বলেই ডানপিটে সতু বৃষ্টির মধ্যেই দৌড়ে চলে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যে বৃষ্টিটা কমে এল। ঘাটোয়ারিবাবু বললেন, ততক্ষণে আমি খেয়ে আসি। মধু ডোমও বলল, আমিও খেয়ে আসি তাহলে। তারপর দুজনে চলে গেল। যাবার সময় ঘাটোয়ারিবাবু লণ্ঠনটা নিয়ে গেলেন। তপু বারণ করতে যাচ্ছিল, বটুকবাবু বললেন ছেড়ে দে! আসলে উনি ভীষণ রেগে গেছেন ঘাটোয়ারিবাবুর ওপর।
অন্ধকারে বসে রইলেন ওঁরা। বৃষ্টিটা একটু পরে আবার বেড়ে গেল। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল মাঝে মাঝে। মেঘও ডাকছিল। তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে পড়েছিলেন বলে বটুকবাবুর টর্চ নিতে মনে ছিল না। ছেলেগুলোরও খেয়াল হয়নি। এখন মনে হচ্ছিল একটা আলো থাকলে ভালো হত।
তেচালার একটা পাশে খাটুলিতে পোস্টমাস্টার-বাবুর মড়া অন্যপাশে মেঝেয় বসে আছেন বটুকবাবুরা। হঠাৎ একটা খুশখুশে ক্যাঁচকেঁচে আওয়াজ কানে এল। তারপর বিদ্যুৎ চমকাতেই বটুকবাবু দেখলেন, কে একজন তেচালা থেকে নেমে গেল। বটুকবাবু বললেন, কে কে! কোন সাড়া এল না।
স্বপন বলল, দেশলাই জ্বেলে কী হবে?
স্বপন বলল, আমার কেমন যেন খটকা লাগছে। ভল্টু, আয় তো!
দুজনে খাটুলির কাছে গেল। ভল্টু দেশলাই জ্বালল। অমনি চমকে উঠল ওরা। চমকালেন বটুকবাবুও। খাটুলি শূন্য। মড়া নেই।
ব্যাপারটা ভারি গোলমেলে। পোস্টমাস্টারবাবু মরে ভূত হতেই পারেন। কিন্তু ভূত হয়ে নিজের মড়া নিয়ে যাবেনটা কোথায়? কেনই বা যাবেন?
সবাই বৃষ্টির মধ্যে ডাকাডাকি এবং খোঁজাখুঁজি করল। কিন্তু প্রমথ বোসের পাত্তা পাওয়া গেল না। তখন স্বপন বলল, বটুকদা চলুন তো পোস্টমাস্টার বাবুর বাড়ি গিয়ে দেখি। সবাই তাতে সায় দিল। অনিচ্ছাসত্ত্বেও ওদের কথায় বটুকবাবু রাজি হলেন। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে ফের হাজির হলেন প্রমথ বোসের বাড়িতে।
নাঃ। যেমন তালা দিয়ে এসেছিলেন, তেমনি তালা ঝুলছে সদর দরজায়। চাবি পোস্টমাস্টারের বালিশের তলায় পেয়েছিলেন। তাই বটুকবাবুর কাছে চাবি ছিল। ভেতরে ঢুকে দেখেন, ঘরের দরজাতে তালা তেমনি ঝুলছে। সে-তালা খুলে ঘরের ভেতরও দেখলেন। কেউ নেই।
ততক্ষণে বৃষ্টি থেমে গেছে। আকাশে এক টুকরো চাঁদও উঠেছে। হতবাক হয়ে বটুকবাবুরা। বেরিয়ে এলেন। রাস্তায় দেখা হয়ে গেল সতুর সঙ্গে। সে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, কী ব্যাপার? আপনারা চলে এসেছেন যে শ্মশান থেকে। কুঞ্জবাবু কিছুতেই মুখের কথা শুনবেন না। মড়া পরীক্ষা করে তবে সার্টিফিকেট দেবেন। তাই ওঁকে শ্মশানে বসিয়ে রেখে আপনাদের খুঁজতে বেরিয়েছি। ঘাটোয়ারিবাবু বললেন, ফিরে এসে আপনাদের দেখতে পাননি।
বটুকবাবু বললেন, কিন্তু মড়া? মড়া যে নেই!
নেই মানে? সতু হাসল। মড়া থাকবে না কেন? দিব্যি আছে।
সবাই ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে চললেন শ্মশানের দিকে। যেতে যেতে ব্যাপারটা সংক্ষেপে স্বপন জানিয়ে দিল সতুকে। সতু বিশ্বাসই করল না কথাটা। মড়া পায়ে হেঁটে চলে গিয়েছিল এবং আবার কখন ফিরে এসে খাটুলিতে শুয়েছে এ কি বিশ্বাসযোগ্য?
কিন্তু বটুকবাবু গিয়ে দেখেন হ্যাঁ, সত্যি খাটুলিতে মড়া রয়েছে। কিন্তু কাপড় ঢাকা দেওয়া কেন? টেবিলে লণ্ঠন রেখে ঘাটোয়ারিবাবু বসে আছেন। পাশে একটা টুলে বসে আছেন কুঞ্জবাবু ডাক্তার। মধু ডোম বসে বসে ঢুলছে। কুঞ্জডাক্তার হাসতে হাসতে বললেন, বটুক না এলে মড়া হাত দেব না বলে ওয়েট করছি। নাও বটুক কাপড় ওঠাও। দেখি, সত্যি মরেছে মাস্টারবাবু–নাকি কি জ্যান্ত আছে এখনও?
হাসতে হাসতে মস্ত টর্চ জেলে খাটুলির দিকে এগিয়ে গেলেন ডাক্তারবাবু। বটুকবাবু কাপড় ওঠালেন তারপর ভীষণ চমকে গেলেন। চোখকে বিশ্বাস করতে পারলেন না। ক্লাবের ছেলেরাও হকচকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কুঞ্জ ডাক্তার বলে উঠলেন, এ কী হে বটুক এ তো পোস্টমাস্টার নয় দেখছি।
মড়াটা স্কুলমাস্টার প্রমথ মিত্তিরের।
কুঞ্জ ডাক্তার পরীক্ষা করে দেখেই বললেন মড়া তাতে সন্দেহ নেই। তবে বটুক, তোমায় একটা কথা বলি শোনো! বেশি উৎসাহ ভালো নয়। এক প্রমথের মড়া শুনে এলুম। এসে দেখি অন্য প্রমথ। প্রমথ মিত্তিরের সার্টিফিকেট আমি দিতে পারব না বাপু, সে তুমি যাই বলল। মিত্তির বউ বড়ো দজ্জাল মহিলা। আমার মুণ্ডু মুড়িয়ে খেয়ে ফেলবে।
কুঞ্জ ডাক্তার গোঁ ধরে চলে গেলেন। বটুবাবু ব্যায়ামবীরের শরীরে তখন আর একফেঁটা জোর নেই। ধপাস করে বসে পড়ে বললেন, তোরা যা হয় কর সতু! আমার মাথা ঘুরছে।
সতু আর ভল্টু দৌড়ে খবর দিতে গেল স্কুলমাস্টারের বাড়িতে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই দজ্জাল মহিলা এবং আরও সব নোক এসে পড়ল। এতক্ষণে দেখা গেল প্রমথ মিত্তিরের মাথার পেছনে চাপ চাপ রক্ত জমাট বেঁধে আছে। শক্ত কিছু জিনিস দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল। সবাই শিউরে উঠল। এ তো হত্যাকাণ্ড।
কাজেই মড়া পুড়ল না। পুলিশ এল রাতদুপুরে। মড়া চালান গেল সদরের মর্গে।
এদিকে পোস্টমাস্টার প্রমথ বোসের পাত্তা নেই। তাঁর চাকর ভোলারও নেই। বাড়িতে এখন তালা ঝুলছে।
.
০২.
ট্রেনে মেদিগঞ্জ পৌঁছুতে সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল। বটুকবাবুরা আগে এখানকার বনেদি বড়োলোক ছিলেন। এখন অবস্থা কিছুটা পড়ে এসেছে। গঙ্গার ধারে, সেকেলে গড়নের প্রকাণ্ড প্রাসাদতুল্য বাড়ি। আমাদের যত্নআত্তির ত্রুটি হল না। কিছুক্ষণের মধ্যে খবর পেয়ে শ্মশানবন্ধু ক্লাবের ছেলেরা এসে ভিড় করল। কর্নেল তাদের সঙ্গে কৌতুকে মেতে উঠলেন! বৃদ্ধ গোয়েন্দা প্রবরের যা স্বভাব।
