন থানার পুলিশ অফিসার হেমাঙ্গ নন্দী এসেছেন। সতু ভল্টু তোরা সব এখন যা। ক্লাবে গিয়ে বোস আমি যাচ্ছি।
ওরা বিমর্ষভাবে চলে গেল। কর্নেলের সঙ্গে খুব জমে উঠেছিল। পুলিশ অফিসার হেমাঙ্গবাবু ঘরে ঢুকলেন। সহাস্যে নমস্কার করে বললেন, কর্নেল! আপনার ট্রাংকলের পরই আমি পোস্ট অফিসে গিয়েছিলাম। নতুন পোস্টমাস্টার আজ সকালে জয়েন করেছেন। খোঁজ নিয়ে জানলুম প্রমথ মিত্তির মারা যাওয়ার পরদিন অর্থাৎ শনিবার তাঁর নামে একটা পার্সেল এসে পৌঁছোয়। পোস্টম্যান মোটে দুজন। হরিপদবাবু আর মাখনবাবু। মিত্তিরমশাইয়ের বাড়িটা হরিপদবাবুর বিটের মধ্যে পড়ে। যাই হোক, সেদিন পোস্টামাস্টার না থাকায় ওরা দুজনেই সব কাজকর্ম করেন। দুপুরে হরিপদবাবু পার্সেলটা দিয়ে আসেন মিত্তিরমশাইয়ের স্ত্রীকে। সাধারণ পার্সেল ডেলিভারি দেন।
কর্নেল বললেন, রেজিস্ট্রি পার্সেল নয়?
না। হেমাঙ্গবাবু বললেন, পার্সেলের প্যাকেটের ভেতরে অম্বলের ওষুধ পাওয়া গেছে। কলকাতার একটা আয়ুর্বেদিক ওষুধ কোম্পানি থেকে বিনামূল্যে পাঠানো নমুনা ওষুধ। মিত্তিরমশাইয়ের অম্বলের অসুখ ছিল। বিজ্ঞাপন দেখে চিঠি লিখে থাকবেন।
শুক্রবার সন্ধ্যায় মিত্তিরমশাই কোথায় ছিলেন তদন্ত করেছেন কি?
হ্যাঁ। উনি বাসুদেববাবুর মেয়েকে সাতটা পর্যন্ত পড়িয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। পথে হারানবাবুর কাছে শোনেন পোস্টমাস্টারমশাই মারা গেছেন। তার বড়ি শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাই শুনে মিত্তিরমশাই শ্মশানের দিকে চলে যান। দুজনের মধ্যে খুব বন্ধুতা ছিল শুনলুম।
তাহলে ওঁকে পথেই খুন করা হয়েছিল?
ঠিক তাই। আচমকা ওর মাথার পেছনে শক্ত কিছু দিয়ে আঘাত করা হয়। নিশ্চয় পড়ে গিয়েছিলেন মাটিতে। রক্তও পড়া উচিত। কিন্তু বৃষ্টির জন্য ধুয়ে গেছে। কাজেই জায়গাটা আমরা খুঁজে বের করতে পারিনি।
বটুকবাবু কান খাড়া করে শুনছিলেন। বললেন বুঝতে পেরেছি মিত্তির মশাইকে খুন করে তাঁর বডিটা বয়ে নিয়ে গিয়েছিল খুনি। হয়তো গঙ্গায় ফেলে দেবার মতলব ছিল। আমরা থাকায় পারেনি।
হেমাঙ্গবাবু বললেন হয়তো তাই। আপনারা যেমন শ্মশান থেকে পোস্টমাস্টারবাবুর খোঁজে তার বাড়ির দিকে দৌড়ে গেছেন, তেমনি সে মিত্তিরমশাইয়ের বডি শূন্য খাটুলিতে রাখতে সুযোগ পেয়েছে। ভেবেছিল পোস্টমাস্টারের বডি বলেই চিতায় উঠবে। রাতবিরেতে অত কে লক্ষ্য করবে–তাছাড়া ওই বৃষ্টি।
তাহলে পোস্টমাস্টারকে সে তেচালা থেকে নিশ্চয় বেরিয়ে যেতে দেখেছিল এবং বিদ্যুতের আলোয় চিনতে পেরেছিল।
বটুকবাবুর কথা শুনে কর্নেল বললেন, তাই সম্ভব। কিন্তু পোস্টমাস্টার গেলেন কোথায়? তার চাকর ভোলাই বা গেল কোথায়?
হেমাঙ্গবাবু বললেন, ভোলাকে পাওয়া গেছে। দু মাইল দূরে গ্রামে তার বাড়ি। তার বক্তব্য হল সে ছুটি নিয়ে বাড়ি গিয়েছিল। তারপর অসুস্থ হয়ে পড়ায় আসতে পারেনি। সেটা সত্যি বলেই মনে হয়েছে আমাদের। কারণ এখনও সে প্রবল জ্বরে ভুগছে। ডাক্তারের মতে ম্যালেরিয়া।
কর্নেল বললেন, আপনারা কাকে খুনি বলে সন্দেহ করেছেন?
পোস্টমাস্টারকে প্রথমে সন্দেহ করেছিলুম। মনে হয়েছিল আগাগোড়া ব্যাপারটা তারই প্ল্যান। পড়ার ভান করে পড়ে থাকা, শ্মশান থেকে সুযোগ পেয়ে কেটে পড়া এবং মিত্তির মশাইকে খুন করা। কিন্তু শেষে ভেবে দেখলুম এতে অনেক হিসেবের গণ্ডগোল হচ্ছে প্রথম কথা শ্মশান থেকে কেটে পড়ার পর মিত্তিরমশাইকে খুব করার জন্য উপযুক্ত জায়গায় পেয়ে যাবেন এটা খুবই আকস্মিক ব্যাপার। এক হতে পারে আগেই খুন করে লুকিয়ে রেখে বাড়ি ফিরে মড়া সেজেছিলেন। কিন্তু হারানবাবুর সাক্ষ্যে জানা যাচ্ছে পোস্টমাস্টারকে শ্মশানে নিয়ে যাবার পরও মিত্তিরমশাই জীবিত ছিলেন অতএব এ ব্যাপারটা ঠিক নয়। দ্বিতীয় কথা রোগা টিঙটিঙে দুর্বল মানুষ তিনি। মিত্তিরমশাইকে খুন করা সম্ভব হলেও তার বডি বয়ে নিয়ে শ্মশানের তেচালায় ঢোকা একেবারে অসম্ভব! তাছাড়া উনি নাকি রোজ সন্ধ্যায় আফিং খেতেন। খোলা বলেছে।
আফিং খেতেন? কর্নেল চমকে উঠলেন।
হ্যাঁ। তাছাড়া ওঁর ঘর খুঁজে আমরা আফিংয়ের কৌটোও পেয়েছি।
কর্নেল একটু হাসলেন। যাক তাহলে খাটুলি থেকে উঠে ওঁর মড়াচলে যাওয়ার রহস্য ফাঁস হল।
বটুকবাবু অবাক হয়ে বললেন, ফাঁস হল কীভাবে?
পোস্টমাস্টার আফিং খেয়ে মড়ার মতো পড়ে ছিলেন। আপনারা ওকে মড়া ভেবে শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার পর গঙ্গার ধারে ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটানিতে ওঁর মউতাত কেটে যায় এবং খাপ্পা: হয়ে চলে আসেন। আফিংখখারদের মউতাত হঠাৎ গেলে তারা ভীষণ খাপ্পা হয়ে যায়।
কিন্তু উনি গেলেন কোথায় তাহলে?
সেটাই বোঝা যাচ্ছে না।
হেমাঙ্গবাবু বললেন, কর্নেল, গত বছর আমি নদিয়ার রামনগর থানায় থাকার সময় চৌধুরীবাবুদের মন্দিরের বিগ্রহ চুরির রহস্য আপনি যেভাবে ফাস করেছিলেন, এবারও তাই করবেন–এ বিশ্বাস আমার আছে। সেবারকার মতোই সব রকম সাহায্য আপনি পাবেন। মিত্তিরমশাইয়ের হত্যারহস্য নিয়ে আমরা হিমশিম খাচ্ছিলুম। আজ সকালে আপনার ট্রাংকল পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছি।
